বড় হুজুরদের একাল সেকাল

বড় হুজুরদের একাল সেকাল

বড় হুজুরদের একাল সেকাল

মুহাম্মাদ আইয়ুব : আজকাল আমরা আত্মসমালোচনা প্রায় ভুলেই গেছি। পরিবর্তে কাকে গোমরাহ বানানো যায়, কারে ইহুদিদের দালাল সাব্যস্ত করা যায় এবং সুযোগ বুঝে কাকে নাস্তিক ঘোষণা দিলে খেলা জমবে, কিভাবে বউ তালাকের মাসআলা বাজারে ছেড়ে দেওয়া যায় এ নিয়েই আমরা উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা রাতদিন বিভোর। অথচ আমরাই হাদিসের মসনদে, বয়ানের মিম্বরে আর ওয়াজে মাহফিলে রেফারেন্সসহ বলছি, হযরত আবু ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয় নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে তার নফসের হিসাব-নিকাশ নেয় এবং পরকালের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ঐ ব্যক্তি যে নিজের নফসের কুপ্রবৃত্তি অনুসরণ করে। আবার আল্লাহপাকের কাছেও আশা আকাংখার ও প্রত্যাশা রাখে। (জামে তিরমিজি)।

ব্যপারটা কেমন হয়ে গেল না? তাই ভাবলাম আজকের লেখাটা আত্মসমালোচনামূলক হোক। আর ধারাটা শুরু হোক সেকাল একালের বড় হুজুরদের দিয়ে। আমার মাদ্রাসার প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার পর মিজান জামাতের যে প্রথম হয়েছে সে মাদ্রাসায় মিষ্টি নিয়ে এল। এদিক সেদিক বিতরণ না করে মিষ্টির পুরো প্যাকেটই আমার টেবিলে রেখে দিল। ক্লাসে ঢুকে চোখ আটকে গেল মিষ্টির প্যাকেটে। প্যাকেটের গায়ে সুন্দর করে লেখা প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করায় ‘বড় হুজুরের’ জন্য অমুকের পক্ষ থেকে এই হাদিয়া। আমি সমস্বরে বলে উঠলাম ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ মেহনত করল অন্যান্য হুজুর আর মিষ্টি খাবে বড় হুজুর! এর চেয়ে বড় অবিচার আর কি হতে পারে! এ্যাই! মিষ্টি এখান থেকে নিয়ে যাও। অন্যান্য হুজুররা খেয়ে যা থাকবে সেটা আমার জন্য নিয়ে আসবে।

আজকে তাঁদের মেহনতের জন্যই তো আমি নামকাওয়াস্তে বড় হুজুর নইলে আমি কোন ছাত্র? আচ্ছা এই যে সুবোধের আচরণ এটা কোত্থেকে শিখলাম? এর পিছনেও আছে মজার গল্প। ২০১৭ সালের কথা, আমি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানাধীন এক মহিলা মাদ্রাসায় পড়াই। খতমে বুখারীর আগে দাওরার ছাত্রীরা সব উস্তাদদের জন্য কিছু হাদিয়ার ব্যবস্থা করে। আমরা ছোট হুজুররা অফিসে বসে আছি এমন সময় বড় হুজুর গোমড়া মুখে হাদিয়ার প্যাকেটগুলো নিয়ে অফিসে ঢুকলেন আর গজগজ করে বলতে লাগলেন মেয়ে মানুষ তো, তাই বুদ্ধি সুদ্ধি কম। সামনে খতমে বুখারী অনুষ্ঠান, কত খরচ! এই সব বাড়তি ঝামেলার কি দরকার ছিল! হাদিয়া পরে দেওয়া যেত না? আজব ব্যাপার, হাদিয়া দিবে ছাত্রীরা আর সপ্ত আসমান ভেঙে পড়বে বড় হুজুরের মাথায় কারণ কি?

খোঁজ নিয়ে জানলাম, গত দুই বছর যাবত এই হাদিয়া তিনি একাই ভোগ করেছেন কিন্তু এই বছর দাওরার এক অল্প বুদ্ধির এক মেয়ে তার রাজত্বে হানা দিয়েছে। বুদ্ধি সুদ্ধি কম হলে যা হয় আর কি। মহিলা মাদ্রাসা’র বড় হুজুরদের কথা চিন্তা করে পুরুষ মাদ্রাসার যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন এবার তাদের জন্য ছোটখাটো একটি গল্প। গল্পটি শুনিয়েছেন আমাদের জামিআ ইকরার সাবেক উস্তায মাওলানা ওলিউল্লাহ সাহেব দা.। এক সময় তিনি শিক্ষকতা করতেন কুষ্টিয়ার নামকরা এক মাদ্রাসায়। দাওরার ছাত্ররা নিজেদের স্মৃতি ধরে রাখতে মাদ্রাসার জন্য স্থায়ী একটা আসবাব কিনে দেয়। সাথে সাথে সমস্ত উস্তাদদের এক সেট করে কাপড়চোপড়ও দেয়। ব্যাপারটা শায়খুল হাদীস ওরফে বড় হুজুরের পছন্দ না।তাঁর ভাষ্যমতে এসব বেদআত না ছড়ানোই ভাল।

দাওরার আমির সাহেবকে তো তিনি ডেকে এক প্রকার শাসিয়ে-ই দিলেন যে, আমার রুমে এটা দরকার ওটা দরকার, বাসায় এই নেই, সেই নেই অথচ মাদ্রাসার সব হুজুরদের হাদিয়া দাও! মাশাআল্লাহ কি চমৎকার ভাষণ।

এ-তো গেল এক অধ্যায়। এবার আসি বড় হুজুরদের মেহমান অতিথিদের সাথে আচার আচরণের মধুময় এক অধ্যায়ে। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. এর আহবানে ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার আয়োজনে ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী ফতোয়ার স্বপক্ষে এক লক্ষ আলেম উলামার স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে গোপালগঞ্জ ও বরিশালের একাংশের কিছু মাদ্রাসায় গেলাম স্বাক্ষর আনতে। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য যে, অনেক মাদ্রাসায় বড় হুজুর মহোদয়ের সাথে সাক্ষাতে ধন্য হতে পারিনি তাঁদের সিমাহীন ব্যস্ততার কারণে। আর কতিপয় মাদ্রাসায় বড় হুজুরদের সাথে হল স্মরণকালের ভয়াবহ সাক্ষাত। সালাম নেই, কালাম নেই, চা-বিস্কুট তো দূরের কথা, মহামান্যদের এক ঢোক পানি পর্যন্ত আমাদের তৃষ্ণার্ত গলা ভিজাতে পারেনি। আর ভাষার মাধুর্যতা? এখানে তো কাক ও আহত হয়। জগত না ঘুরলে বুঝতাম না ‘বড় হুজুর’ কি জিনিস?

বড় হুজুর মানেই যে, খিটখিটে মেজাজ, গুরুগম্ভীর, দাম্ভিক বিষয়টি কিন্তু মোটেও তেমন নয় যুগে যুগে মানব জাতী এমন ও বড় হুজুরদের দেখা পেয়েছে যারা ছিলেন সাক্ষাৎ দেবতা। সুতরাং আজকের এই লেখাটি শেষ করবো সবচেয়ে বড়, সবার বড় হুজুরের একটি মানবতার গল্প দিয়ে, তাঁর প্রজ্বলিত আলোকময় প্রদীপের আলো দিয়ে।

একদিন প্রচন্ড ক্ষুধায় টিকতে না পেরে সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রা. রাস্তায় বেরুলেন। দেখলেন, হযরত আবু বকর রা. আসছেন। সরাসরি ক্ষুধার কথা তো বলতে পারেন না। তাই কুরআনে কারীমের একটি আয়াত জিজ্ঞাসা করলেন। আয়াত জানাটা উদ্দেশ্য ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল, মলিন চেহারা দেখে ও ধরা কণ্ঠ শুনে যেন হযরত আবু বকর রা. তার কষ্টটা আঁচ করতে পারেন। কিন্তু না, আবু বকর কিছুই বুঝলেন না! উত্তর দিয়ে চলে গেলেন।

একটু পর এলেন হযরত উমর রা.। তাঁকেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলেন না। একটি আয়াত জিজ্ঞাসা করার ছুতোয় তাঁরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলেন। ওমর রা.ও বুঝতে পারলেন না। বুঝবেন কীভাবে, সামনে যে অপেক্ষা করছিল এক আলৌকিক ঘটনা! তাই হযরত উমরও প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রহমতের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসছেন। এবার তাঁর মনে একটু আশা জাগল, ক্ষুধার্ত মলিন চেহারাটা একটু উজ্জ্বল হল। আবু বকর-ওমর বুঝতে না পারলেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিকই চেহারা দেখেই বুঝে ফেললেন তাঁর প্রিয় সাহাবীর মনের কথা। মুচকি হেসে বললেন,

– আবু হুরায়রা?!
– লাব্বাইক, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
চলো।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে চলতে লাগলেন। আবু হুরায়রা চললেন পিছুপিছু। নবীজী ঘরে প্রবেশ করলেন। হযরত আবু হুরায়রাও অনুমতি নিয়ে নবীগৃহে প্রবেশ করলেন। নবীজী ঘরে গিয়ে দেখেন, এক পেয়ালা দুধ। জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কোত্থেকে এল?
অমুক আমাদের জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। ভেতর থেকে আওয়ায আসল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হুরায়রাকে ডেকে বললেন, ছুফ্ফায় যারা আছে সবাইকে ডেকে আনো। মসজিদে নববীর ছুফ্ফাবাসী সকলেই ছিলেন ইসলাম ও মুসলমানদের মেহমান। তাদের কোনো ঘর-সংসার ছিল না। নবীজীর দরবারেই পড়ে থাকতেন; হাদীস শিখতেন, ইলমের চর্চা করতেন। নবীজীর নিকট কোনো ছদকা এলে সবটুকু তাদের দিয়ে দিতেন। আর কেউ হাদিয়া পাঠালে নিজে কিছু গ্রহণ করে অন্যদেরও তাতে শরিক করতেন।

তো এই এক পেয়ালা দুধে ছুফ্ফার সাবাইকে শরিক করার জন্য নবীজী আবু হুরায়রাকে বললেন, ছুফ্ফার সবাইকে ডেকে আনো। এ কথা শুনে আবু হুরায়রা ভেতরে ভেতরে একটু দমে গেলেন। এক পেয়ালা দুধ! আবার সবাইকে ডাকতে বলছেন! আমাকেই তো বলবেন- সবাইকে পান করাও। সবাই পান করার পর আমার কপালে কি কিছু জুটবে?! কিন্তু যত যাই হোক এ যে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ! তা পালন করার মাঝেই কল্যাণ।

আবু হুরায়রা রা. সবাইকে ডেকে আনলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু হুরায়রা! সবাইকে পান করাও। আবু হুরায়রা রা. একজন একজন করে সবার কাছে পেয়ালাটি পেশ করছেন। প্রত্যেকে নিজের চাহিদামতো তৃপ্তিভরে পান করছেন আর তা দেখে আবু হুরায়রার গলা আরো শুকিয়ে আসছে; এই বুঝি পেয়ালার সব দুধ গেল শেষ হয়ে! কিন্তু না, একে একে সবাই তৃপ্তিভরে পান করার পরও শেষ হল না পেয়ালার দুধ। এবার আবু হুরায়রা পেয়ালা এগিয়ে ধরলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে। নবীজী পেয়ালা হাতে নিলেন। মাথা তুলে তাকালেন আবু হুরায়রার দিকে। মুচকি হেসে বললেন- আবু হুরায়রা! আর কে বাকি, আমি আর তুমি?
– জ্বি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
– আচ্ছা, তাহলে বস। আগে তুমি পান কর।
হযরত আবু হুরায়রা রা. পান করলেন। নবীজী বললেন- আরো পান কর। তিনি আরো পান করলেন। নবীজী বললেন- আরো। তিনি আরো পান করলেন। আর পারছেন না।
– নবীজী বললেন, আরো।
এবার আবু হুরায়রার পরাজিত বাক্য- ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আর পারছি না!

এত মানুষ পান করার পরও পেয়ালাতে যতটুকু দুধ ছিল ততটুকুই থেকে গেল। নবীজী বললেন, এবার আমাকে দাও। নবীজী পেয়ালা হাতে নিলেন। আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে চুমুক দিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৭৫, ৬২৪৬, ৬৪৫২; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৭৭)

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *