গুণগত উন্নয়নের অপরিহার্য উপকরণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
রকীবুল হক : স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তার যাত্রার শুরুতেই সকলের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাংবিধানিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করেছে। তথ্যের অবাধপ্রবাহ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় শুধু জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষমবণ্টন এবং অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে প্রত্যেকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব অনেক। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার ছাড়া গণতন্ত্রচর্চা, সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বা এর উন্নয়নের পথ সুগম হয় না বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো বিষয়ে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধও আরোপ করা আছে সংশ্লিষ্ট আইনে।
গণমাধ্যম ছাড়াও বর্তমান বিশ্বের মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করে থাকে। ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো-সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম ও ব্লগ। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে মানুষ সাধারণত মতপ্রকাশ করে থাকে।
তবে মতপ্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক ও শক্তিশালী একটি মাধ্যম হলো-গণমাধ্যম। সংবাদপত্র বা প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি এখন অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে। গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় এসব মিডিয়া ভূমিকা রাখে। নীতিনির্ধারক, আইনসভাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয় গণমাধ্যম। স্বাধীনতার আগে এবং পরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম মানুষের প্রতিটি গণতান্ত্রিক, সমাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সঙ্গে থেকেছে। বাংলাদেশে গণমাধ্যম নানা ঐতিহাসিক ঘটনায়, মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ভূমিকা পালন করেছে, এখনও করছে। সন্ত্রাস-দুর্নীতিসহ সমাজের নানা অসঙ্গতি ও গুরুত্বপুর্ণ ইস্যুকে অনেকসময় গণমাধ্যমই সবার আগে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়।
এদেশের মানুষ একসময় শুধু সংবাদপত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুবিধা পাচ্ছে বর্তমান সমাজ। আগে শুধু সংবাদপত্রের পাতায় বিভিন্ন খবর ছাড়াও সমসাময়িক ইস্যুতে বিশেষ মতামত, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, চিঠিপত্র প্রকাশ করা হতো। বর্তমানে সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইন পত্রিকার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। অনলাইনে পাঠক বৃদ্ধির কারণে প্রিন্ট ভার্সনের পত্রিকাগুলো যেমন অনলাইন ভার্সন চালু করেছে তেমনি শুধু অনলাইন পত্রিকার সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব মাধ্যমে এখন খুবসহজে এবং দ্রুত পাঠক তথা মানুষের চাহিদা অনুযায়ী খবর ও মতামত তুলে ধরা হচ্ছে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যমের সঙ্গে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে-ফেসবুক। এছাড়া টুইটার, ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাংলাদেশের মানুষ খুবসহজেই তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ওপর ভরসা না করে মানুষ তার প্রয়োজনীয় মতামত বা বিভিন্ন ঘটনার খবর দ্রুত সামাজিকমাধ্যমে প্রচার করছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বেশ কয়েকটি অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা বেশ আলোচিত হয়েছে।
তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি চারটি (বিটিভি,বিটিভি ওয়ার্ল্ড,সংসদ বাংলাদেশ টিভি ও বিটিভি-চট্টগ্রাম) টেলিভিশন চ্যানেলের পাশাপাশি ৪৫টি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের লাইসেন্স রয়েছে। এরমধ্যে বর্তমানে ৩০টি চ্যানেলের সম্প্রচার চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদেই ৩৯টি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ বেতারের পাশাপাশি বেসকারি ২৮টি এফএম বেতার এবং ৩২টি কমিউনিটি বেতারের লাইসেন্স রয়েছে। এদের মধ্যে বর্তমানে ২৩টি এফএম বেতার এবং ১৮টি কমিউনিটি বেতারের সম্প্রচার চলছে। অবশ্য একটি কমিউনিটি বেতারের লাইসেন্স প্রত্যাহর করা হয়েছে। ২৪টি এফএম ও সবগুলো কমিউনিটি বেতার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।
গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে সভাসমাবেশ, মানববন্ধন, সেমিনার সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল বৈঠক ইত্যাদির মাধ্যমে মতামত প্রকাশের সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এছাড়াও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য বর্তমান সরকার বেশ কিছু আইন ও বিধিমালা করেছে।যেসব আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকরা পেশাগত ও পারিবারিক নানা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সাংবাদিক সহায়তা ভাতা/অনুদান নীতিমালা-২০১২, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৪’ও বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট বিধিমালা, ২০১৬’। সকল প্রকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রধাহ নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ প্রণয়ন ও তথ্য কমিশন গঠন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এছাড়া ‘কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০১০’, ‘বেসরকারি মালিকানাধীন এফএম বেতার কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১০’, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সাংবাদিকসহ সংবাদ কর্মীদের বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সরকার ওয়েজবোর্ড গঠন করে থাকে। বর্তমানে নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু আছে তা নিয়ে বিভিন্নসময়ে বিভিন্নমহলে বিতর্ক ওঠলেও এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ করতে দেখা যায়। জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের ইশতাহারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিতে জোর দিয়ে থাকে। বর্তমান সরকারের সময়েও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি এর অপব্যবহারও যাতে না হয় সে বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতাহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে আওয়ামী লীগ। সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে।
দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির মধ্যেও ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) ৫৭ ধারা নিয়ে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এটি বাতিলেরও দাবি ওঠে। একপর্যায়ে সরকার এ ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা বিলুপ্তির বিধান রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ পাস করে। তবে আইনটি নিয়েও বিতর্ক চলছে। এ আইনের কিছু ধারায় সংশোধন দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, নতুন এ আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করবে না। বরং ডিজিটাল প্লাটফর্মে অপপ্রচাররোধে এটি ভূমিকা রাখবে।
কারো বিরুদ্ধে কোনো অসত্য তথ্য ইন্টারনেট বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে প্রচার করলে তার প্রতিকারের জন্যই এই আইন। পৃথিবীর দেশে দেশে সময়ের প্রয়োজনে এ আইন প্রণীত হচ্ছে। তবে এ আইনের অপপ্রয়োগ ও সাংবাদিকদের হয়রানি যাতে না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
নতুন এ আইনটি স্বাধীন মতপ্রকাশের অন্তরায় নয় বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে যেকোনো অপপ্রচার বা নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধ করতে সহায়ক হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করছেন।
সর্বোপরি দেশীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর নানা বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকারের ইতিবাচক নানা পদক্ষেপে দেশটি এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দেশের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও অবারিত হোক-এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট
২৩.০৯.২০১৯


