পাথেয় রিপোর্ট : সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে বেকায়দায় থাকা ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ মানুষই ট্রাফিক আইন মানে না। শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের এমন মন্তব্য আসে।
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কেন কঠিন- সে বিষয়ে একটি লম্বা তালিকা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, রাস্তা অপ্রশস্ত হওয়ায়, ‘প্রয়োজনের তুলনায়’ গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায়, অনিয়ন্ত্রিত যাত্রী পারাপারের কারণে, বাস স্টপজের অপ্রতুলতায়, যত্রতত্র গাড়ি রাখায় এবং অনেক বেশি মোটরসাইকেল চলাচল করায় সড়কে শৃঙ্খলা বিধান কষ্টকর হয়ে যায়।
তাছাড়া রাস্তা খোঁড়াখুড়ি; সড়কের পাশে কমিউনিটি সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বাজার, পেট্রোল পাম্পের মত স্থাপনার উপস্থিতি ছাড়াও দেশের মানুষের ‘আইন না মানার প্রবণতার কারণে’ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, “বিদেশে যেখানে ৯৮ শতাংশ মানুষ আইন মানে বাংলাদেশে সেখানে ৯০ ভাগ মানুষ আইন মানেনা। এই ৯০জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে কঠিন অসম্ভব।”
সংবাদ সম্মেলনে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ট্রাফিকের সঙ্গে চারটি বিষয় জড়িত। এর একটি হচ্ছে ‘এনফোরসমেন্ট’, যেটা পুলিশ করে। রাস্তার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টা দেখে সিটি করপোরেশন। রাস্তা ও ট্রাফিক ‘এনভারনমেন্ট’ দেখা সড়ক বিভাগের কাজ। আর ‘ট্রাফিক এডুকেশন’ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও কাজ করে থাকে। “এত কিছুর পরেও দিন শেষে সকল দায়দয়িত্ব পুলিশের উপর বর্তায়। এগুলো সমন্বয় করে কাজ করলে অনেক অগ্রগতি হবে। এ ব্যাপারে কাজ চলছে।”
গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাজধানী থেকে তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। নয় দফা দাবিতে এই আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা রাজপথে পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে চালকের লাইসেন্স ও যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করা শুরু করে। সেখানে দেখা যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও আইন প্রণেতারাও অনেক ক্ষেত্রে আইন মানছেন না।
এই প্রেক্ষাপটে গত ৫ অগাস্ট শুরু হয় ট্রাফিক সপ্তাহ, যা শনিবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শনিবার সংবাদ সম্মেলনে এসে তিন দিন সময় বাড়ানোর কথা জানান আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, ট্রাফিক সপ্তাহ শুরুর পর সড়কে শৃঙ্খলায় ‘অগ্রগতি’ হয়েছে। এটা টেকসই করতে অভিযান চলমান রাখা দরকার। এ জন্য ট্রাফিক সপ্তাহ ১৪ অগাস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।
সড়কে নেমে নিয়ম ভাঙলে এখন আর কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ার করেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, “ব্যক্তি বা পেশা দেখার কোনো সুযোগ নেই। এখন যেই হোক, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে “ আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, উল্টোপথে গাড়ি চালানোসহ সিগন্যাল না মানা, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আগেও আইন প্রয়োগ করা হয়েছে; তবে সেটা ছিল ‘অপ্রতুল’।
“এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নিয়মিত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়াও ভিডিও মামলা করা হচ্ছে। গত দুই বছরে ৯৯ হাজার ভিডিও মামলা করা হয়েছে।” দুর্ঘটনার জন্য শুধু বাস চালককে দায়ী না করে পথচারীদের আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার না হওয়া, চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে বা মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার না হয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।” পাল্লা দিয়ে গাড়ি না চালানো, গাড়ি চালনার সময় ধূমপান কিংবা মোবাইলে কথা বলা, লাইসেন্স ছাড়া বা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের দিয়ে গাড়ি চালানোর মত বিষয়গুলোও তিনি বন্ধ করতে অনুরোধ করেন।
রাস্তায় রুট পারমিট ছাড়া আর গাড়ি নামতে দেওয়া হবে না জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, “আমরা দেখেছি কোনো কোনো পরিবহনের ৫০টি রুট পরমিট আছে, কিন্তু গাড়ি চলছে ২০০টি।” চালক, মালিক বা পথচারী- আইন যেই অমান্য করবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেন ঢাকার পুলিশ প্রধান। সকলের সহযোগিতা নিয়ে ট্রাফিক আইন কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “বিভিন্ন অজুহাতে রাস্তা অবরোধ করে জন-মানুষের দুর্ভোগ কারো কাম্য হতে পারে না। এটা সকলকে পরিহার করতে হবে।”
আইন প্রয়োগে কঠোর হতে গিয়ে সড়কে গণপরিবহন কমে গেলে সে দায়িত্ব পুলিশের নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, সড়কে গাড়ি থাকবে কি থাকবে না এটা পুলিশের দেখার বিষয় না। পুলিশ দেখবে গাড়ির কাগজ ঠিক আছে কিনা, চালকের বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা, ঠিক রুটে চলছে কিনা বা ট্রাফিক আইন অমান্য করছে কিনা। অতীতে এসব বিষয় ছাড় দিতে গিয়েই অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে মন্তব্য করে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে আর বিশৃঙ্খলা বাড়াতে চাই না।”


