কেমন ছিলেন ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ.
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আমার প্রিয় বন্ধু লিয়াকত আলী মাসউদ সাহেবের ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সস্পর্কে একটা অনুভুতি দেখে মনে মনে ভাবছিলাম, আমি কিছু লিখব। ফেদায়ে মিল্লাত এর ব্যাপারে আমার কিছু অনুভুতি প্রকাশ করব। কেননা ফেদায়ে মিল্লাতকে বহুবার দেখেছি, তাঁর বয়ান শুনেছি। তাঁর সংস্পর্শে বসে নিজে ধন্য হয়েছি অনেকবার।
এক সময় আমি ফেদায়ে মিল্লাতের মত পাগড়ী মাথায় বেঁধে রাখতাম। তাঁর পাগড়ী বাঁধাটা আমার খুব ভাল লাগত। সবচেয়ে বেশী ভাল লাগত ফেদায়ে মিল্লাতের বয়ান। উর্দু হিন্দি মিশ্রিত। হিন্দি ভাষাটা বাংলার কাছাকাছি। সব শ্রোতা খুব সুন্দরভাবে বুঝতে সক্ষম ছিল।
যাইহোক, ফেদায়ে মিল্লাত সম্পর্কে কিছু অনুভুতি প্রকাশের ভাষা কিন্তু আমার নেই। তিনি যে মাপের ব্যক্তি, সে তুলনায় তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখার মত পুঁজি ও আমার কলমী শক্তি অনেক দুর্বল।
মালিবাগ পড়াকালীন ফেদায়ে মিল্লাত যখন আসতেন, সে সময়ে পোস্টার করা হত মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। সে সময়ে পোস্টার লেখা হত,
” বর্তমান বিশ্বের ইসলামী রেঁনেসার অগ্রদূত, আওলাদে রাসুল, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী। আমরা যখন মাইকিং করতাম, ঠিক হুবহু ঐ লকবগুলো ব্যবহার করেছি।
তবে তখন অত কিছু বোঝার যোগ্যতা আমাদের ছিল না। কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. হুজুর কিন্তু এসব লকবগুলো বলতেন। ফেদায়ে মিল্লাতের বয়ানের আগে কাজি সাহেব ঠিক অনেক উন্নত ভাষায় এবং যুঁৎসই বাচন ভঙ্গি দিয়ে তাঁর নামের শুরুতে অনেক উপাধী যোগ করতেন।
কাজি সাহেব তো উঁচু মানের সাহিত্যিক ছিলেন, আবার ফেদায়ে মিল্লাত হলেন, তাঁর প্রিয় উস্তাদের সন্তান। সে হিসেবে অনেক মহব্বত- ভালবাসা নিয়ে তাঁর নাম উপস্থাপন করেছেন সব সময়।
একমাত্র কাজি সাহেবের মত ব্যক্তিরাই ফেদায়ে মিল্লাতের মত মানুষের গুণাগুণ বর্ননা করতে পারেন। তাঁকেই মানায়। যে রকম ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী এক বিশ্ব বরেণ্য বক্তিত্ব। ঠিক কাজি সাহেব ছিলেন আরেক যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। কথায় বলে, ” রতনে রতন চিনে”। কাজি সাহেবই চিনতেন ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানীকে।
আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব, তাঁর সু প্রসিদ্ধ বই ” বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর” এর মধ্যে সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছেন। তা নিম্ন রূপ:
” মানবাত্মার মুক্তির দিক- নির্দেশনায় মজলুম মানবতার কল্যাণে, সমাজ সেবায় এর অবদান সকল ছাত্রাপেক্ষা ( হুসাইন আহমদ মাদানী এর সকল ছাত্র থেকে) অধিক। উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে গোটা বিশ্বের মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের দিক- নির্দেশনায়, ইসলাহে নফসের খাতিরে বিরাম- বিশ্রামহীনভাবে উল্কার মত ছুটে চলেছে। আজ ইনি মুরশিদুল আলমের মর্যাদায় ভূষিত। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানের সর্বাপেক্ষা দরদী বন্ধু, আশ্রয় স্থল”।
কাজি সাহেবের এই অনুভুতিটুকু আমার কাছে সব থেকে শ্রেয় মনে হয়। অতি সংক্ষেপে ফেদায়ে মিল্লাত সম্পর্কে পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। এটা অবশ্য ফেদায়ে মিল্লাতের জীবদ্দশায়ের সময়ের বর্ণনা।
আসলেই ফেদায়ে মিল্লাত বিরাম- বিশ্রামহীনভাবে উল্কার মত ছুটে বেড়ায়ে ছিলেন মানবতার কল্যাণে। নিজের জন্য নয়। নিজের পরিবারের জন্য নয়। শুধু মানবাত্মার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সারাটা জীবন।
যেমনটি মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় পিতা, কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.। ফেদায়ে মিল্লাতের জীবনটা কেটেছিল উম্মতের ফিকিরে। দেশ দেশান্তরে ছুটে বেড়ায়েছেন তিনি।
এই বাংলাদেশকে নিয়ে যে কত ভেবেছেন। কত ফিকির করেছেন। এদেশের মানুষের বিপদ-আপদে সব সময় পাশে থাকতেন তিনি।
এক ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। মজলুম মানুষের পরম বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসআদ মাদানী। আবার স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তাঁর আগমন ঘটত বছরে কয়েকবার।
আবার এদেশের কিছু মানুষের হিংসার যাতাকলে পিষ্ট হয়েছেন আসআদ মাদানী। যিনি ছিলেন আমাদের দেশের এক পরম বন্ধু, সেই মহান ব্যক্তিকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত যেতে হয়েছে। ঢাকাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সেটা ছিল নব্বই দশকের শুরুর দিকের ঘটনা।
তুবুও আসআদ মাদানী এই দেশের কল্যাণ কামী ছিলেন। এদেশের পথ ভোলা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য, দ্বীনি দাওয়াত নিয়ে বাংলাদেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে।
বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বব্যাপি তাঁর কদম ছুঁটে চলত বিরামহীন ভাবে। মজলুম মানবতার কল্যাণে হণ্যে হয়ে ঘুরতেন পুরো দুনিয়া জুড়ে।
পরিশেষে দুআ কামনা করি। তাঁর মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসীন করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


