জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপট ও পথচলা

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপট ও পথচলা

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপট ও পথচলা

২য় পর্ব

ফয়জুল্লাহ আমান : সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সমস্ত ব্যবস্থা যে খুব দ্রুতই বদলে যাচ্ছে তা আকাবিররা উপলব্ধি করতে পারেন। কেবল ইংরেজদের হাত থেকে মুক্তিলাভ নয়, সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য তারা কাজ করতে থাকেন। বালাকোট, সিপাহি বিদ্রোহে আকাবিরদের অংশগ্রহণ ও রেশমি রুমাল আন্দোলনের প্রসিদ্ধির কারণে আকাবিরে দেওবন্দের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের বাস্তবতাগুলো আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করা সেসময়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা সমাজের অন্যান্য দিকও ভুলে যাননি।
সামারাতুত্তারবিয়া থেকে ১৯০৫ সালে শাইখুল হিন্দ জমিয়াতুল আনসার প্রতিষ্ঠা করেন। উবাইদুল্লাহ সিন্ধিকে এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন ১৯১৫ সালে শাইখুল হিন্দ হিজাযের উদ্দেশে সফর করে যান। ১৯১৬ সালে আরব বিদ্রোহিরা তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ইংরেজ বিরোধী শাইখুল হিন্দকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয় মক্কার শরীফ হুসাইন। জমিয়তুল আনসারের সদস্যদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তৎকালীন ইংরেজ সরকারের কোপদৃষ্টি পড়ে এ সংগঠনের ওপর। যার ফলে ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে শাইখুল হিন্দের ছাত্র শিষ্যরা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ গঠন করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন মুফতি কেফায়াতুল্লাহ রহ.।

পরে শাইখুল ইসলাম মাওলানা সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী এর হাল ধরেন। তাঁর ইন্তিকালের পর থেকে ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা আসআদ মাদানী রহ. এটিকে আরও বেগবান করেন। আজ একথা অস্বীকারের কোন উপায় নেই মুসলমানদের জাতীয় জীবনের সবধরনের সমস্যার সমাধানে এটি প্রধান সংগঠন। মা- আনা আলাইহি ওয়া আসহাবির মূলনীতি সামনে রেখে যা পরিচালিত হয়। নবীজী ও সাহাবীদের সীরাত অনুসারে সমাজ বিনির্মানের চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হওয়াই যার লক্ষ্য। সমাজের মানুষ সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যাগুলি কিভাবে মুকাবিলা করবে তার নির্দেশনা পেতে আমাদেরকে আর পৃথিবীর অন্য উন্নত জাতির দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। আমাদের রয়েছে ধারাবাহিক এক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নত সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহ্য। সেটিকে এগিয়ে নেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হবার পর প্রথম ১৯৭৪ সালে জমিয়তে উলামা বাংলাদেশ গঠন করা হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন সিলেটের শায়খে কোড়িয়া। এরপরে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে অনেক পট পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে, বাঙালি সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার মত কিছু আজও আমরা করতে পারিনি।

পলিটিক্সের জন্য ক’দিন পর পর নতুন নতুন দল গড়ে তোলা হচ্ছে। একটি ভেঙ্গে দশটি দল করা হচ্ছে। আবার কয়েকটি মিলে জোট করা হচ্ছে। জোটের পরে জোট ভাঙছে গড়ছে। এসবই চলছে কিন্তু সমাজের মানুষের দিকে তাকানোর কেউ নেই। বিশেষত এদেশের আলিমদের সমাজের সঙ্গে সংযোগ খুব সামান্য। নবীর ওয়ারিস আলিমদের সঙ্গে সমাজের সংযোগ গড়ার লক্ষ্যে আলোকিত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা এগিয়ে চলেছে।

আমি আবারও বলছি, এই জমিয়ত আমাদের উপমহাদেশের আকাবিরদের আমানত। এদেশে দীর্ঘ আটশত বছর মুসলমানদের রাজত্ব ছিল। হাজার বছরব্যাপী মুসলিম কৃষ্টি কালচার শিক্ষা দীক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ছিল ভারতবর্ষ। এই হাজার বছরে জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন ও তাহযীব তামাদ্দুনের যা কিছু চর্চা হয়েছে এর সমন্বিত রূপের সর্বোচ্চ প্রকাশ হয়েছে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ভেতর। শাহ আব্দুল আযীয, শাহ ইসহাক, সায়্যিদ আহমাদ শহীদ, শাহ ইসমাইল শহীদ, হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কি রহ.এর মাধ্যমে এই উত্তরাধিকার এসে যায় দারুল উলূম দেওবন্দে। কাসিম নানুতবী রহ. যেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি দেন এর সাংগঠনিক রূপ।

মাদরাসার চার দেয়ালের ভেতর বন্দি না রেখে সাধারণ জনতার ভেতর সঠিক ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া এবং মুসলমানদের চরম শত্রু সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের থেকে মুক্তি লাভ করতে মুজাহাদা ফি সাবিলিল্লাহর যজবা ও উদ্দীপনা ব্যাপক করাই ছিল এর লক্ষ্য। নবীজীর সীরাতের সঙ্গে মিল রেখে শুরু থেকেই এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সৎসাহসে সত্য উচ্চারণের যোগ্যতা সৃষ্টি করে চলেছে সংগঠনটি। সংগঠনটির শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ভারতের মত আমাদের দেশেও আশা করছি সংশ্লিষ্ট সকলেই বড় কোন উদ্যোগ গ্রহণে সচেষ্ট হবেন। এ আশাবাদ ব্যক্ত করে কথা এখানেই শেষ করছি।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট, সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ ঢাক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *