- মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম
ভূমিকা
যেখানে আমি দেখি সেই জাহেলি যুগের আরবদের—তাদের তাঁবু আর কুঁড়ে ঘরের মাঝে, দণ্ডায়মান বাঁশ আর দড়ির জটাজালে, উট আর ছাগলের পাল ঘেরা জীবনে, মরুবৃক্ষ ‘শীহ’ আর ‘কাইসুম’-এর গন্ধময় পরিবেশে। আমি স্বচক্ষে দেখি তাদের কাব্য প্রতিযোগিতা আর বংশগৌরবের লড়াই, তাদের প্রেম আর গভীর ভালোবাসা, তাদের পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততা, ধৈর্য আর দুঃসহ পরীক্ষার দৃশ্যাবলি। শুনতে পাই উটচালকের গান, ধূধূ প্রান্তরের নির্জন সুর, দেখতে পাই কবিমেলাগুলো, বক্তৃতার মঞ্চ, তাদের দারিদ্র্য আর অনটনের ক্লান্ত মুখাবয়ব, রৌদ্রদগ্ধ তামাটে চামড়া, জ্বীর্ণ দেহগুলো।
তাদেরকে দেখি মরু প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে—কখনও গ্রীষ্মের দাপদাহে, কখনও শীতের হিমেল হাওয়ায়; মরুভূমি থেকে গ্রামীণ তৃণভূমিতে, শীতের আবাস থেকে গ্রীষ্মের উষ্ণ আশ্রয়ে, উঁচু মালভূমি থেকে উপত্যকার গহ্বরে, মরুর সিঁথান বেয়ে—যেখানে বৃষ্টি নামে, যেখানে সবুজ ঘাস জন্মায় । তারা সন্তুষ্ট ছিলো সামান্য খাদ্যে; মুঠো মুঠো খেজুর, দুধের পাত্র, যবের পরিমিত প্রাপ্তিতে।
আর যখন জীবন কঠিন হয়ে যেত, তারা চামড়া খেত, শুকনো গোশত পুড়িয়ে খেত, মরুভূমির টিকটিকি, ইঁদুর, উটের হাড় আর গরুর খুর রেঁধে খেত। আর পোশাকে তাদের তুষ্টি ছিল মোটা কাপড়, পশমি চাদর আর উটের লোমের বস্ত্র; আর যদি তাও না পেত, তারা ছায়াকে পরিধান করত, বালুকে বিছানা বানাত—
কিন্তু কখনও অভিযোগ করত না, হতাশ হতো না, আল্লাহর রিজিক বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্ট হতো না; কাঁদত না বিলাসিতার অভাবে, কিংবা জীবনযাত্রার বিলাশিতা না পাওয়ার দুঃখে।
তারপর এই অনুগত, সাহসী, কঠোর জীবনযাপনকারী জাতিকেই দেখি হঠাত একদিন ইসলামি সভ্যতার আলো এসে পড়ে তাদের উপর। তখন তাদের জীবনে আসে প্রাচুর্য, খাদ্যে আসে মাধুর্য, পরিবেশে আসে সবুজের প্রসার। পানি হয় সহজলভ্য, উৎসব হয় প্রাণবন্ত, এবং আল্লাহর দেওয়া সেই অগণিত নিয়ামতের ছায়ায় তাদের জীবনে নেমে আসে এক রকম আনন্দ ও সন্তুষ্টি। পারস্যের ধন-ভাণ্ডার, রোমের রত্নরাজি এসে ভরে তোলে তাদের রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের ভেতর রমণীরা মুক্তার মতো দীপ্তি ছড়ায়, দাস-দাসীরা যেন ঝরানো মুক্তার মতো রঙ ছড়ায়।
আমি দেখি তাদের সুরেলা গানের আসর, ঘনিষ্ঠ সখীদের মিলন, আনন্দঘন বিনোদনের মঞ্চ; তাদের সৌজন্যপূর্ণ আলাপচারিতা, লম্ফঝম্ফ করা ঘোড়ার খেলা, শিকারভূমির রণনীতি, হজ্জ্বের স্থানসমূহ। আমি তাদের কবিদের ভিড় দেখি রাজাদের দরজায়, আর রাজাদের উপঢৌকন কবিদের হাতে। তাদের ভাষা ছুটে চলে বর্ণনায়; বাঁশি, সেতার, বাঁশবীণা, ঢোল, পানের পাত্র, আঙুরের দানা, খাবারের থালাসমূহ, ও চটুল লেখনী।
আমি দেখেছি নানা রকমের খাদ্য—মিষ্টি কিবা অম্ল, দেখেছি পানশালা ও রঙিন পানীয়, যার মধ্যে রয়েছে হালাল আর হারাম। দেখেছি আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের দল, নদীতে বয়ে চলা জলযান, সবুজ বাগান আর ঘন বনানী, রাজপ্রাসাদ ও তার ভাস্কর্য, জলাশয় ও তার মাছ, নদী ও তার পাড়, ফুল ও তাদের সুবাস, আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টি ও শিশিরবিন্দু।
আমি অনুভব করেছি ধীরে ধীরে ছড়ানো হৃদয়ে ভালোবাসার স্পন্দন, শ্রবণে সঙ্গীতের মাধুর্য, শরীরে সোনালী আবহ, সন্দেহের অস্থিরতা, চিন্তার ঝলক, এবং আকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বল দীপ্তি।
আমি চাই না যে, এই জীবনের মাঝে, এই দুনিয়ার গণ্ডিতে, কোনো কোমল চরিত্র, কোনো সতেজ সাহিত্য, কোনো নিবেদিত প্রেম, কোনো সরল আনন্দ, কিংবা কোনো মধুর সান্নিধ্য চোখে পড়ুক, তবু আমি তার সবই খুঁজে পাই।
আমি চাই না শুনতে, সেই মায়াবী সুর যা নীরবতার অন্তরালে কিশোরীর কোমল কণ্ঠে ফুটে ওঠে, অথবা যা শোনা যায় পথিকের পেছনে উটের ধূলায় মিশে, প্রেমিকের অশ্রুসিক্ত গানে, মাতালের এলোমেলো প্রলাপে, সুরকারের মনোহর সুরে, যে গান গায় প্রেমে উন্মত্ত হয়ে। আর কূপের ধারে দাঁড়িয়ে যে জল সঞ্চয়কারী আপন ছন্দে তুলে আনে ডোল—তার গলায় যে সুর ওঠে, হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত সেই সুরটিও আমি শুনতে চাই না। তবুও আমি তা শুনতে পাই।
আমি অনুভব করতে পারি কী ধ্বনিত হয় এক প্রেমিকের অন্তরে, যখন নিশীথ রাতে একাকী নিজেকে সে জড়িয়ে রাখে নিঃশব্দে; বুঝতে পারি কেমন কাঁপন ধরে এক বিভ্রান্ত পথিকের মনে, যখন সে দিক হারিয়ে ফেলে অচেনা পথে। উপলব্ধি করতে পারি নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এক মায়ের প্রাণের শোক, যখন তার একমাত্র সন্তানকে কেড়ে নেয় মৃত্যু।
আমি অনুভব করি সেই ক্ষুব্ধ হৃদয়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ—যার প্রতিশোধের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, যার অন্তর জ্বলছে অথচ আগুন নিঃসরণে অপারগ; আমি বোধ করি সেই উদার চিত্তের ব্যথা—যে চোখে দেখে মানুষের দুঃখের করুণ মুখচ্ছবি, কিন্তু পারে না কিছু করতে। আমি শুনতে পাই প্রবাসীর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, যার চারপাশে লোক আছে, অথচ কেউ তার নয়। দেখি বন্দীর একঘেয়ে দেওয়ালের মাঝে আটকে থাকা আত্মার ক্লান্তি, যে দিনের পর দিন সুখের প্রহর গুনে চলে। আমি টের পাই সেই শঙ্কিত আত্মার দ্বিধা, যে দাঁড়িয়ে আছে অনুকম্পা আর ক্রোধের মাঝে, থেমে আছে এক অনিশ্চয়তা নামক পাতালে।
আমি বুঝি সেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের নিঃশেষ দৃষ্টি—যার সামনে একদিকে আশার কণিকা, আরেকদিকে চিরতরুণ অন্ধকার; আমি অনুভব করি সেই অভুক্ত মানুষের অপমানিত ক্ষুধা, যে খাদ্যের বদলে নীরবতা গিলছে; সেই হতাশ প্রাণ, যে মৃত্যুকে প্রতিনিয়ত আহ্বান জানায়, কিন্তু মৃত্যুও যেন তার জন্য সাড়া দেয় না। আমি বুঝি সেই গর্বিত হৃদয়ের অস্থিরতা, যে হঠাৎ করেই লাঞ্ছিত হয়ে পড়ে; সেই ব্যক্তি, যে একদিন মাথা উঁচু করে চলত, আজ নিঃশব্দে পড়ে আছে ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে; আমি উপলব্ধি করি সেই উচ্চশ্রেণির মানুষের অশ্রু, যার সম্মানের পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছে কোনো অকরুণ হাত; সেই গর্বিত চিত্তের রক্তক্ষরণ, যখন তার মর্যাদাকে স্পর্শ করেছে কোনো অপবিত্র স্পর্শ।
আর আমি চিনি সময় নামক এক আশ্চর্য কারিগরকে, যে কখনো তোলে, কখনো ফেলে; কখনো সে ধন দেয়, কখনো কেড়ে নেয়; কখনো তার মুখ ভরা হাসি, আবার কখনো পিঠ ফিরিয়ে নেয় অবহেলায়। আমি দেখেছি তার কালো হাত—যা ধ্বংস করে দেয় প্রাসাদ, নিঃস্ব করে দেয় বাড়ি, বিরাণ করে দেয় জনপদ, নির্জন করে দেয় এক সময়ের কোলাহলময় বাগিচা।
আমি অনুভব করি—সেই মহান হৃদয়ের বেদনা, যখন সে দেখে দারিদ্র্যের কঠিন রূপ, অসহায়ত্বের নগ্ন প্রকাশ। অনুভব করি প্রবাসীর নিঃসঙ্গতা, বন্দির চার দেয়ালে শ্বাসরুদ্ধ দিন; অনুভব করি সেই দোলায়মান হৃদয়ের উৎকণ্ঠা, যে দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসা ও ঘৃণার মাঝামাঝি; কিংবা সেই মৃত্যুপথযাত্রীর চরম মুহূর্ত—যখন আশা আর হতাশা একসঙ্গে জর্জরিত করে আত্মাকে।
আমি বুঝি—কী হয় যখন কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যহীন হয়ে পড়ে, কিংবা এক হতাশ প্রাণ যখন মৃত্যুও তাকে ফিরিয়ে দেয়; যখন সম্মানিত ব্যক্তি অপমানিত হয়; অথবা কোনো উচ্চাসনচ্যুত মানুষ ধ্বসে পড়ে অতলে; কিংবা সম্মান যার জীবনের অহংকার, তার গায়ে লাগে অপমানের ছায়া; কিংবা কোনো গর্বিত হৃদয়ের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলে কেউ। আমি সবই উপলব্ধি করি।
এই সবকিছু থেকেই আমি এমন এক আনন্দ, এক তৃপ্তি অনুভব করি—যা সৌভাগ্যবানদের ভোগের সুখ কিংবা বিলাসিতার সব রকম প্রাচুর্য দিয়েও মাপা যায় না। তখন আমার মনে হয়, যেন আল্লাহ তা’আলা নিজেই আমার জন্য এ পথটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হয়তো তিনি জানতেন, যে ভাগ্যে আমার জন্য অর্থ কিংবা খ্যাতি, ধন কিংবা বৈভব লেখা হয়নি।
আমি যেন বাস করি সেই সৌন্দর্যের ছায়ায়, উপভোগ করি তার ফলমূল ও প্রশান্তি—আলোকোজ্জ্বল, নিষ্কলুষ এক কল্পনার জগৎ, যেখানে নেই কোনো সন্দেহ, নেই কোনো পাপ। মহান প্রভু আমার জন্য সাজিয়ে দিয়েছেন এক নির্মল সৌন্দর্য, এক অনুপম রূপকল্প, যা অন্য কারও জন্য রাখেননি—এ যেন তাঁর রহমত, যেন এক মমতা, যেন অন্তরের ধ্বংস থেকে রক্ষা করার এক সুবিশাল আশ্রয়—যেখানে আমি দাঁড়িয়ে থাকি হতাশার বিষ ও মিথ্যা আশার প্রতারণার মাঝখানে।
এইভাবে আমি উড়তে থাকি সেই মনোহর কল্পনার আকাশে—হাসি কখনো, আবার বিষাদে নিমজ্জিত হই, কণ্ঠে উঠে আসে সুর কখনো, আবার কখনো নেমে আসে অশ্রুপাত। এমনই করে কাটে আমার নিঃসঙ্গ দিনগুলো, যতক্ষণ না কোনো অপরিচিত কড়া নাড়ে দরজায়, কিংবা স্মৃতির গহন থেকে ভেসে আসে কোনো পুরনো ডাক।
সে সময় আমার চারপাশে কেউ ছিল না, যার সাহচর্যে সাহিত্যের এই রসাস্বাদনে আমি শক্তি পেতে পারতাম। তখন আমি মাত্র তেরো পেরিয়েছি, বসবাস করছি কিছু আলেম-ওলামার মাঝে, যারা ছিলেন পুরনো ধারার আজহারি—আমার চিন্তা, আমার আগ্রহ, তাদের কাছে যেন সম্পূর্ণ অচেনা।
তাদের দৃষ্টিতে সাহিত্যের এই সাধনা ছিল অলসতা ও উদ্ভ্রান্ত কল্পনার খেলা, ছিল শয়তানের এক প্রলোভন।
যারা আমাকে আদর করতেন, তারা সদা সচেষ্ট ছিলেন আমাকে এই ‘কুপথ’ থেকে রক্ষা করার জন্য—যেমন পিতা রক্ষা করে তার শিশুকে যৌবনের দোলাচল ও মোহের ঝুঁকি থেকে। তারা বিশ্বাস করতেন, পাঠের কোনো একটি মুহূর্তও যদি জীবনের সুর-সৌন্দর্যে ব্যয় করি, তবে তা এক অপচয়, এক বিপথগামিতা।
তাই তখনই আমি সাহিত্যের কোনো বই খুলে দেখার সাহস করতাম, যখন নিশ্চিত হতাম, এই মুহূর্তে কেউ আমার ধারে-কাছে নেই, কেউ টের পাবে না। কিন্তু এমন মুহূর্ত ছিল বিরল, আর অনাকাঙ্ক্ষিত হানা ছিল প্রায় নিত্যদিনের ব্যাপার। যদি কখনো তারা আমার ব্যাগে, বালিশের নিচে কিংবা কাপড়ের ভাঁজে পেয়ে বসত কোনো কবিতার বই কিংবা গদ্যগ্রন্থ—তাদের চোখে মুখে খেলে যেত এমন উল্লাস, যেন ডাকাতের থলি থেকে উদ্ধার করেছে সোনার মোহর, কিংবা বালকের পকেটে পেয়েছে নিষিদ্ধ সুরার শিশি, কিংবা কোনো লুকিয়ে থাকা প্রেমিক ধরা পড়েছে ঝোপের আড়াল থেকে!
আমি তখন যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম, যে বেদনা আমাকে গ্রাস করত—তা যেন আমার হৃদয়ের সমস্ত কণ্ঠরোধ করে দিত। অথচ তারা জানত না, বোঝেনি—আল্লাহ তাদের সুমতি দিন—এই সাহিত্যই সেই শুদ্ধ বাতাস, যা তাদের এবং তাদের মসজিদের চারপাশ ঘিরে রাখা মানুষের জীবনে প্রশান্তির ছায়া বিস্তার করেছে।
এই সাহিত্যই সেই জ্যোতি, যার আলো না থাকলে তাদের শ্রদ্ধেয় মুফাসসিরগণ কোনোদিন কুরআনের গভীরতর অর্থ উদ্ধার করতে পারতেন না, ব্যাখ্যা করতে পারতেন না সূক্ষ্মতর শরয়ি মাসআলা, যে মাসআলাগুলো এখন তারা আপন করে নিয়েছেন, যেমন কৃষক তার জমির ফসল কুড়ায় আর তা থেকে আহরণ করেন জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য।
সাহিত্য না থাকলে, তাদের প্রখ্যাত ভাষাবিদ পূর্বপুরুষরা আমাদের জন্য রেখে যেতে পারতেন না এই সমৃদ্ধ আরবী ভাষা-জ্ঞান—নাহু, সরফ, বালাগাত, ও বাগ্মিতা—যা আজ তাদের অহংকার, এবং যার মাধ্যমে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করেন সাধারণ মানুষের সামনে।
সত্যিই, তারা যেটিকে অপমান করতেন, সেই সাহিত্যই তাদের অস্তিত্বের মূলে ঢেলে দিয়েছে সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা ও উচ্চতা।
তারা বোঝে না, যেকোনো জ্ঞান অর্জনে সাহিত্যই হচ্ছে শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় সহায়। একজন সাহিত্যচর্চাকারী ব্যক্তি যে রুচিবোধ অর্জন করে, তা তাকে রক্ষা করে সেসব দুর্বল ও বেখাপ্পা লেখনী থেকে, যেগুলো আরবদের প্রকৃত ভাষাশৈলীর ভ্রষ্টতা।
এই না বোঝার ফলেই জাতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে, যার তিক্ততা আজও সে ভুলতে পারেনি।
সাহিত্যই সেই পথচিহ্ন, যা একজন ধর্মজ্ঞকে সাহায্য করে কোরআন-সুন্নাহর গভীর অর্থ বুঝতে। এটা তার ভাষাকে এমন সব চিন্তা প্রকাশে সক্ষম করে তোলে, যা না হলে তা গোপনই থেকে যেত। সাহিত্য মানুষকে করে তোলে সত্যিকার “বাগ্মী”—একজন গঠনমূলক চিন্তাবিদ।
যদি আজকের ধর্মশিক্ষক ও আলেমদের একটি অংশ (যদিও এখন তাদের সংখ্যা কমে এসেছে এবং সময়ের স্রোতে তারা হারিয়ে যাচ্ছেন) তাঁদের পূর্বসূরিদের মতো সাহিত্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতেন—তাহলে তা তাঁদের জন্য এক বড় কল্যাণ বয়ে আনত, এবং তারা অনেক ভুল ব্যাখ্যার হাত থেকে রক্ষা পেতেন।
ধর্ম তো বরাবরই স্পষ্ট পথ আর জোরালো যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআন ও হাদীসের বাণী সব সময়ই ছিল ঝরঝরে, সন্দেহহীন, নির্ভরযোগ্য।
কিন্তু যখন এই আলেমরা সাহিত্যের স্বাদ হারালেন, তখন তাদের রুচিবোধ দুর্বল হয়ে পড়ল, বোঝাপড়ায় এল বিভ্রান্তি। তারা এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে লাগলেন, যাতে প্রতিটি শব্দ বহন করতে লাগল একাধিক, এমনকি বিপরীত অর্থও। ফলে সত্য-মিথ্যা, বাস্তব-রূপক, চিন্তা-কল্পনা—সব কিছুর মধ্যকার প্রাচীর ভেঙে পড়ল।
শব্দগুলো একে অন্যের জমিন দখল করতে লাগল। শব্দের মূল অর্থ আসা-যাওয়ায়, ওঠা-নামায়, সামনে-পেছনে, উপরে-নিচে দুলতে লাগল।
এই সুযোগেই ধর্মকে বিকৃত করতে উদ্যত লোকেরা অনুপ্রবেশ করল। কারণ সাহিত্যের অভ্যাস না থাকায় ভাষার পরিপক্বতা ও গূঢ় ভাব বুঝতে তাঁদের যে মাপকাঠি থাকার কথা ছিল, তা হারিয়ে গিয়েছিল।
আলহামদু লিল্লাহ, প্রথমত আল্লাহর দরবারে, এবং দ্বিতীয়ত সাহিত্যের দরবারে—এই মুক্তির জন্য, এই রক্ষার জন্য, যা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে তাদের হাত থেকে, যারা আমার অন্তরে যা নেই তা হাযির করতে চেয়েছিল, এবং আমার মধ্যে যা ছিল তা মুছে ফেলতে চেয়েছিল। বরং আমি আল্লাহর কাছেই কৃতজ্ঞ, তাঁদের প্রতিও, কারণ তাঁদের কারণে আমি রেহাই পেয়েছি—তাঁদের সেই অপসাহিত্যবোধ, সাহিত্যের প্রতি ঘৃণা, এবং দুর্বোধ্য দৃষ্টিভঙ্গির কল্যাণে—সেই ভয়াবহ বিপদ থেকে।
রক্ষা পেয়েছি আমি সেইসব কষ্টদায়ক বিতর্ক থেকে, যারা কেবল কবির সঙ্গে কবির, লেখকের সঙ্গে লেখকের, এক শৈলীর সঙ্গে আরেক শৈলীর, কিংবা এক অলংকারময় গদ্যের সঙ্গে আরেকটি গদ্যের তুলনাতেই ব্যস্ত থাকে, অথচ হৃদয়ের সঙ্গে সাহিত্যের গভীর সেতুবন্ধন বুঝতে চায় না।
চলবে
লেখক – মুদির, মাদরাসাতু ইকরা


