১৭ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

`ইলমে ওহী, ইলমে নাফে এবং সংশয়হীন জীবন গঠনের উপায়’

ইলমে ওহী, ইলমে নাফে এবং সংশয়হীন জীবন গঠনের উপায়

-মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

আল্লাহ তাআলার নিয়ামত অগণন অসংখ্য। মানুষ যদি তার মধ্যে আল্লাহ কত নিয়fমত দিয়েছেন এই গুলো গণনা করতে যায়, পৃথিবীতে আল্লাহর কত নিয়ামত আছে ওই গুলো তো গণনা করা অসম্ভব। কেবল তার মধ্যে কত নিয়ামত আছে এই গুলো যদি গণনা করে, বা তার একটা অঙ্গের মধ্যে যে নিয়ামতগুলো আছে, এই নিয়ামতগুলো মানুষ গুণে শেষ করতে পারবে না। আল্লাহর এত অসংখ্য, অগণিত নিয়ামত, জাগতিক নিয়ামত, আর্থিক নিয়মাত, শারীরিক নিয়ামত, সামাজিক নিয়ামত, প্রাকৃতিক নিয়ামত, আল্লাহর যে নিয়ামতসমূহ আছে, সেগুলো গণনা করে শেষ করা সম্ভব না।

সেই সব নিয়ামতের মধ্যে আল্লাহ তাআলার বড় নিয়ামত হলো, আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারা। আল্লাহ তাআলার মারিফাত হাসিল করা। আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে জানা। আল্লাহ তাআলার হুকুম আহকাম সম্পর্কে জানা। আল্লাহ তাআলার মার্জিয়্যাত সম্পর্কে জানা। এটা আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত। এই নিয়ামত এত উচ্চস্তরের নিয়ামত যে, এর জন্যই আল্লাহ তাআলা খাস করে, বিশেষ করে আম্বিয়ায়ে কেরাম আ.-কে বানিয়েছেন, দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া কেরামকে খাস করে বানিয়েছেন, সর্বোচ্চ করে বানিয়েছেন, সবচেয়ে মহান দারাজাত দিয়ে বানিয়েছেন। আম্বিয়ায়ে কেরামদের বৈশিষ্ট্য কেবল তাদের চেহারার কারণে নয়, তাদের শরীরের কারণে নয়, তাদের রংয়ের কারণে নয় বরং সবদিক থেকেই তারা তাদের যামানার শ্রেষ্ঠ মানুষ। মমতাজ মানুষ। তার তুলনায় তার যামানায় অন্য কেউ শ্রেষ্ঠ থাকতো না। আর রাসূল সা. যেহেতু আউয়াল এবং আখের সবার নবী। তাই আগে এবং পরে কোন মানুষকে আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-এর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অনুপমতা দিয়ে, সৌন্দর্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা আর কাউকে বানান নাই।

এত স্মরণ-শক্তি দিয়ে কাউকে বানান নাই। কোন যুগে বানান নাই। আর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা বানাবেন না। আম্বিয়া কেরামের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ তাআলা তাদের তার মারিফতের ইলম দান করেছেন। এটা আর কাউকে আল্লাহ তাআলা দেন নাই। মারিফতের ইলম মানে ওহীর ইলম। ওহীর ইলম ছাড়া আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অন্তুষ্টিকে জানা সম্ভব না। ওহীর ইলম ছাড়া কারো জানারও কোন উপায় নেই।

মানুষ তার নিজের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি জানে না। অনেক সময় এমন হয়, মনটা যে কি চায়, তা তুমি নিজেও বুঝো না। তাহলে তোমার মনের বিষয়ে তুমি অবগত নও। তুমি তোমার নিজের মনকেই জানো না, চিনো না, সেখানে আল্লাহ সম্পর্কে কীভাবে জানবে, কীভাবে চিনবে। তাই আল্লাহ তাআলা মেহেরবানি করে আম্বিয়া কেরামদের ওহীর ইলম দিয়ে পাঠিয়েছেন। যার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারছে যে, এটা করলে আল্লাহ খুশি হবেন। এটা করলে আল্লাহ নারাজ হবেন। এটা যে বান্দার উপর আল্লাহর কত বড় মেহেরবানি, সেটা বলে বুঝানো যাবে না। আল্লাহ যদি আমাদের এমনিতে রাস্তায় ছেড়ে দিতেন, আর বলতেন, তোমরা খুঁজে বের কর, আমি কীভাবে খুশি হবো। তাহলে মানুষের কী অবস্থা হতো কল্পনা করা যায় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য এত সহজ করে দিয়েছেন, এত সহজ করে দিয়েছেন যে, আমরা পরিষ্কার জানতে পেরেছি, আমি যদি রাসূলে পাক সা.-এর দেখানো পথে চলি, তাহলে আমি আল্লাহকে পেয়ে যাবো।

এখানে কোন দ্বিধা নাই, কোন সন্দেহের অবকাশ নাই, পেরাশানী নাই, সংশয় নাই। একটা ভালো কাজ করার পরেও মানুষের মধ্যে দ্বিধা, সংশয় থাকে, পেরেশানী থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী, তার ফজল ও করম, তিনি নবীদের মাধ্যমে উম্মতকে পরিষ্কার, সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এটা করলে আমি খুশি হবো, এটা করলে আমি নারাজ হবো। আল্লাহর কাজে কোন সংশয়, সন্দেহ নাই। মদ খাইলে ভালো হবে নাকি মন্দ হবে, এরকম কেন সন্দেহ আছে নাকি? নামাজ পড়লে নেক কাজ হবে নাকি মন্দ হবে, এরকম কোন দ্বিধা, সন্দেহ আছে নাকি?

তোমার যদি শুধু আল্লাহর নিয়ামতটার কথা চিন্তা করো যে, আল্লাহ আমাদের সন্দেহ সংশয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, তাহলে তুমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবে না। মানুষের যতগুলো পেরেশানী আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পেরেশানী হলো, তার দ্বিধা, তার সন্দেহ, সংশয়। সংশয় মানুষের পেরেশানীর মূল। মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বড় একটি আজাব হলো সন্দেহ, সংশয়। সমস্ত সংশয়কে, সমস্ত দ্বন্দ্বকে, আল্লাহ তাআলা দূর করে দিয়েছেন উসওয়াতুন হাসিনাহ, পেয়ারে হাবীবকে আমাদের মাঝে পাঠিয়ে।

এখানে আর কেন দ্বিধা, সংশয় নাই। রাসূল সা. যে ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেছেন, এটা যে একটা নেক কাজ এতে কোন সংশয় নাই। বাথরুমে বাম পা দিয়ে প্রবেশ করা, এই ব্যাপারে কোন সংশয় নাই। এই দুইটা শুধু উদাহরণ হিসেবে বললাম। আমলের চেয়েও ঈমানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জিনিস হলো, মানুষ চৈতন্য। মৌলিকভাবে ঈমান চৈতন্যের নাম। আমার চৈতন্যে আল্লাহকে এইভাবে চিন্তা করলে শিরিক হবে, নাকি ওই ভাবে চিন্তা করলে শিরিক হবে। এই ভাবে চিন্তা করলে ঈমান হবে, ওই ভাবে চিন্তা করলে কুফুর হবে। এই সন্দেহ সংশয় ছিল মানুষের। এটা আল্লাহ তাআলা দূর করে দিয়েছেন পেয়ারে নবী মুহাম্মদ সা.-কে দুনিয়ার পাঠিয়ে।

রাসূল সা. দ্বন্দ্বে ভোগতেছিলেন, কুরআনে আছে, ‘ওয়াওয়া জাদাকা দোয়াললান।’ অতপর আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-এর উপর মেহেরবানী করলেন, ফা হাদা। রাসূল পথ খুঁজে পেলেন। রাসূল সা.-এর হেদায়াত ও ইলমে ওহীর উসিলায় আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্দেহ সংশয়কে দূর করে দিয়েছেন, আমাদেরকেও হেদায়ত দিয়েছেন। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, চেতনার ক্ষেত্রে, আক্বিদার ক্ষেত্রে, আজকে আমাদের কোন সন্দেহ নাই। আল্লাহুস সামাদ। আল্লাহু আহাদ। পরিষ্কার জ্ঞান আল্লাহ সম্পর্কে। এখানে আমার কোন সংশয় নাই। এত পরিষ্কার জ্ঞান আল্লাহ সম্পর্কে, অন্য ধর্মের বড় বড় বিজ্ঞানীদেরও নাই। তারা সন্দেহে ভোগে, সংশয়ে ভোগে। বিশ্বাসের সংশয় থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মুক্ত করেছেন, এটা যে কত বড় নিয়ামত, কত বড় নিয়ামত বুঝানোর কোন উপায় নাই। আমার কোন দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারি, আমার আল্লার এই, আমার আল্লাহ সেই, আমার আল্লাহ এটা করেন, আমার আল্লাহ এটা করেন না। তো ভাই আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত, আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-এর মাধ্যমে, আম্বিয়া কেরামের মাধ্যমে সবকিছুই আমাদেরকে সুস্পস্ট করে দিয়েছেন।

এখন আমাদের কোন সন্দেহে পড়তে হয় না। কোন ক্ষেত্রেই আমাদের কোন সংশয় নেই এখন। এক সংশয়হীন জীবন আমার। সুস্পস্টতার উপর প্রতিষ্ঠিত জীবন আমার। ইহুদিদের চক্রান্তে পেয়ারে হাবীব, পেয়ারে রাসূল সা.-কে যাদু করে তারা রাসূল সা.-কে সংশয়ে ফেলে দিল। ইহুদিদের যাদু একটাই আসর পড়লো  রাসূল সা.-এর উপর, সেটা হলো, সন্দেহ, সংশয়। রাসূল সা. একটা কাজ করার পরে সন্দেহে পড়ে যেতেন যে, এই কাজটা করেছি কি না? সহীহ হাদীসে আছে এই কথা। দেখো, তোমাদের সারা জীবনেও আল্লাহ তাআলার এই নিয়মতের দিকে তোমাদের যেহেন যায় নাই। এই সংশয়হীন জীবন আমার, তোমার। আল্লাহ আজাব হলো, সংশয়, আর নিয়ামত হলো সংশয়হীন। আর মানুষ সংশয়হীন হয় ওই ইলমের দ্বারা, যে ইলম রাসূল সা.-নিয়ে এসেছেন।

আল্লাহ তাআলার মেহেরবানী, আল্লাহ তাআলার ফজল ও করম, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এই ইলমের জন্য কবুল করেছেন। তোমাকে মাদরাসায় নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তোমাকে কবুল করে ফেলেছেন। তোমার নাকটা কেমন আল্লাহ দেখেন নাই, তোমার গায়ের রং কেমন আল্লাহ দেখেন নাই, তুমি কোন বংশে জন্ম গ্রহণ করেছো আল্লাহ দেখেন নাই। আল্লাহ তাআলা তোমাকে কবুল করে নিয়েছেন। এই যে আল্লাহ তোমাকে কবুল করে নিয়েছেন, রাসূল সা. স্পস্ট বলছেন এই কথা, শুনো আল্লাহ তাআলার ইরাদা যার সম্পর্কে হয়ে গেছে, খাইরান। আল্লাহ তাআলা শুধু তাকেই দ্বীনের ইলম, ওহীর ইলম হাসিল করার জন্য কবুল করেন। এখানে খাইরান টা নাকেরা। নাকেরা এখানে আধিক্যতা বুঝানোর জন্য। অর্থাৎ যত ধরনের খায়ের আছে, সবকিছুর জন্য আল্লাহ তাআলা তোমাকে নির্বাচন করেছেন। আল্লাহ তাআলা শুধু আখেরাতের খায়ের এর কথা বলেন নাই, কেবল দুনিয়ার খায়ের এই কথাও বলেন নাই।

আল্লাহ তাআলার ইরাদা। যখন তিনি যা চান হয়ে যায়। শুধু ইরাদা করলেই হয়। আল্লাহ তাকতওয়ালা, আল্লাহ কুদরতওয়ালা। সকল শক্তি তার। সমস্ত ক্ষমতা তার। তার ইরাদার বাইরে কিছু নাই, তিনি ইরাদা করবেন আর হবে না, এমন কিচ্ছু নাই দুনিয়া এবং আখেরাতে। আর আল্লাহ তাআলার যার খায়র এর ইরাদা করেন, তাকে ইলমে ওহীর জ্ঞান দান করেন। তাকে তাফাক্কুহ ফিদ্বীনের জ্ঞান দান করেন। দেখো, ইলম, তাফাক্কুহ, হিকমাহ। তিনটা জিনিস। ওইগুলো মুরাদিফ শব্দ না। ইলম হাসিল করলেই তাফাক্কুহ অর্জন হয়ে যায় না। তাফাক্কুহ হাসিল করলেই হিকমাহ হাসিল হয়ে যায় না। ওইগুলো মুরাদিফ শব্দ নয়। এই তিনটা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। একজন ইলম হাসিল করতে পারে, কিন্তু তাফাক্কুহ না ও হাসিল করতে পারে।

সাদামাটা ভাবে ইলম বলা হয়, জানার নাম। যেমন, এটা গরু, তুমি জানতে না, একজন পরিচয় করে দিলো, তুমি জানলে। এটা হলো ইলম। আর তাফাক্কুহ বলা হয়, দালীলসহ জানার নাম। তাফাক্কুহ হলো, ইলম থেকে উচিতস্তরের জিনিস। আর হিকমত হলো, আসরারসহ জানার নাম। হিকমত তাফাক্কুহের ও উপরের জিনিস। তো আল্লাহ তাআলা তোমাদের মত অপরিচিত, আমাদের মতন হেয়, হীন, তুচ্ছ, সামাজের মধ্যে নিম্নমানের, তবুও আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের জন্য, ইলমের জন্য কবুল করে নিয়েছেন।

শুনো, আল্লাহ তাআলার ইরাদা (ইচ্ছা) দুই ধরনের হয়। একটা ইরাদার সম্পর্ক তাকবিনিয়্যাতের সাথে। এই ইরাদা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা কোন শর্ত রাখেন নাই। আল্লাহ ইরাদা করেন, আর হয়ে যায়। যেমন, দুনিয়া সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহ তাআলা ইরাদা করছেন, দুনিয়া সৃষ্টি হয়ে গেছে।

ইলম আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন ইলম হয়, তখন সেটা হিকমতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। একটা হলো কাসাবের সাথে ইলম। যেমন, ফায়ালা, ফায়ালা, ফায়ালু। তুমি চেষ্টা করে এই ইলম অর্জন করলে। আর দালাইলের সাথে ইলম হাসিল করলে সেটা হয় তাফাক্কুহ। এটাও কাসাবের সাথে তায়াল্লুক। কিন্তু হিকমত এটা কাসাবের সঙ্গে অর্জন হয় না। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। হিকমত মানুষের কাসাবের সঙ্গে তায়াল্লুক না। হিকমতের ইলম আসে আল্লাহ জাত থেকে।

তো আল্লাহ তাআলার ইরাদার তায়াল্লুক তাকবিনিয়্যাতের সাথে হয় যেটা হয়, সেটা কোন শর্তের সাথে মাশরুত না। আল্লাহ চান আর হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলার আরো একটা ইরাদার সম্পর্ক তাশরীয়িয়্যাতের সাথে। এই ইরাদা কিছু শারায়েতকে চায়। এই শরায়েত যদি তোমার মধ্যে না পাওয়া যায়, তাহলে আল্লাহ তো তোমাকে এখানে নিয়ে আসছেন ঠিক, কিন্তু তুমি যদি সে শর্তগুলোর পূর্ণ করতে না পারো, তাহলে সে সুযোগ পাওয়ার পরেও আল্লাহ তাআলার ইরাদা তুমি অর্জন করতে পারলে না। শর্তগুলো পূর্ণ না করার কারণে তুমি ইলম থেকে মাহরূম হয়ে যাবে।

আর মানুষের সবচেয়ে বড় মাহরূমি হলো, যে সুযোগ পাওয়ার পরেও সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারলো না। ইলম এবং তাফাকুহ, এই দুইটার সাথেই আল্লাহ তাআলা কিছু শারায়েত রেখেছেন। যেহেতু এর সম্পর্ক কাসাবের সাথে। আর হিকমত আসে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। ইলমের শারায়েত যখন পূর্ণ করবে, তখন সে ইলম হাসিল করবে। ইলম হাসিল করার পর সে তাফাক্কুহের দরজায় পা রাখবে। এর মানে এই কথা নয়, তুমি দাওরায়ে হাদীস শেষ করে ইফতাতে ভর্তি হলে। আর ইলমের শারায়েত, তাফাক্কুহের শারায়াত, পালন করলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হিকমত নাযিল হবে। তুমি হাকিম হবে। তোমরা আছো এখন প্রথম দরজায়, হুসুলে ইলমের দরজায়।

তাহাম্মুলে ইলম, হুসুলে ইলমের প্রথম শর্ত হলো, তোমার স্বাদ, আহ্লাদ, মজা, নন্দন-বিনোদন, ইচ্ছে স্বাধীনতা ছেড়ে দিতে হবে। এখানে একমাত্র তোমার সামনে ইলম। তোমার এক মাত্র লক্ষ্য ইলম। রাসূল সা. তাঁর ওহীর ইলম হাসিল করার সময় শারীরিক মানসিক কষ্ট করতে হয়েছে। হযরত মা আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সা.-এর উপর যখন ওহী নাযিল হতো, তখন প্রচণ্ড শীতের শৈত্যপ্রবাহের মধ্যের আল্লাহ রাসূল সা.-এর শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকতো।

এত কষ্ট করে রাসূল সা. ইলমে ওহী হাসিল করেছেন। অথচ রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা এই ইলম দেয়ার জন্য বানিয়েছেন। তারপরেও রাসূল সা.-কে শারীরিক তাকলিফ করতে হয়েছে, মানসিক তাকলিফ করতে হয়েছে। আল্লাহর ফজল ও করম, আল্লাহর মেহেরবানী। আমি তো এখনো তালেবুল ইলম হতে পারি নাই কিন্তু আমি যখন মাদরাসায় পড়তাম, আমার নিজের কাপড়ের চিন্তা আমার ছিল না। খাওয়ার কোন ইমতিয়াজ ছিল না, শীত ও গরমের কোন ইমতিয়াজ ছিল না। এরপরেও কিছু হাসিল হয় নাই। তো ইলম হাসিল করার প্রথম শর্ত কী? তোমার যত স্বাদ আহ্লাদ আছে, সবকিছু ছেড়ে দিতে হবে।

ইলম হাসিল করার দ্বিতীয় শর্ত হলো, ইনকেতা আন কুললি শাইয়িন। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। রাসূল সা. যাকে আল্লাহ তাআলা ওহীর ইলম দেয়ার জন্য বানিয়েছেন, ওহীর ইলম দিবেন। তিনি ইলম হাসিল করার জন্য পরিচিত সমাজ ছেড়ে, বাইতুল্লাকে ছেড়ে, বউ-বাচ্চাকে ছেড়ে চলে গেলেন। যাওয়ার পর খাওয়ার কোন খেয়াল নেই। খাবার শেষ হয়ে গেলে হযরত খাদিজা রা. নিজে পৌঁছে দিতেন, কখন রাসূল সা. খাবার নিয়ে যেতেন। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গারে হেরায় গিয়ে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলেন। তো ইলম অর্জন করার জন্য দ্বিতীয় শর্ত কি? নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। আমার বাড়ি নাই, আমার ঘর নাই, আমার বন্ধু নাই, আমার স্ত্রী নাই, আমার ছেলে নাই, আমার মা-বাবা কেউ নাই, আমার সমাজ নাই। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমার ইলম হাসিল করতে হবে। ইলমের সাথে যেটার সম্পর্ক নাই, সেটা আমার দুশমন।

ইলম হাসিল করার তৃতীয় শর্ত হলো, নিজেকে এক জায়গায় বেঁধে ফেলা। যে গরু বা বকরি তার খুঁটি থেকে ছুটে যায়, আর এখানে সেখানে মুখ দেয়, সে শুধু মার খেয়ে ফিরে আসে। কোথাও শান্তিতে খেতে পারে না। আর যে বকরি খুঁটির সাথে বাঁধা থাকে সে ইজ্জতের সাথে খায়। কেউ তাকে মারে না। আবার বিকালে মালিক তাকে ইজ্জতের সাথে নিয়ে আসে। তো তোমরা মাদরাসায় নিজেদেরকে বেঁধে রাখবে। বসিরতের সাথে মাদরাসায় থাকবে। আর যে বসিরতের সাথে মাদরাসায় থাকবে, তার বাঁধন খুলে দিলেও সে মাদরাসা থেকে বাইরে যাবে না। ইলম হাসিল করতে হলে নিজেকে নিজে বেঁধে ফেলতে হবে। রাসূল সা. গারে হেরায় নিজেকে বেঁধে ফেলে ছিলেন।

যদি কেউ এই তিনটা শর্ত পালন করে ইলম হাসিল করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ইলম দিয়ে দিবেন। তার ইলম হাসিল হয়ে যাবে। কিন্তু এই ইলম, ইলমে নাফে হবে না। ইলমকে ইলমে নাফে বানানোর জন্য শর্ত হলো- আদব। ইলমকে ইলমে নাফে বানাতে হলে তোমাকে মুয়াদ্দাব হতে হবে। বেয়াদককে কখনো আল্লাহ তাআলা ইলমে নাফে দান করেন না। তাই আদব করতে হবে উস্তাদের, আদব করতে হবে কিতাবের, আদব করতে হবে কিতাবের মুসান্নিফিনদের, আদব করতে হবে মাদরাসার, এমন অনেকগুলোর সাথে আদবের সম্পর্ক। আর আদব হলো অন্তরের একটি কাইফিয়্যাতের নাম। যেটা অন্তরে পয়দা হয় মহব্বত এবং খওফের মাধ্যমে। তো আদব ছাড়া শুধু ইলম হাসিল হতে পারে, কিন্তু নাফে না। বেয়াদবের কখনো ইলমে নাফে হাসিল হয় না।

আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে মাদরাসায় নিয়ে আসছেন, এখানে পৌঁছে দিয়েছেন। এই পৌঁছানোকে গণিমত মনে করো। তোমার মত হাজার হাজার মানুষকে আল্লাহ তাআলা পৌঁছান নাই। তোমার মত কত ছেলে চায়ের দোকানে কাজ করে, কত ছেলে গরুর রাখাল হয়ে আছে, কত ছেলে গার্মেন্টসে কাজ করছে। আর আল্লাহ তাআলা তোমাকে মাদরাসায় নিয়ে এসেছেন, রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাতে নিয়ে এসেছেন। সুতরাং এটার কদর করতে হবে। সবকিছু থেকে চোখ ফিরিয়ে নাও। নিজেকে শুধু ইলমের মধ্যে মশগুল করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে দিবেন তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

এদিক সেদিক না তাকিয়ে ইলমে মশগুল হও। এদিক সেদিক যে থাকায়, তাকে শিয়ালে নিয়ে যায়, বাঘে ছিনতাই করে নিয়ে যায়, ঈগলে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। তো মাদরাসার পরিবেশে নিজেকে আটকে রাখো, বেঁধে রাখো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে সবধরনের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। সব পেরেশানি থেকে আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, সমস্ত শয়তানিয়্যাত থেকে আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আর তুমি যে দিন মাদরাসা থেকে ইলম অর্জন শেষ করে বের হবে, এমন আলেম হয়ে বের হবে। যে নাকি তাফাকুহের দরজায় পা রাখলো। মেহনত করবে আল্লাহ তাআলা হেকমতের দরজা খুলে দিবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের কবুল করুন। তোমাকে কবুল করুন। আমাকে কবুল করুন।

২৭ জানুয়ারি ২০১৯ রোববার জামিআ ইকরা বাংলাদেশ-এর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রদত্ব বক্তৃতা

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ও বেফাকুল মাদারিসিদ্দীনিয়া বাংলাদেশ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com