নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রসূতি সেবা
মোঃ হাবিবুর রহমান : ময়নার বয়স এখন ২০ বছর। বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার বিরবিরি গ্রামে। ষোল বছর বয়সে ময়নার বিয়ে হয় পাশের গ্রামের মজিদের সাথে। মজিদ কৃষি কাজ করেন, পাশাপাশি মাছের ব্যবসা আছে। আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো। অনেক ধুমধাম করে কিশোরী বয়সে ময়নার বিয়ে হয়। গত দুই বছর আগে একটি কন্যা সন্তান হয়েছে ময়নার। আবারও সে সন্তান সম্ভবা। পরিবারের সকলের ইচ্ছা এবার একটি ছেলে হোক ময়নার। কিন্তু দুঃখের বিষয় ময়নার আবারো কন্যা সন্তান হলো। বাড়ির সবারই মন খারাপ।
ময়নার প্রতি দেখা গেল অযত্ন আর অবহেলা। যতই দিন যাচ্ছে ময়নার প্রতি পরিবারের সবার অবহেলার মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে। অপুষ্টি আর অযত্নে ময়নার শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগলো। একসময় ময়নার প্রসব পরবর্তী জটিলতা দেখা দেয় এবং এক পর্যায়ে ময়নার স্বামী মজিদ তাকে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় ময়না অবুঝ দু’টি শিশু রেখে মারা যান। মা হারা হয় শিশু দু’টি, সন্তান হারা হন ময়নার মা-বাবা।
বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজে আইনতঃ নিষিদ্ধ হলেও এখনও গ্রামগঞ্জে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিয়ের বছর পার হতে না হতেই তারা গর্ভবতীও হয়ে পড়ছে। অপরিপক্ক অবস্থায় যখন সে মা হতে যায়, তখন তার বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় চারদিক থেকে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমলেও গ্রামাঞ্চলে এখনও অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার হার অনেক বেশি। কারণ তাদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। নিরাপত্তা, অশিক্ষা আর কুসংস্কারের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় এ সকল মানুষদের। সচেতনতার অভাবে অল্প বয়সে গর্ভধারণ করায় মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার জীবিত শিশুর জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশ সরকারের ২০১৬ সালের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ বলছে, দেশে এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হয়। বর্তমান সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পসূতি মায়ের দক্ষ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৭০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ২০১৯ সালে মাতৃমৃত্যুর হার লাখে ১৭২ জন।
গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে মায়েরা যাতে হাতের কাছে মাতৃস্বাস্থ্য সুবিধা পান সে লক্ষ্যে প্রতি ছয় হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে করা হয়েছে। শহরের বস্তি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চড়, হাওর-বাওর ও পার্ব্বত্য এলাকায় নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরন ও সেবা কার্যক্রম।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ঘোষনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সাল থেকে দেশব্যাপী ’নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন শুরু হয়েছে। নিরাপদ মাতৃত্ব এবং মা ও শিশুর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাই দিবসটির লক্ষ্য। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘মর্যাদা ও অধিকার ঃ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতি সেবার অঙ্গীকার’। এ বছর মানসম্মত গর্ভকালীন সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং নারীর স্বাস্থ্য অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নারীর মাতৃত্বকে নিরাপদ করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ। প্রতিটি পিতামাতার উচিৎ তার মেয়ে সন্তানকে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দেয়া। কারণ এর আগে মেয়েদের জননতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। নারী হিসেবে সংসার পরিচালনার মানসিকতা গড়ে ওঠে না। এছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সঠিক ধারনা থাকে না তাদের।
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে গত কয়েক বছরে সাফল্য আসলেও এখনো এ ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা এখনও অনেক কম। প্রয়োজনের তুলনায় প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংখ্যাও কম। তবে সরকারের এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে প্রশিক্ষিত নার্স ও দক্ষ ধাত্রীর ভূমিকা অপরিহার্য। একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নার্স, ধাত্রী তৈরিতে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও অনুকূল কর্মপরিবেশ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রসবকালীন যত্ন ছাড়াও প্রসবপরবর্তী জরুরি সেবাযত্ন প্রয়োজন। যা প্রসুতি মা ও সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মার সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, মায়ের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম ও যত্নের ব্যবস্থা করা, শিশুর নাভীর যত্ন করা, শিশুর টিকা ও শিশুকে ছয়মাস পর্যন্ত একমাত্র খাবার হিসাবে মায়ের দুখ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ইসলামে প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন রক্ষার জন্য জোরালো তাগিদ দেয়া হয়েছে।
মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষার অভাব নিরাপত্তাহীনতা ও ধর্মীয় গোঁড়মির কারণে গ্রামাঞ্চলে অবভিভাবকরা মেয়েদের বোঝা মনে করেন এবং অল্প বয়সে তাদের বিয়ে দিয়ে দেন। ফলে বিয়ের প্রথম বছরেই তারা সন্তান ধারন করেন। সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছরের আগে সবাই শিশু। একজন শিশু অরেকজন শিশুর জন্ম দিচ্ছে। এ কারণে মা ও শিশুর উভয়েরই সঠিক পরিচর্যা না হওয়ায় পুষ্টিহীন, রোগাক্রান্ত মা ও শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অসচেতনতা এবং মাতৃত্বকালীন অপুষ্টির কারণে মায়েদের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে। ফলে অনেক সময় মা ও নবজাতক উভয়েরই মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
পরিবারে নবজাতক ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর মাকে পুর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়। তাকে ভারী ও কঠিন কাজ করতে দেয়া ঠিক নয়। ঘন ঘন সন্তান ধারন না করা, একটা নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে সন্তান ধারণ, প্রসব পূর্ব এবং প্রবস পরবর্তী সেবাযত্নের জন্য মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসক, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে। এতে করে গ্রামীণ মায়েরা সচেতন হবেন এবং সঠিক পরামর্শ নিতে পারবেন। যেসব মা স্বাস্থ্য সেবা পান না তাদের কাছে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে। প্রসূতির প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মাতৃস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কারণ প্রসূতির রয়েছে নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার। মাতৃস্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের আপামর জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। প্রসূতিকে সুস্থ রাখতে পারলে নবজাতক সুস্থ থাকবে এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ জাতি। ফলে উন্নত আর সমৃদ্ধ হবে দেশ।
লেখক : কলামিস্ট


