২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

দ্য ট্রু মুসলিমস আইডেন্টিটি | দ্বিতীয় পর্ব

  • মূল: মুফতী সায়্যিদ মুহাম্মদ সালমান মানসুরপুরী
    অনুবাদ: মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

খ্যাতির মোহ থেকে বাঁচতে হবে

হযরত কাব বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন- দুইটা ক্ষুধার্ত বাঘ কোনো ছাগপালের যে ক্ষতি করতে পারে না, সম্পদ ও মর্যাদার মোহ মানুষের দ্বীনদারিকে তারচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। (তিরমিযি শরীফ, হাদীস নং ২৩৭৬)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যোবায়ের রা. বলেন, একবার রাসূল সা. সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। সাহাবিরা রোদ থেকে বাঁচার জন্য নবীজীর মাথার উপর চাদর ধরে ছায়া দেওয়ার চেষ্টা করলেন। রাসূল সা. মাথা তুলে দেখতে পেলেন, সাহাবিরা চাদর ধরে রেখেছে। রাসূল সা. তাদেরকে চাদর সরিয়ে নিতে বললেন। নিজের হাত মাথার উপর তুলে ধরে ছায়া করতে লাগলেন আর বললেন, আমিও তোমাদের মত একজন মানুষ। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৯/২১)

এমন অকৃত্রিম অনাড়ম্বর সাধাসিধে ও বিনয়ী আচরণ ছিল রাসূল সা. এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। যার ফলেই সমস্ত মানব সমাজ রাসূল সা.কে ভালোবাসে। মহব্বত করে। সেই প্রিয় নবীর আদর্শ অনুসরণ করে তাঁর উম্মতও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হতে পারে।

খুলাফায়ে রাশেদার বিনয়

শুরুতেই প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর ঘটনা উল্লেখ করা যাক। তার জীবনীকাররা লিখেছেন, তিনি খলিফা হবার আগ পর্যন্ত তার প্রতিবেশীদের ছাগলের দুধ দোহন করে দিতেন। যখন তিনি খলিফা হলেন, তাঁর প্রতিবেশির এক বাচ্চা মেয়ে বললো, ‘এখন সিদ্দিকে আকবর আমাদের পশুর দুধ দোহনের সময় তো আর পাবেন না।’ হযরত আবু বকর রা. বাচ্চা মেয়েটির এমন কথা শুনে বললেন, ‘আমি এখনও তোমাদের ছাগলের দুধ দুইয়ে দিবো। আমি চেষ্টা করব আমার নতুন কর্মব্যস্ততা আমার আগেকার কোনো আখলাক যেন বদলে না দেয়।’ হযরত আবু বকর এরপর থেকে পুরো মুসলিম জাহানের খলিফা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশিদের জন্য দুধ দোহনের কাজ করতেন। (আল ইলমু ওয়াল উলামা ১৪৬)

এবার খলিফা হযরত উমর রা. এর কয়েকটি ঘটনা শুনুন। হযরত কাতাদা বলেন, উমরা রা. অর্ধ জাহানের বাদশা হওয়া সত্ত্বেও তার জামা কাপড়ে পট্টি দেওয়া থাকতো। খুব সাধারণ উনের কাপড়ের পোষাক পরিধান করতেন। চামড়ার পট্টি দেওয়া থাকতো সেই কাপড়ে। কাঁধে একটি লাঠি হাতে নিজেই বাজারে ঘুরতেন। মানুষের উল্টা সিধা আচরণের জন্য ধমকাতেন। কোথাও খেজুরের বিচি বা সুতা পেলে তা তুলে নিতেন। কোনো ঘরে কুড়ানো জিনিস রেখে দিতেন। ঘরের লোকজন যেন তা দিয়ে উপকৃত হতে পারে।

একবার লোকেরা দেখলো হযরত উমর কাঁধে পানির মশক নিয়ে ঘুরছেন। সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো, আমিরুল মুমিনিন, এ আপনি কী করছেন? হযরত উমর বললেন, আমি নিজের নফসকে লাঞ্ছিত করতে এমন কাজ করছি। আমার ভেতর আত্মম্ভরিতা এসে গিয়েছিল। এই আত্মম্ভরিতার চিকিৎসা স্বরূপ আমি এমন করছি। (আলইলমু ওয়াল উলামা ১৬৩)

তারেক ইবন শিহাব বলেন, হযরত উমর যখন সিরিয়ায় গেলেন, সেখানে পথিমধ্যে একটি খাল পার হতে হয়েছিল। হযরত উমর খুব স্বাভাবিকভাবে উটের পিঠ থেকে নেমে পায়ের মোজা খুলে উটের লাগাম ধরে খাল পার হয়ে গেলেন। এই দৃশ্য দেখে হযরত আবু উবায়দা রা. বললেন, আমীরুল মুমিনিন, আপনি খুব অবাক করা কাজ করলেন। এখানের অধিবাসীরা এমনটি ভাবতেও পারে না যে, কোনো বাদশা এভাবে খাল পার হয়ে যাবে। হযরত উমর রা. আবু উবায়দার বুকে আঙ্গুল দিয়ে বললেন, হায়! আবু উবায়দা, একথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি বলতো!! তোমরা অপদস্থ এক জাতি ছিলে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তাঁর দ্বীনের দ্বারা সম্মানিত করেছেন। এখন তোমরা দ্বীন ছাড়া অন্য কিছুতে সম্মান খুঁজছ? (শুআবুল ইমান ৬/২৯১)

হযরত হাসান বসরি বলেন, আমি হযরত উসমান গনি রা.কে দেখেছি। তিনি বিরাট মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি মসজিদে নববীর মাটিতে শুয়ে থাকতেন। যখন শোয়া থেকে উঠতেন তখন তার শরীরে মসজিদের কংকরের ছাপ থাকতো। আমরা তাঁর দিকে ইশারা করে বলতাম, ইনি হচ্ছেন আমিরুল মুমিনিন। (আল ইলমু ওয়াল উলামা ১৭৪)

আমীরুল মুমিনিন হযরত আলি রা.কে একজন দেখতে পেল, তিনি পরিবারের জন্য বাজার থেকে গোশত কিনে চাদরের ভেতর ভরে নিয়ে যাচ্ছেন। লোকটি বললো, হযরত, আমাকে দিন, আমি আপনার বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। হযরত আলি বললেন, না ভাই, গেরস্থ নিজেই নিজের জিনিস বহন করা উচিত। (ইহইয়াউল উলুম ৩/২১৪)

সাহাবী ও তাবেয়িদের বিনয়ের কয়েকটি শিক্ষণীয় ঘটনা

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন সালাম রা. একবার তেলের ঘড়া নিয়ে নিজের বাগানের বাইরে গেলেন। লোকেরা তাকে দেখে বললো, হযরত, আপনি তো একাজ আপনার কোনো গোলামকে দিয়ে করাতে পারতেন। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, আমি নিজেকে পরীক্ষা করছি, এই কাজ আমার কাছে খারাপ লাগছে না তো? অর্থাৎ যদি নফসের উপর ভারি মনে হয়, তাহলে বুঝবো আমার ভেতর বিনয়ের ঘাটতি আছে। (শুআবুল ইমান ৬/২৯৭)

নবীজীর বংশধরদের মাঝে উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত আলি ইবনুল হুসাইন জয়নুল আবেদিন রহ. ইন্তিকাল করলেন। তাঁকে যারা গোসল করালো তাঁরা দেখতে পেল, তাঁর কোমর মুবারকে কালো কালো দাগ পড়ে আছে। পরিবারের লোকদের জিজ্ঞেস করা হলো, এটা কিসের দাগ? তারা জানালেন, হযরত ইমাম জায়নুল আবেদীন রহ. প্রত্যেক রাতে খাবারের বোঝা বহন করে মদীনার দরীদ্রদের মাঝে খাবার বণ্টন করতেন। খাবার যে বস্তা বা থলিতে বহন করতেন সেই বস্তা বা থলির দাগ এটি। (আল ইলমু ওয়াল উলামা ২৭২)

হযরত উমর ইবন আব্দুল আযিয রহ. এর কাছে এক ব্যক্তি রাত্রি বেলায় অতিথি হলো। তিনি প্রদীপের আলোয় কিছু লিখছিলেন। এসময় প্রদীপ নিভে যাবার উপক্রম হলে অতিথি বললো, আমার কাছে দিন, আমি চেরাগ ঠিক করে দিচ্ছি। হযরত উমর ইবনু আব্দুল আযিয রহ. জবাবে বললেন, অতিথিকে দিয়ে কোনো কাজ করানো ভালো কথা নয়। একথা শুনে মেহমান ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে মেহমানের সেবা গ্রহণ করবেন না, তাহলে আপনার গোলামকে বললেই তো পারেন, গোলাম এ কাজ করে দিতে পারবে। খলিফা উমর ইবনু আব্দিল আযিয বললেন, না, সে মাত্রই ঘুমিয়েছে। কাচা ঘুম ভাঙানো ঠিক হবে না।

তারপর হযরত উমর ইবন আব্দুল আযিয উঠে গিয়ে নিজেই নিজের প্রদীপে তেল ঢেলে প্রদীপ ঠিক করলেন। অতিথি বিস্ময় নিয়ে বললো, আমিরুল মুমিনিন, আপনি নিজেই এই কষ্ট শিকার করলেন। এত বেশি বলার কারণে খলিফা উমর ইবন আব্দিল আযিয এবার উত্তর দিলেন, ‘যখন আমি তেল আনতে যাই তখন আমি উমর ছিলাম, তেল নিয়ে ফিরে এসেও আমি উমরই আছি। নিজ হাতে তেল ঢালার কারণে আমার ব্যক্তিত্ব বদলে যায়নি। আমার কিছু তো কমে যায়নি? আল্লাহর নিকট সব চেয়ে ভালো মানুষ সেই ব্যক্তি যে বিনয়ী ও বিনম্র কোমল।’ (ইহয়াউল উলুম ৩/২১৪)

বিনয় সম্পর্কে মনীষীদের কয়েকটি মূল্যবান উক্তি

হযরত আম্মাজান আয়শা রা. বলেন, লোকসকল, তোমরা বিনয়ের মত উৎকৃষ্ট ইবাদতের ব্যাপারে অবহেলা করছো। (কিতাবুয যুহদ ১৩২)

রাসূল সা. এর বিখ্যাত সাহাবি হযরত মুআয ইবন জাবাল রা. বলেন, কেউ পরিপূর্ণ ইমান হাসিল করতে চাইলে তাকে অবশ্যই বংশমর্যাদার চেয়ে বিনয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, অধিক সম্পদের চেয়ে স্বল্প সম্পদ অধিক প্রিয় হতে হবে এবং শত্রু মিত্র উভয়ের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। নিজের পরিবারের জন্য যেমনটি পছন্দ করে অন্যদের জন্যও তেমনটি পছন্দ করতে হবে। (কিতাবুয যুহদ ৫২)

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলতেন, বিনয় মানুষের মনে মহব্বতের বীজ বপণ করে আর অল্পে তুষ্টি প্রকৃত প্রশান্তি সৃষ্টি করে। (আল ইলমু ওয়াল উলামা ২২২)

হযরত আবু হাযেম বলেন, তিনটি বিষয় কারো মাঝে পাওয়া না গেলে তাকে আলেম বলা যায় না-

১. নিজের চেয়ে বড় মানুষের সঙ্গে হঠকারিতা করবে না।
২. নিজের চেয়ে ছোট ব্যক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না।
৩. এবং নিজের ইলমের কোনো পার্থিব বিনিময় প্রত্যাশা করবে না।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ হযরত সুফিয়ান সাউরি রহ. এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও নিজের জন্য মজলিসে কোনো বিশেষত্ব রাখা পছন্দ করতেন না। সাধারণের সাথে একসাথে বসতে পছন্দ করতেন। যে কোনো এক প্রান্তে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে যেতেন। সব সময় পা গুটিয়ে বিনয়ের সাথে বসতেন। (কারও সামনে পা ছড়িয়ে বসতেন না।) (আল ইলমু ওয়াল উলামা ৩৫৮)

হযরত যায়েদ ইবন হাবীব রহ. বলতেন, একজন আলেম বা ফকীহের জন্য একটি বড় ফিতনা হচ্ছে সে অন্যের কথা শোনার চেয়ে নিজের কথা বেশি বলতে চায়। অনেক সময় সে কথা না বললে একই কথা অন্য কেউ বলতে পারে কিন্তু সে তাকে সুযোগ না দিয়ে নিজেই কথা বলে। (কিতাবুয যুহদ ১৬)

নসর ইবন হাজিব রহ. বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. উমর ইবনু যার-এর ওয়াজ শুনতে যেতেন। এতে কোনো লজ্জা বোধ করতেন না। অথচ এই উমর ইবন যার খুব সাধারণ একজন আলেম ছিল। একবার দেখা গেল, ইমাম আবু হানিফা তার ওয়াজ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, আর তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। (উকুদুল জুমান ২২৯)

উপরের এসব বিষয় সামনে রেখে আমাদের নিজেদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া উচিত। আজকের দিনে বিনয়ের দাবি তো খুব আছে কিন্তু প্রকৃত বিনয় খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। চারদিকে কেবল আত্মম্ভরিতা, দাম্ভিকতা, নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা এবং কে কত নিজেকে জাহির করতে পারে কেবল সেই প্রতিযোগিতা। এসব নষ্ট প্রতিযোগিতার কারণে জীবনের স্বাদ বিনষ্ট হয়ে গেছে। ইমানের মজা আর মিষ্টতা হৃদয় থেকে হারিয়ে গেছে। বাহ্যিক গোছগাছ তো পূর্ণ মাত্রায় রয়েছে কিন্তু ভেতর থেকে কেবলই শুন্যতা।

অন্তর এতটাই অন্তসার শুন্য যে ঢেকে রাখতে চাইলেও ঢেকে রাখা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খুব শান্ত ভাবে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। এবং নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে যেতে হবে। অন্তর থেকে চেষ্টা করলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পথ দেখাবেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর একান্ত অনুগ্রহে আমাদের সবাইকে ইমানি গুণে গুণান্বিত হওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।

প্রথম পর্ব পড়ুন: দ্য ট্রু মুসলিমস আইডেন্টিটি

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com