পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইকরা বাংলাদেশ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ঢাকা মহানগরী আয়োজিত ‘আওলাদে রাসূল ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা সভায় স্মৃতিচারণ করেছেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম অধ্যাত্মিক রাহবার, জমিয়তে উলামা হিন্দের সেক্রেটারি জেনারেল, আওলাদে রাসূল মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
তিনি ফিদায়ে মিল্লাত (রহ.) ইন্তেকালের সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, একদিন ফিদায়ে মিল্লাত (রহ.) দিল্লি থেকে দেওবন্দ পৌঁছলেন। হুইল চেয়ারে ঘরে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি উল্টে পিছন দিকে পড়ে যান। আহত হন এবং রক্ত ঝরতে থাকে। উপস্থিত যারা ছিলেন তারা তাড়াতাড়ি বিছানায় নিয়ে যান, কিন্তু তখনও হযরতের ফিকির ছিল তাড়াতাড়ি অযু করে আসরের নামাজ পড়ার। কখন রক্ত থামবে আর পবিত্র হয়ে নামাজ পড়বেন।
এরপর বিশ ত্রিশ মিনিটের মাথায় বেহুশ হয়ে যান এবং ধীরে ধীরে কোমায় চলে যান। তারপর দিল্লিতে আনা হয় এবং হসপিটালে ভর্তি করা হয়। তিন মাস তিনি কোমায় ছিলেন। ফিদায়ে মিল্লাত (রহ.) কে আইসিইউতে রাখা হয় এবং মুখে ভেন্টিলেটর লাগানো হয়। ভেন্টিলেটর যখন বেশিদিন লাগানোর দরকার হয়, তখনও তা বেশিদিন লাগানো যায় না, কারণ ইনফেকশন হওয়ার আশংকা থাকে। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কণ্ঠনালিতে অপারেশন করে টিউব লাগিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু একবার যাকে টিউব লাগিয়ে দেয়া হয় সে সুস্থ হয়ে গেলেও কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
হযরতের টিউব লাগিয়ে দেয়া হয়। এখন তিনি সুস্থ হলেও কথা বলতে পারবেন না। কারণ জবানের সংযোগ কেটে গেছে। তিনমাস এভাবে চলে গেল। হঠাৎ একদিন তাঁর হার্টবিট বেড়ে গেল। আমার ফুফি আমাকে জানালে আমি আইসিইউতে গেলাম। দেখি ফিদায়ে মিল্লাতের জবানে জিকির জারি হয়ে গেছে। মাথার উপরে যে মনিটর আছে সেটা সোজা চলছে। আর মনিটরের মাঝের রেখা সোজা তখনই চলে যখন হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দেয়। হার্ট বন্ধ হয়ে গেছে, মনিটর সোজা চলছে, কণ্ঠনালি বিচ্ছিন্ন, অথচ সে অবস্থায় তিনি ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির করছেন!
অসংখ্য অগণিত লোক; যারা ট্রেনিংয়ের জন্য এসেছিল, ডিউটিতে ছিল, তারাও এটা দেখেছেন এবং আমাদের সাথে কাঁদছিলেন। তিনি সরাজীবন আল্লাহ আল্লাহ করছেন, এজন্য মেডিকেল সাইন্সে এটা একদম অসম্ভব হওয়ার পরেও জীবনের শেষ সময় তিনি আল্লাহ আল্লাহ করেছেন।
বুধবার (২৪ মার্চ) রাত ৯টায় মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী আরও বলেন, আব্বাজান (রহ.) খুব ‘বা রুব’ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। জীবনে কোনদিন তাঁর সামনে কথা বলার হিম্মত হয়নি। অবশ্য শেষ চার পাঁচ বছরে বলতাম। সফরে আমরা তো খাদেম হিসাবে থাকতাম, কিন্তু আব্বাজানের সাথে সফরে হলে আমরা বুঝতাম না ইনি খাদেম নাকি মাখদুম। একটি ঘটনা বলি, আমরা ট্রেনে সফর করছিলাম। সফরের আব্বাজনের সাথে গরম পানি থাকতো। তো তিনি তাহাজ্জুদের সময় উঠে গরম পানি দিয়ে অযু করলেন, তাহাজ্জুদ পড়লেন। তারপর ফজরের নামাজের সময় আমাকে ডাকলেন। আমি দেখি তিনি আমার জন্যও গরম পানি রেখেছেন। সফরসঙ্গীর এতোটা খেয়াল রাখতেন তিনি।
আরও পড়ুন: বিশ্ব মুসলিম তারুণ্যের আইডল মাহমুদ মাদানী : আল্লামা মাসঊদ

জমিয়তে উলামা হিন্দের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ফিদায়ে মিল্লাতের শেষ জমানার কথা, ইন্তেকালের বছর তিনেক আগে সম্ভবত। একদিন বাংলাদেশ থেকে মেহমান আসলেন। মেহমানদের জন্য মাছ, শাক-সবজি, ভাত-ডাল, নেহারি প্রস্তুত করা হলো। তো ফিদায়ে মিল্লাত দস্তরখানে তাশরিফ আনলেন এবং নিজের সামনে থেকে যে নেহারি ছিল তা থেকে কিছু উঠিয়ে নিলেন। তখন আমি গোস্তাখি করে বললাম, মেহমানের বাহানায় আপনি এ খাবার প্লেটে তুলে নিচ্ছেন? আপনি নেহারি খেলে মেহমানরা কি শাক সবজি, ভাত-ডাল খাবে? ফিদায়ে মিল্লাত কিছু বললেন না, চুপ রইলেন। নারাজও হলেন না।
গৃহাভ্যন্তরে পরিবারের সদস্যদের সাথে ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) আচরণ খুব সুন্দর ছিল উল্লেখ করে মাওলানা মাহমুদ মাদানী বলেন, আব্বাজান (রহ.) সবসময় ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন। যতদিন সুস্থ ছিলেন ততদিন মেহমানদের রান্নাবান্নার কাজে পরিবারের লোকজনের সাথে শরীক হতেন। শরীর যখন খারাপ হতে থাকল, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখনও মেহমানদের জন্য কোন না কোন এক খাবারের দায়িত্ব নিজের কাছে রাখতেন।
‘আওলাদে রাসূল ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানীকে বিশ্ব মুসলিম তারুণ্যের আইডল বলে ঘোষণা দেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।
তিনি বলেন, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সংকট নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করছেন মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানী। সামাজিক জীবন ও রাজনীতিতে ন্যায়-নীতি, ইনসাফ, সততা ও কুরআন-হাদীসের জ্যোতি ছড়িয়ে সারা মুসলিম জাহানের আইকন হয়ে আছেন তিনি। আমি তার নেক হায়াত কামনা করি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ফিদায়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর অবদান অনিস্বীকার্য উল্লেখ করে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ভারতের মুসলমান সমাজে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রবল জনমত গঠনের কাজ করেন মাওলানা আসআদ মাদানী (রহ.)। পাকিস্তানীদের গণহত্যা-নির্যাতন বন্ধে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে বিশেষ করে তাঁর নেতৃত্বে কলকাতায় যে সভা ও সেমিনারগুলো অনুষ্ঠিত হয়, সে ইতিহাস আজও ভাস্বর হয়ে আছে।’
আল্লামা মাসঊদ বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত হিসেবে মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) বাংলাদেশে আসেন। মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) সহ বেশ ক’জন শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনি দেখা করেন। তখন মাদরাসা-মসজিদ খুলে দেয়া সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।’
‘আওলাদে রাসূল ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা সভা মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের অংশ বলে উল্লেখ করে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখায় আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করলাম।’
আরও পড়ুন: ‘স্মৃতির মলাটে ফিদায়ে মিল্লাত’ এর মোড়ক উন্মোচন করলেন মাহমুদ মাদানী

অনুষ্ঠানে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের লিখিত স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ ‘স্মৃতির মলাটে ফিদায়ে মিল্লাত হযরত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.)’ এর মোড়ক উন্মোচন করেছেন মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী বলেন, ‘মাওলানা মাসঊদ সাহেবের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। আব্বাজান (রহ.) এর জীবনের উপর গ্রন্থ লিখে আমার মাধ্যমে মোড়ক উন্মোচন করানোর কারণে আমি হজরতের কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ হজরতকে জাযায়েখায়ের দান করুন।’
ইকরা বাংলাদেশ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ঢাকা মহানগরী আয়োজিত ‘আওলাদে রাসূল ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর জীবন ও কর্ম শীর্ষক আলোচনা সভায়’ মোনাজাত পরিচালনা করেন সিলেটের কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষিপুরী।



