শান্তিই পবিত্র, ধর্মযুদ্ধ নয় : গ্র্যান্ড মুফতি সিরিয়া

শান্তিই পবিত্র, ধর্মযুদ্ধ নয় : গ্র্যান্ড মুফতি সিরিয়া

ডক্টর আহমাদ বদরুদ্দিন হাসসুন। জন্ম আলেপ্পো ১৯৪৯ ইং। সিরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি। শাফেয়ি ফিকহে আল আযহার থেকে ডক্টরেট। আরবি সাহিত্যিক। ইসলামি চিন্তাবিদ। আলেপ্পোর জামি রওজা মসজিদের খতিব। আইএস-এর বিরুদ্ধে শুরু থেকে সোচ্চার। ২০১১সালে উগ্রবাদীদের হামলায় তার বড় ছেলে মৃত্যুবরণ করে। জঙ্গি সংগঠনসমূহের কোপদৃষ্টি তাঁর প্রতি শুরু থেকেই রয়েছে তার জঙ্গিবিরোধী বক্তব্যের কারণে। বিভিন্ন ইন্টারন্যাশন্যাল ইন্টারফেইথে সুন্দর বক্তব্য দিয়ে ইউরোপীয়দের মাঝে বিখ্যাত। ইসলামের শান্তির আবেদন উপস্থাপনে আরব বিশ্বে অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বিশেষ এক অনুষ্ঠানে এ বক্তব্য ইউরোপজুড়ে খুব সাড়া জাগিয়েছিল। পাথেয় টোয়েন্টিফের ডটকম পাঠকের জন্য চুম্বকাংশ অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ-এর সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

শান্তিই পবিত্র, ধর্মযুদ্ধ নয় : গ্র্যান্ড মুফতি সিরিয়া

সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু করছি। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এক মাটি থেকেই সৃজন করেছেন। মাটির মানুষ আমরা আজ জীবন লাভ করেছি। যে শক্তির বদৌলতে আমরা আজ জীবন ধারণ করছি তার সূত্র একটিই। আমরা সবাই এক আল্লাহর তৈরি করা মানব। এজন্য আপনাদের সবাইকে আমি সম্ভাষণ জানাচ্ছি, হে আমার ভাইয়েরা। আপনারা এই ভূমিতে আমার ভাই, আত্মা ও মানবতায় আমার ভাই।

প্রিয় উপস্থিতি, আমি যে দেশ থেকে এসেছি সে দেশের অধিবাসি আমি নিজের ইচ্ছায় হইনি। আসমান চেয়েছে আমি সে দেশে জন্ম লাভ করি। আমার জন্মভূমিকে পৃথিবীবাসী বরকতময় ভূখ- বলে থাকে। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান ও ইসরাইল। আধ্যাত্মিক যে সব সভ্যতা আকাশ থেকে এসেছে তা এ ভূমির মাধ্যমেই এসেছে। আমাদের দেশের মাটিতেই ইবরাহিম চলতেন। আমাদের এ ভূখণ্ডেই হযরত মুসা নিরাপত্তা লাভ করেছিলেন। বহু দিন বাস করেছিলেন মুসা এখানে। এদেশেই জন্মেছিলেন হযরত ঈসা। এখান থেকেই আকাশে চলে যান তিনি। মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে এ মাটিতেই আকাশ থেকে অবতরণ করবেন ঈসা মাসিহ। এদেশের মাটিতেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পা রেখেছিলেন। মক্কা থেকে এসেছিলেন আকাশে আরোহন করবেন বলে।

আমি আশা করব, আপনারা আমাদের দেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। আপনাদের সবাইকে আলোকিত করেছে আমাদের ভূখ-। আমরা খৃস্টান ছিলাম বা ইবরাহিমি ছিলাম বা মুসার ধর্মের অনুসারী ছিলাম বা মুসলমান ছিলাম। আমরা যখন যে ধর্মে ছিলাম আমরাই বিশ^বাসীর জন্য আলো এবং সৌভাগ্য বার্তা বহন করেছি।

আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল এ সাংস্কৃতিক সংলাপ আয়োজনের জন্য। হ্যাঁ, সংস্কৃতির বিভিন্নতা রয়েছে পৃথিবীতে। সভ্যতার বিভিন্নতা নেই। পৃথিবীতে বহু সভ্যতা আসেনি। সভ্যতা একটিই। সেটি হচ্ছে মানব সভ্যতা।

বিভিন্ন কালচার ও সংস্কৃতি আমাদের এ মানব সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। সভ্যতা এই মানুষের সৃষ্টি। আমরাই সভ্যতা নির্মাণ করেছি। এই পার্লামেন্ট কেবল খৃস্টানরা বানায়নি। বা শুধু ইয়াহুদি বা সেকুলার বা মুসলিমরা বানায়নি। এই পার্লামেন্ট বানিয়েছে মানুষ। আমরা সবাই মিলে একটি সভ্যতাই নির্মাণ করেছি। সেটি হলো মানব সভ্যতা। এজন্য সভ্যতার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। পৃথিবীতে সভ্যতা একটিই। একাধিক নয়। সংস্কৃতি বহু হতে পারে; সভ্যতা নয়।

সভ্যতার দ্বন্দ্ব সভ্যতার সাথে নয়। সভ্যতার দ্বন্দ্ব মূর্খতার সাথে, সন্ত্রাসের সাথে; উগ্রবাদ ও পশ্চাৎপদতার সাথে।

সংস্কৃতিবান মানুষ যে ধর্ম বা সংস্কৃতিরই হোক না কেন সে মানব সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনের জন্য কাজ করে যায়।

চাঁদে কারা গিয়েছে? খৃস্টান? ইহুদি? মুসলিম? আরব? জার্মান? সোভিয়েত? ইটালিয়ান? আমেরিকান? না। চাঁদে গিয়েছে মানুষ।

পিরামিডগুলি কারা বানিয়েছে? প্রাচীন বিরাট বিরাট সৌধগুলি কারা নির্মাণ করেছে? আপনার আমার সকলের পূর্ব পুরুষরাই বানিয়েছে। সুতরাং সভ্যতার কোনো দ্বন্দ্ব হতে পারে না।

আরেকটি বিষয়। সভ্যতার কোনো ধর্ম হতে পারে? না। সভ্যতার কোনো ধর্ম হয় না। বিভিন্ন মানবিক সংস্কৃতি সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে। বিভিন্ন মূল্যবোধ সংযোজন করে। সুসজ্জিত করে উন্নত মহৎ চিন্তা ও মহানুভবতা দিয়ে। ইসলামি সভ্যতা, খৃস্টান সভ্যতা, ইহুদি সভ্যতা বলে কিছু নেই। ধর্মসমূহ মানব সভ্যতাকে মূল্যবোধ ও উন্নত আচরণ দিয়ে সাজায়। সভ্যতা সৃষ্টি করি আমরা মানুষরাই। সভ্যতা আমাদের সৃষ্টি আর ধর্ম আল্লাহর সৃষ্টি। এজন্য আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে আপনারা কোনো ধর্মের দিকে সভ্যতাকে সম্পৃক্ত করবেন না। আমরা সবাই মিলেই এই সভ্যতা নির্মাণ করেছি। কোনো একক ধর্মের লোক নয়। সব ধর্মের মানুষ। আর ধর্ম সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ।

বলুন, কে সভ্যতা সৃষ্টি করল? মানুষ। আপনি ও আমি। আমি আর আপনি কে? আপনি কি আমি ভিন্ন অন্য কেউ? আপনি কি অন্য? আমি কি অন্য বা ভিন্ন কেউ? আপনি কি আমার জন্য পর? না। কখনও নয়। আপনি ভিন্ন বা পর নন। ভিন্ন বা পর হচ্ছে পশু। আপনি তো আমার ভাই। আপনি যে ধর্মের বা ভাষার হন না কেন আমার মা আপনার মা, আমার বাবা আপনার বাবা। আমাদের মা এই পৃথিবী আর আমাদের বাবা আদম আ.।

আসুন আমরা নতুন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করি। যারা বিশ^াস করবে যে, আমাদের পর কোনো মানুষ নয় আমাদের জন্য পর হচ্ছে পশু। মানুষ সে যে ধর্মের বা যে দেশের হোক না কেন প্রতিটি মানুষ আমার ভাই। তার রক্ত আমার রক্ত তার আত্মা আমার আত্মা তার চিন্তা আমার চিন্তা তার স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা। তার সংস্কৃতি আমার সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। এ ভিন্নতা কেবল আমাদের সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। বরং আমি বিশ্বাস করি ধর্মের ভিন্নতা নেই। ধর্ম সবার এক। বিভিন্ন ধর্ম নেই আমাদের দেশে। ইবরাহিম, মুসা, ইসা, মুহাম্মাদ সবাই একই ধর্ম নিয়ে এসেছেন। সে ধর্ম হচ্ছে আল্লাহর পবিত্রতা আর মানুষের সম্মান।

শরিয়ত ও আইন কানুন বিভিন্ন। যুগের পরিবর্তনের কারণে শরিয়ত পরিবর্তন হয়েছে। শরিয়ত বিভিন্ন হতে পারে কিন্তু ধর্ম বিভিন্ন হতে পারে না। আমাদের ও আপনাদের সকলের উপাস্য এক অদ্বিতীয়। আমরা সবাই সেই এক খোদার কাছে আত্মসমর্পণ করি। কাজেই পৃথিবীতে কোনো ধর্ম যুদ্ধ হতে পারে না। এ থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, পবিত্র যুদ্ধ বলে কিছু থাকতে পারে না। যুদ্ধ কোনো দিন পবিত্র হয় না। শান্তিই পবিত্র; যুদ্ধ নয়।

আমরা আমাদের সন্তানদেরকে মাদরাসা মসজিদ, প্যাগোডা গির্জা ও উপাসনালয়গুলিতে শিক্ষা দেই যে, পৃথিবীতে প্রকৃত পবিত্র বস্তু হচ্ছে মানুষ। কেবল কাবা ঘর পবিত্র নয়, মাসজিদুল আকসা নয়, মক্কার প্রাচীর কেবল পবিত্র নয়, রোমের গির্জা পবিত্র নয়, নিঃসন্দেহে মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সৃষ্টি। একটি ছোট্ট শিশুর রক্ত পৃথিবীর সকল ধর্মের পবিত্র স্থানসমূহের চেয়ে অধিক পবিত্র।

আমি কেন এ কথা বলছি? তার কারণ কাবা ঘর বানিয়েছে মানুষ। ইবরাহিম। মক্কার প্রাচির বানিয়েছে কোনো ইহুদি। রোমের গির্জা বানিয়েছে কোনো খৃস্টান। কিন্তু মানুষকে কে বানিয়েছে? মানুষকে বানিয়েছেন মহান আল্লাহ। যে আল্লাহর নির্মিত বস্তুকে ধ্বংস করল সে অভিশপ্ত। যে মানুষ হত্যা করল সে অভিশপ্ত। তার উপর আকাশ ও মাটির সকলের অভিশাপ। যদি একজন ফিলিস্তিনি শিশু বা ইসরায়েলি শিশু বা ইরাকি শিশুকেও হত্যা করা হয় তাহলে আল্লাহ আপনাকে আমাকে সবাইকেই জিজ্ঞেস করবেন। আমাদের সবাইকেই জবাব দিতে হবে।

আমরা কি ঐ সব শিশুর জীবন ফিরিয়ে দিতে পারব? হ্যাঁ, যদি কাবা ঘর ভাঙ্গা হয় আমাদের ছেলেরা তা পুননির্মাণ করবে। মাসজিদে আকসা ভেঙে ফেললে আমাদের পরবর্তী কেউ তা আবার বানিয়ে নিবে। রোমের গির্জা ভেঙে ফেলা হলে পরবর্তী প্রজন্ম পুনস্থাপিত করে নিতে পারবে। কিন্তু একজন মানুষকে হত্যা করা হলে কে পারবে তার জীবন ফিরিয়ে দিতে? আপনারা কেউ পারবেন?

এই ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে উপস্থিত সবার কাছে আমার আবেদন, আপনারা এই ডাক দিন, সাংস্কৃতিক সংলাপের কোনো সীমানা থাকবে না। এখানে কোনো সংকীর্ণতা থাকবে না। এ সংলাপ হবে সভ্যতার ভিত্তির উপর। কোনো ধর্মের ভিত্তির উপর নয়। কোনো সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নয়। ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিষয় একান্ত আপনার বিষয়। আপনি ও আপনার সৃষ্টিকর্তার মাঝের সম্পর্কের বিষয় হচ্ছে ধর্ম। আমরা পৃথিবীতে শান্তি ও সম্প্রীতির কথা প্রচার করব। আপনি আমাকে আপনার ধর্মে প্রবেশ করতে বাধ্য করবেন না আমিও আপনাকে আমার ধর্মে দিক্ষিত হতে বাধ্য করতে পারি না। ধর্ম সে তো আমাদের সাথে আমাদের স্রষ্টার মাঝের একান্ত বিষয়।

আমরা নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তুলি যারা বিশ্বাস করবে যে মানব সভ্যতা সব মানুষের মিলিত প্রয়াসের ফল। আর আল্লাহর পরে সবচেয়ে বড় পবিত্র বস্তু পৃথিবীতে মানুষ ও মানুষের স্বাধীনতা।

সহাবস্থান নয় বরং এক পরিবারের মত করে আমরা বাস করব। এক গৃহে। জীবন গৃহে। সমস্ত মানুষ পৃথিবীতে এক। ধর্ম জীবনের প্রেরণা নিয়ে এসেছে। হত্যা করতে আসেনি ধর্ম। ধর্ম জীবনের জন্য; হত্যার জন্য নয়। কাজেই ধর্মকে হত্যার কাজে ব্যবহার করবেন না। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এখানেই শেষ করছি। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

মূল : ডক্টর আহমাদ বদরুদ্দিন হাসসুন, গ্র্যান্ড মুফতি সিরিয়া

অনুবাদ : মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *