- মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হিশাম
ভূমিকা
(গত পর্বের পর)
আরেক ছিল সাআদ আল-ওয়াররাকের হৃদয়বিদারক গল্প, যে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল ঈসা আন-নাসরানীকে। যখন সে শুনল যে ঈসার পরিবার ফুরাত নদীর তীরবর্তী আর-রক্কা অঞ্চলে একটি দেইর নির্মাণ করেছে, যেখানে ঈসা সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করবে এবং লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে—তখন সাআদের কাছে এই বিশ্বজগৎ এক তীব্র সংকীর্ণ শ্বাসরোধকারী কুঠুরিতে পরিণত হলো।
সে নিজের ঘর পুড়িয়ে দিলো, আপনজনদের ত্যাগ করল, ভাই-বন্ধুদের বিদায় জানালো, এবং ছুটে চলল সেই নির্জন মরুভূমির দিকে, যেখানে ছিল সেই দেইর—এই আশায়, হয়তো কোনো উপায় মিলবে ঈসার কাছে পৌঁছাবার।
সে পাদ্রিদের সামনে নিজেকে হীন করে দিলো, করজোড়ে মিনতি করল, তাদের সন্তুষ্ট করতে যা যা সম্ভব সবই করল, কিন্তু কিছুই তার কোনো উপকারে এল না।
শেষমেশ, ব্যর্থতা, হাহাকার ও বিচ্ছিন্নতার তীব্র যন্ত্রণা তাকে পাগল করে দিল। সে তার জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলল, নগ্ন হয়ে গেল, এবং উদ্ভ্রান্ত এক ভবঘুরে হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তার আর কোনো কাজ ছিল না, কোনো লক্ষ্য ছিল না—শুধু গাছের ডালে বসা প্রতিটি পাখির দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মিনতি জানাত, “দোহায় তোমার, হে পাখি, দয়া করে আমার বার্তা ঈসার কাছে পৌঁছে দাও!”
এভাবেই একদিন কিছু লোক তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেল দেইরের পাশেই—নিঃসঙ্গ, নীরব, ভালোবাসায় দগ্ধ এক হৃদয়ভাঙা প্রাণ, যাকে আর কোনো শোক স্পর্শ করতে পারবে না।
আর এইসব দুঃখগাথা, এইসব যন্ত্রণার অন্তিম পরিণতি আমার দৃষ্টিতে এমন চিত্র হয়ে ধরা দিত, যেখানে অশ্রু হয়ে ওঠে মমত্ববোধের প্রতীক, করুণ হৃদয়ের নিঃশব্দ ভাষা। তাই যখন আমি দুঃখকে ভালোবাসতে শিখলাম, তখন অশ্রুকেও আপন করে নিলাম।
কিংবা আমি জীবনকে দেখতাম শুধু দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের আবাসস্থল হিসেবে, বেদনা ও বিষাদের চিরনিবাস রূপে, আর এই জীবনের প্রকৃত গল্প বর্ণনাকারীরা একমাত্র তারাই— যারা কাঁদে, বুক ভাসায় চোখের জলে। সেইজন্য যখন আমি সত্যকে ভালোবাসলাম সাথে কান্নাকেও আপন করে নিলাম। কারণ কান্নাই সত্যের সজীব প্রকাশ।
অথবা আমার জীবনের সঙ্গে সেই হতভাগ্য, বঞ্চিত মানুষের জীবনের গভীর কোনো সাযুজ্য আছে— কোনো এক অদৃশ্য বন্ধনে আমি বাঁধা তাদের সঙ্গে, তাই তাদের আহাজারিতে আমি পাই সান্ত্বনা, তাদের ক্রন্দনে আমি শুনি আমার নিজের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি, ঠিক যেমন, প্রিয়জনের জন্য কাঁদে নিশীথের পাখি, বা নীরব আকাশ থেকে ঝরে পড়ে নিঃসীম মেঘের কান্না।
হতে পারে আমি চাচ্ছিলাম কোনো এক নিভৃতে দু-এক বিন্দু অশ্রু ঝরাতে— যার মধ্যে দিয়ে আমি মুক্তি পাব আমার অন্তর্লুকানো জ্বালা থেকে। তাই যখন অন্যেরা কাঁদতে লাগল, আর আমি কাঁদলাম তাদের সঙ্গে, তখন সেই অশ্রুদের মাঝে আমি খুঁজে পেলাম আমার প্রাণের প্রতিকারের পথ, ব্যথিত হৃদয়ের প্রশান্তি।
অথবা আমি ভাবতাম— এই জগতের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে কবিতায়, আর কবিতা হলো সেই অনির্বচনীয় প্রবাহ, যা বিদীর্ণ হৃদয়ের গভীর ক্ষত থেকে উৎসারিত হয়ে কাঁদতে থাকা চোখে অশ্রুরূপে গড়িয়ে পড়ে, এবং নিঃশ্বাসের ভারে উঠে আসে বুকের অতল গহ্বর থেকে— দীর্ঘশ্বাসের রূপে।
এগুলোই ছিল আমার সেই দিনগুলোর গল্প, যখন জীবন আমাকে সাময়িক হলেও সুখের ছোঁয়া দিয়েছিল— এমন সোনালী মুহূর্ত, যা হয়তো কারও জীবনে এরকম কখনোই আসেনি। সেই স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে জ্বলজ্বল করছে, দীর্ঘ বছর পেরিয়েও সে স্মৃতির প্রলেপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে আমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরায়।
কিন্তু তারপর আমি ফিরে আসি কঠোর বাস্তবতার কাছে, যেখানে আমার হাত খালি—কিছুই নেই আমার ঝুলিতে। আমি দাঁড়াই অচেনা এক অন্ধকার জগতে, যেখানে সত্য আর যন্ত্রণা সদা বিরাজমান। সেই জগতে আমি যেন একজন বিভ্রান্ত পরদেশী, যে অচেনা এক শহরের কোণে দাঁড়িয়ে—যে শহর তার পরিচিত নয়, যেখানে তার নেই কোনো বসত বাড়ি।
আমি সেই সমাজের দিকে তাকালাম এমন এক দিশেহারা আগন্তুকের দৃষ্টিতে, যে এসে পড়েছে এমন এক অচেনা জনপদে—যার সঙ্গে তার নেই কোনো পূর্বপরিচয়, নেই বসবাসের কোনো স্মৃতি। তখন আমার চোখে ধরা পড়ল সেই সমাজের কলঙ্ক ও অনাচার, তার পরিবেশের ঘন অন্ধকার, আকাশের ধূসর বিবর্ণতা; দেখলাম, তুচ্ছ এক অণু কিংবা সামান্য এক দানা, একটুখানি বাতাস কিংবা ধূলিকণার মতো নগণ্য বিষয় নিয়েও মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত।
দেখলাম, মানুষের অন্তরের গোপন সত্য আর মুখের প্রকাশিত অভিব্যক্তির মধ্যে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে ব্যবধান; ন্যায়ের ওপর শক্তির দাপট, জ্ঞানের ওপর অজ্ঞতার প্রাধান্য; হৃদয়গুলো করুণাশূন্য, চোখগুলো অশ্রুহীন। দরিদ্রেরা এতটাই অসহায় যে, ধনীদের ভোজসভার উচ্ছিষ্টটুকুও তাদের জোটে না; অথচ ধনীরা দরিদ্রদের মাংস চিবিয়ে খায়—তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, তাদের দারিদ্র্যকে শোষণ করে।
আমি দেখলাম, মানুষ কীভাবে দোষ ও পাপাচারের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত বলে জাহির করে। এমনকি যে ব্যক্তি নিজেও সেই দোষে দুষ্ট নয়, সেও লোকের মন জয় করার জন্য দোষটিকে নিজের বলে দাবি করে; কারণ সে জানে, মানুষ যে দোষকে পছন্দ করে, সেই দোষের প্রতি নিজের সমর্থন প্রকাশ করলেই তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
অন্যদিকে, দেখলাম সদ্গুণ থেকে মানুষ কীভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার পরিবর্তে বরং তা থেকে পালিয়ে বেড়ায়! যে ব্যক্তি সদ্গুণের অধিকারী, সে-ও তাকে বিদ্রূপকারী ও তার প্রতি অসন্তুষ্ট লোকদের ভয়ে নিজের গুণ আড়াল করে। তার পালিয়ে যাওয়ার অবস্থা এমন, যেন কোনো উলঙ্গ ব্যক্তি নিজের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হওয়ার ভয়ে পালাচ্ছে, কিংবা কলঙ্কের দাগে চিহ্নিত কেউ অপমান থেকে বাঁচতে ছুটে পালাচ্ছে।
আরও দেখলাম, একজন পুরুষ ও একজন নারী নিজেদের শরীর থেকে পোশাক খুলে নিজ নিজ সামনে রাখল। তারপর তারা পরস্পরের সঙ্গে পোশাক অদলবদল করল। নারীটি পুরুষের আলখাল্লা পরল, আর পুরুষটি পরল নারীর ঢিলেঢালা জামা। ফলে পুরুষটি হয়ে উঠল এমন এক নারীর মতো, যার আচরণে নারীদের কোমলতা ও লাস্যময় ভঙ্গি; আর নারীটি হয়ে উঠল এমন এক পুরুষের মতো, যার আচরণে পুরুষদের ঔদ্ধত্য, বেপরোয়া ভাব ও কৌশলী চাতুর্য।
আমি দেখেছি, ধর্ম— যে একসময় ছিল শান্তির ছায়াময় বৃক্ষ, যেখানে মানুষ জীবনের দহন থেকে আশ্রয় নিত, এখন তা মানুষের কবলে পড়ে রূপ নিয়েছে বিষাক্ত তীরের, যার দ্বারা প্রতিটি ব্যক্তি তার ভাইয়ের বুকে আঘাত হানতে ব্যস্ত, এবং তা নিশানায় লাগছেও ঠিক।
আমি দেখেছি, নামগুলো হারিয়ে ফেলেছে তাদের সার্থকতা, আর সেগুলো যাদের জন্য রাখা হয়েছে, তারাও যেন বিপথে! সংজ্ঞা ও সীমানা গুলিয়ে গেছে, এমন কিছুতে পরিণত হয়েছে, যা তারা নয়। কোনো কিছু বাদ পড়ে গেছে তো তার জায়গায় অন্য কিছু ঢুকে পড়েছে।
মিতব্যয়িতাকে বলা হচ্ছে কৃপণতা, উদারতাকে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে অপচয়ের, সহনশীলতা হয়েছে কাপুরুষতা, ভদ্রতা হয়েছে নির্লজ্জতা, উচ্ছৃঙ্খলতা রূপ নিচ্ছে দক্ষতা বলে, অশ্লীলতা হয়ে উঠছে সাহসিকতা, অশালীন আচরণকে দেখা হচ্ছে স্বাধীনতা হিসেবে। যে সত্যিকারের সদগুণের পথে চলতে চায়, তার জন্য সেই পথগুলোই এখন অস্পষ্ট। কারণ প্রতিটি পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতারণা ও মিথ্যার কোনো না কোনো পথিকৃৎ, যে তাকে বিভ্রান্ত করে অন্য পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আমি বিশ্বাস করতাম—সাহিত্য এক অন্তর-অবস্থানের নাম, এক ধ্যানমগ্ন আত্মিক অভ্যুদয়, যা আত্মাকে এমন এক স্তরে উন্নীত করে, যেখানে সে নিজেকে কোনো মন্দ কর্মের দিকে এগোতে দেয় না, এমনকি তা কল্পনায় আনতেও সংকোচ বোধ করে। সে কখনও এমন অনাচারীর সহচর বা সমর্থক হয়ে ওঠে না, যে পাপকে আলিঙ্গন করেছে। কিন্তু যদি প্রবৃত্তির কোনো ছলনাময় আকর্ষণ, কিংবা মনের কোনো হঠাৎ উৎক্ষিপ্ত তরঙ্গ তাকে সেই পথে টেনে নিয়ে যায়, তাহলেও সে যখন সেই অপরাধে নিমজ্জিত হয় বা তার স্পর্শে আক্রান্ত হয়, তখন অন্তরের গহিনে এক যন্ত্রণার বিস্ফোরণ ঘটে, এক গোপন বেদনাবিধুর অস্বস্তি জন্ম নেয়, যা তার জীবনের স্বাদে বিষ ঢেলে দেয়, শান্তি বিঘ্নিত করে, ঘুম কেড়ে নেয়, এবং তার চেতনাকে দীর্ঘ, বিষণ্ন জাগরণে নিমগ্ন করে রাখে। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই পাপাচার তার আত্মার সত্য রূপ নয়, বরং এক অস্থায়ী জৈব প্রবৃত্তি, এক বাহ্যিক কলুষতা, যা আত্মার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও অনুভূতির মহিমার সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক, এবং যার মধ্যে হৃদয়ের বিশুদ্ধ অনুভবের কোনো ছায়াও নেই।
মানুষের দৃষ্টিতে যে-মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি ‘সুশীল’, ‘সৌম্য’ ও ‘সুন্দর চরিত্রের’ বলে গণ্য করা হয়, অনেক সময় সেই-ই হয় এমন এক ব্যক্তি—যে প্রতিশ্রুতি দেয়, অথচ তা পূরণ করে না; যে মিথ্যা বলে, কিন্তু এমন মসৃণ ও মার্জিত ভঙ্গিতে, যেন সে সত্যভাষীই; যে বক্ষে দহন করে ক্রোধ ও হিংসার দাবানল, অথচ মুখে হাসির আলোকচ্ছটা; যে চুরি করে, কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর আর বিচারকের বিভ্রান্তি কাজে লাগিয়ে নিজেকে নিষ্কলঙ্ক প্রমাণ করে; যে অন্তরে সমস্ত মানুষকে ঘৃণা করে, অথচ জিভে সকলের প্রতি প্রেমের উদগার ঝরায়; যে মুখস্থ রেখেছে সামাজিকতার নামক এক যান্ত্রিক শিষ্টাচারের বাগধারা—দেখাশোনা, শুভেচ্ছা, শোক, আহার্য, পানভোজন—সবই নিছক ভদ্রতার ভান, খোলসমাত্র, যা অধিকাংশ সময়ই হৃদয়ের ক্ষুদ্রতা ও মনোবৃত্তির নিচুতার পরিচায়ক, আত্মিক পরিপূর্ণতার নয়।
এই দ্বিচারিতা, এই মেকি সৌজন্যের ছায়াছবি আমাকে গভীরভাবে আঘাত করল। আমার অন্তরে এক অজানা অস্থিরতা জেগে উঠল, যা আমি সংবরণ করতে পারলাম না। যেন হঠাৎ চোখ খুলে এমন এক দৃশ্য দেখলাম, যা বিস্ময়কর, অচেনা, অপরিচিত। আমার হৃদয় যেন বিশ্বাস করেছিল, কল্পনার জগৎ যেটি আমি এতদিন ধারণ করতাম, তাই-ই বুঝি বাস্তব জগৎ—আর বাস্তবতাকে যখন চাক্ষুষ করলাম, তখন তার সঙ্গে কল্পনার সেই সৌন্দর্যের ব্যবধান আমাকে বিচলিত করে তুলল, হতবিহ্বল করে দিল।
তখন আমি নিজের মর্মপীড়াকে রূপ দিতে থাকলাম শব্দে, বাক্যে, অনুভবে—ঠিক যেমন করে দমবন্ধ মানুষ হঠাৎ নিঃশ্বাস নেয়, কিংবা ব্যথাতুর হৃদয় নীরবে কাঁদে। কিছু মানুষ আমার এই আত্মনিঃস্বাসকে ‘লেখা’ বলে অভিহিত করল। তারপর তারা একে একে তা পছন্দ করতে শুরু করল, আমাকে উৎসাহ দিল আরও লেখার জন্য। আমিও, প্রতিক্রিয়ার সেই উষ্ণতায় আশাবাদী হয়ে উঠলাম—হয়তো আমি তাদের অন্তরের কিছু ছুঁয়ে যেতে পারছি। এভাবেই, অজান্তেই একদিন আমি হয়ে উঠলাম একজন ‘লেখক’।
চলবে
অনুবাদক – মুদির, মাদরাসাতু ইকরা


