নববী আলোয় আত্মার জাগরণ — মাওলানা আব্দুর রউফ মক্কী

নববী আলোয় আত্মার জাগরণ — মাওলানা আব্দুর রউফ মক্কী

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : জামিআ ইকরা বাংলাদেশের দিনব্যাপী ইসলাহী ইজতেমায় বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস, হারামাইন শরিফাইনের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আবদুর রউফ মক্কী (দা.বা.) এক হৃদয়স্পর্শী নসীহত পেশ করেন। পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম -এর পাঠকদের জন্য তাঁর সেই বয়ানের অনুবাদ নিচে তুলে ধরা হলো।

বক্তা তাঁর আলোচনা শুরু করেন সেই মহিমান্বিত আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে, যেখানে আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মদ ﷺ–কে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

তেলাওয়াতকৃত আয়াত — সূরা আলে ইমরান : ১৬৪

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ۚ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

এই আয়াত তেলাওয়াত করে তিনি বলেন—
“আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ করেছেন তাঁদের মাঝে একজন রাসূল প্রেরণ করে। যিনি তাঁদের সামনে আল্লাহর কালাম পাঠ করেন, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেন।”

এ আয়াতকে সামনে রেখে তিনি নবী ﷺ–এর দায়িত্বের তিনটি মূল ভিত্তি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন—

১. তিলাওয়াত — আল্লাহর কালাম মানুষের অন্তরে পৌঁছে দেওয়া

মক্কী সাহেব বলেন—
“নবী ﷺ প্রথমত উম্মতের কান ও হৃদয়ে আল্লাহর কালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করেছেন। তেলাওয়াত হলো শিক্ষার প্রথম সোপান। মানুষ আগে শুনবে—তারপর বুঝবে, তারপর গ্রহণ করবে।”

তিনি আরও বলেন—
“কুরআনের প্রতিটি শব্দই নূর। মানুষ অর্থ না বুঝলেও এই নূরের প্রভাব মানুষের অন্তরে পড়ে। এ কারণে কুরআন তেলাওয়াত নিজেই একটি ইবাদত, আল্লাহ এটিকে নবুয়তের আলাদা উদ্দেশ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন।”

২. তাজকিয়া — অন্তরের রোগ দূর করে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা

এরপর তিনি তাজকিয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন—
“ইলমের আলো তখনই মানুষের ভেতরে স্থায়ী হয়, যখন তার অন্তর পরিষ্কার থাকে। নবী ﷺ–এর সবচেয়ে বড় অলৌকিকত্ব ছিল—শুধু তাঁর সোহবতে বসলেই মানুষের অন্তর বদলে যেত, কলুষিত মন পবিত্র হয়ে উঠত।”

তিনি দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন—
“আমরা নবীর যুগে জন্মাইনি, তাঁর সোহবত পাইনি। তাই আমাদের জন্য মুজাহাদা, জিকির, মুরাকাবা—এসব আমল দরকার হয়। অন্তর যত পরিষ্কার হবে, আমল তত নূর পাবে।”

৩. কিতাব ও হিকমত শিক্ষা — কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণ দীক্ষা

তৃতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন—
“কুরআন কেবল পাঠে সীমাবদ্ধ নয়। এর বিধান, এর গভীরতা, এর শানে নুযূল—এ সবই শিখতে হয়। আর হিকমত বলতে বোঝানো হয়েছে সুন্নাহ—নবী ﷺ–এর জীবনব্যাপী বাস্তব শিক্ষা।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন—
“অনেক সময় নবী ﷺ এমন কিছু করেন যা উম্মতের সাধারণ নিয়ম নয়, বরং তাঁর জন্য বিশেষ। এসব পার্থক্য না বুঝলে মানুষ দ্বিধায় পড়ে। তাই কিতাব ও হিকমতের দীক্ষা অপরিহার্য।”

কেন কখনো তাজকিয়া আগে, আর কখনো শিক্ষা আগে?

মক্কী সাহেব বলেন—
“কুরআনে কোথাও আগে তাজকিয়া এসেছে, কোথাও পরে। কারণ মানুষের অবস্থা এক নয়। কারো অন্তর আগে পরিষ্কার করতে হয়, যেন ইলম তার মধ্যে অহংকার না তৈরি করে। আবার শিশুর মতো পবিত্র অন্তরও রয়েছে—তাদের আগে শিক্ষা দেওয়া যায়।”

আলোচনার শেষে তিনি বলেন—
“ইলম ছাড়া আমল অন্ধ, আর তাজকিয়া ছাড়া আমল নিস্তেজ। নবী ﷺ–এর মিশনের তিন ভিত্তি—তেলাওয়াত, তাজকিয়া এবং শিক্ষা—একই সুতোয় গাঁথা। মুমিনের সফলতা এ তিনটিকে একত্রে গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত।”

তিনি সকলকে দোয়ার মাধ্যমে নসিহত শেষ করেন—
“আল্লাহ আমাদের অন্তরকে তাঁর নূরে ভরিয়ে দিন, আমলকে খালেস বানিয়ে দিন, এবং কুরআন-সুন্নাহকে আমাদের জীবনের প্রকৃত পথপ্রদর্শক করে দিন।”

Related Articles