জীবন্ত পাঠাগার মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.

জীবন্ত পাঠাগার মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.

জীবন্ত পাঠাগার মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ২ সেপ্টেম্বর। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমার প্রিয় উস্তাদ, দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক প্রধান মুফতী, শায়েখ জাকারিয়া রহ.-এর বিশিষ্ট খলিফা ও জা- নশীন, ফকীহুল উম্মাহ মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর কথা।

হযরত মুফতী মাহমুদ হাসান ( রহঃ) এর কথা প্রতি- নিয়ত স্মরণ হয়। কেননা, তাঁর বিশাল রচনা ভাণ্ডার এর দিকে তো প্রায় প্রতিদিন চোখ বুলাতে হয়। তাঁর প্রসিদ্ধ “ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া” যেটা আমার কিতাবের আলমারির প্রথম সারিতে সাজানো। প্রায় সব সময় চোখ পড়ে সেদিকে।

তবে আজকের দিনটা বিশেষ ভাবে স্মরন হয়। ১৯৯৬ সনের এই দিনে, মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গিয়ে ছিলেন তিনি। পুরো দেওবন্দ থমকে গিয়েছিল সেদিন। সারা বিশ্বের আলেম- উলামার মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

আমরা তখন দেওবন্দে। মুফতি মাহমুদ সাহেবের কাছে আমাদের পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমাদের বছরটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ দরস।

আমদেরকে নাসায়ী শরীফ পড়াতেন তিনি। প্রতিদিন বাদ জোহর। একটানা কয়েক মাস পড়ানোর পরে, সফরে বের হয়ে ছিলেন। সাউথ আফ্রিকায় সফর অবস্হায়, ১৯৯৬ সনের ২ সেপ্টেম্বর ইনতেকাল করেন।
মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী( রহঃ) এক জীবন্ত গ্রন্হাগারের নাম। দারুল উলুম দেওবন্দ সহ বহু দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে দরস- তাদরীসের কাজ করেছেন। অত্যান্ত প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। ইলমে ফিকাহ এর ক্ষেত্রে অপরিসীম দখল ছিল তাঁর। ” ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া” তাঁর এই কিতাব বিশ্বব্যাপি সমাদৃত।

বিশ্বব্যাপি আলেম- উলামাদের মাঝে তাঁর বিশাল গ্রহন যোগ্যতা ছিল। একজন বড় ফকীহ হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল বিশ্বময়। শুধু আমাদের এই উপমহাদেশ নয়, আরব বিশ্ব সহ আফ্রিকা, ইউরোপ, সব জায়গাতে তাঁর খ্যাতি ছিল।

শেষ বয়সে মুফতি মাহমুদ সাহেব অন্ধ হয়ে গিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর ইলম অন্ধ হয়ে ছিলনা। সমস্ত কিতাবাদী যেন তাঁর নখ- দর্পনে ছিল। অধিকাংশ কিতাব গুলো মুখস্হ ছিল।

বিভিন্ন জটিল জটিল বিষয়ের সমাধান মুখস্ত বলে দিতেন। কিতাবের রেফারেন্স গুলো পৃষ্টা নম্বর সহ বলে দিতেন। এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে কোন পৃষ্টার কোন লাইনে আছে, সেটাও বলতে সক্ষম ছিলেন।
একজন প্রথিতযশা আলেম, বিজ্ঞ ফকীহ, সেই সাথে সুলুকের লাইনে লাইনে এক বড় শায়েখ ছিলেন। শায়খুল হাদীস জাকারিয়া( রহঃ) এর অন্যতম খলিফা ছিলেন তিনি। শায়েখ জাকারিয়ার ইন্তেকালের পরে মুফতি মাহমুদ সাহেব তাঁর স্হলাভিষিক্ত হন।

ইলমী লাইনে যেমন তিনি একজন সম্রাট, আবার সুলুকের লাইনেও তাঁর খেদমতের জুড়ি নেই। ইসলাহী মিশন নিয়ে বিশ্বব্যাপি ছুটে বেড়াতেন। দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্তা মসজিদে তাঁর খানকা ছিল। খানকাতে রিয়াযাত- মুজাহাদার কাজ করতেন। দেওবন্দ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে খানকা ছিল। এমনি ভাবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফ্রিকা, লন্ডন, বিভিন্ন দেশে তাঁর খানকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিল। এসব খানকাতে হাজার হাজার আলেম এবং সাধারণ মানুষের ইসলাহী কাজ করতেন।

হযরত মুফতী মাহমুদ সাহেব প্রতি রমজানে ইতিকাফ করতেন। রমজান পুরোটা ইতিকাফে কাটাতেন প্রতি বছর। এই ইতিকাফ ছিল তাঁর আরেক ইসলাহী মিশন। তাঁর সাথে হাজারো আলেম- উলামা ইতিকাফে শরীক থাকতেন।

একেক রমজান একেক জায়গায় ইতিকাফের প্রগ্রাম থাকত। কখনো দেওবন্দ, কখনো ভারতের অন্য কোন জায়গায়, কখনো আফ্রিকাতে, কখনো বাংলাদেশে ইতিকাফ করেছেন।
আমাদের বাংলাদেশে ১৯৯৫ সনে ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসায় ইতিকাফ করেছিলেন। প্রায় হাজারের ঊর্ধ্বে আলেম এবং সাধারণ মানুষ শরীক ছিল সে ইতিকাফে। বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় বহু উলামায়ে কেরাম তখন সেখানে ইতিকাফে অংশ গ্রহন করে ছিলেন।

মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী ( রহঃ) এর অনেক খলিফা বাংলাদেশে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেম, আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী তাঁর অন্যতম খলিফা।
আরো রয়েছেন, মুফতি শফিকুল ইসলাম, শায়খুল হাদীস, জামেয়াতু ইব্রাহিম ( আঃ), সাইনবোর্ড,যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

মুফতি মামুনুর রশীদ, শায়খুল হাদীস, ঢাকা।

মাওলানা মোস্তাফা, শায়খুল হাদীস, জামেয়া মাহমুদিয়া ঢাকা।

এছাড়াও বহু আলেম তাঁর খলিফা এদেশে রয়েছে। তাঁর খানকাও এখনো এদেশে বিদ্যমান।

মহান আল্লাহর কাছে এই মহান আলেমের জন্য প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *