মুহাম্মদপুরে তাবলীগী জোড় না রাজনৈতিক সমাবেশ?

মুহাম্মদপুরে তাবলীগী জোড় না রাজনৈতিক সমাবেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মুহাম্মদপুরের তাবলীগী জোড়ে দেশের ইসলামী রাজনীতিক নেতারাও থাকছেন বলে জানা গেছে। আলমি শূরাকে মেনে দিল্লীর নিজামুদ্দীন মারকাজের বিরোধিতা করে ২৮ জুলাই শনিবার মোহাম্মদপুর ঈদগাহ ময়দানে ওয়াজাহাতি জোড়ের নামে সমাবেশ করবে নিজামুদ্দীনবিরোধী নেতারা। এতে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত একটি লিফলেটে দেখা যায়, ‘চলো চলো ঢাকা চলো, ওয়াজাহাতি জোড় সফল করো’ স্লোগানসংবলিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে সারা দেশে।

এ সমাবেশে হেফাজত আমির আল্লামা আহমদ শফীকেও উপস্থিত করার কথা রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, তাবলীগের দ্বন্দ্ব নিরসনের বিষয়টি উচ্চারিত হলেও এতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, দলের শীর্ষ নেতা আল্লামা আশরাফ আলী, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, খেলাফতে ইসলামীর চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী, জমিয়তে উলামা ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমীসহ ইসলামী দলগুলোর ছাত্রসংগঠন ও মূলদলের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যেই রাজধানীর মাদরাসাগুলোতে এ নিয়ে শুরু হয়েছে প্রচার-প্রচারণা।

জানা যায়, কাকরাইল থেকে এ বিষয়ে কোনো চিঠি না দেয়া হলেও ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে কাকরাইলেরই একজন মুরুব্বীর নামে।

তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভি ও নিজামুদ্দীন মার্কাজের বিরোধিতা করে আলমী শূরাকে মেনে নেয়ার দাবিতেই এ জোড় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মূলত তাবলীগের মূল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিজামুদ্দীন মার্কাজের সমান ক্ষমতা দাবি করে আলমি শুরা গঠন করে রাইভেন্ড মার্কাজ।
একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবরে বলা হয়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অংশদারত্বের বিবাদে দিল্লি-লাহোর জড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদেও ছড়িয়ে পড়ে এ বিভক্তি। ১১ জন শুরা সদস্যের মধ্যে ৬ জন নিজামুদ্দীনের পক্ষে থাকলেও বাকি ৫ জন আলমি শুরার পক্ষে অবস্থান নেন।

আলোচিত ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ও ২০ দলীয় জোটভুক্ত কয়েকজন ইসলামি রাজনীতিবিদও যুক্ত হন আলমি শুরার পক্ষে। এদিকে সিলেটের সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একজন নেতা হেফাজতের নাম ভাঙিয়ে ভোট চেয়েছেন বলে অভিযোহ উঠেছে।

তাবলিগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার পরই তাবলিগের কার্যক্রম রাজপথে গড়ানো শুরু করে। বিগত বিশ্ব ইজতেমায় তাবলিগের বিশ্ব আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী ও নিজামুদ্দীনের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ এসেও ইজতেমায় অংশ নিতে পারেনি এ নেতাদের বিরোধিতায়।

তাবলিগের পুরনো সাথিদের ৫ দিনের জোড় ও আগামী ইজতেমাকে কেন্দ্র করে আবারো তৎপর হয়ে উঠেছে হেফাজতে ইসলাম ও ২০ দলীয় জোটের শরিক নেতারা।

প্রসঙ্গত, ২৮ জুলাই প্রকাশ্য সমাবেশের মাধ্যমে সরকারকে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চান। এ সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে ২৩ জুলাই মোহাম্মদপুর কবরস্থান মসজিদে বৈঠকে বসেন নেতারা।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম সাবেক শরিক দল খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে অংশ্রগ্রহণ করেন ২০ দলীয় জোটভুক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা উত্তর জোনের যুগ্ম আহ্বায়ক কেফায়েতুল্লা আজহারী।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে ৫০ হাজারের বেশি লোকসমাগম করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। সমাবেশে আগতদের অবস্থান ও থাকা-খাওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া এলাকার মাদ্রাসাগুলো ব্যবহার করা হবে।

সমাবেশে লোকসমাগম নিশ্চিত করতে ঢাকার সব মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ও উচ্চতর বিভাগের ছাত্রদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অরাজনৈতিক তাবলিগ জামাতের বিষয়টির এভাবে রাজনীতিকরণ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জনৈক রাজনীতিক বলেন, দেখুন, আমরা সবাই তাবলীগ করি। রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের মতপার্থক্য থাকলেও তাবলীগ করার ক্ষেত্রে কোনো মতপার্থক্য নেই।

তবে কাকরাইল মসজিদের কয়েকজন মুকিম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাবলিগের সব কার্যক্রম প্রচলিত রীতি ও রাজনীতির বাইরে ছিল।
সেখানে এভাবে রাজনৈতিক স্টাইলে তাবলিগ নিয়ে সমাবেশ করাটা দুঃখজনক। স্লোগানসংবলিত পোস্টার, রাজনৈতিক পরিভাষার অনুপ্রবেশ তাবলিগের অহিংস পরিচিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তারা বলেন, বলা হচ্ছে তাবলিগের সংকট নিরসনে এমন সমাবেশ, রাজপথে এমন উসকানি সভা করে কীভাবে সমস্যা নিরসন হবে। এভাবে তো বিভক্তি ও সংকট আরও বাড়বে।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এভাবে ধর্মীয় ইস্যুতে মাঠ ঘোলা করাটা অবশ্যই স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছুর ইঙ্গিত। তাবলিগ জামাত সব সময় রাজনীতির বাইরে ছিল, এখনও রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে।

কাকরাইলের একজন মুরুব্বী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা এক হয়ে কাজ করতে চাই। কিন্তু বিশ্বইজতেমাকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেয়ার যে চক্রান্ত শুরু হয়েছে তাতে আমাদের হতাশা বাড়ছে। পাকিস্তানীরা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা হোক।

প্রসঙ্গত, ১০ জানুয়ারি বিমানবন্দর চত্ত্বরে বিক্ষোভরত অবস্থায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, বাংলাদেশের সব আলেমের মতামতকে উপেক্ষা করে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। অথচ, সরকারের সাথে কথা হয়েছিলো তারা দুই গ্রুপ একসাথে আসতে পারবে নতুবা নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *