৩রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

নকল ও ভেজাল ওষুধে স্বাস্থ্য খাতে হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক ● দেশজুড়ে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের নকল ও ভেজাল ওষুধ। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোভাবেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। আর গত এক বছরে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন বা বিক্রয়ের দায়ে ২ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে । কিন্তু তারপরও ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের অপতৎপরতা কমেনি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওই ধরনের ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার তেমন কোনো জোরালো উদ্যোগ না থাকায় তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র মতে, গতবছর সারাদেশে নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে মামলা ২ হাজার ১৬৯টি হয়েছে। তার বাইরে নিম্নমানের ওষুধের উৎপাদন ও বিপণনের অভিযোগে ড্রাগ কোর্টে ৪১টি ও ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ৬৪টি মামলা হয়েছে। ওই সময়ে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের অভিযোগে জরিমানা আদায় হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকারও বেশি। আর নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে ১৭ কোটি টাকার। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেয়া হয়েছে ৫৮ জন আসামিকে। সিলগালা করে দেয়া হয়েছে ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস (জিএমপি) গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় এবং ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের দায়ে বিভিন্ন সময় ৮৬টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়। আর চিরতরে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের। তবে স্বাস্থ্য খাতে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের দৌরাত্ম্য বন্ধে  এতোটুকুই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি শাস্তি পাওয়া উৎপাদনকারী ও বিক্রেতারা যাতে আবার তাদের কার্যক্রম শুরু করতে না পারে সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সাথে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমেও তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।

সূত্র জানায়, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি হয় সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে। তার মধ্যে একটি হলো শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানির নকল ওষুধ উৎপাদন। অন্যটি উপাদানের পরিমাণে হেরফেরের পাশাপাশি গুণগত মান বজায় না রাখার মাধ্যমে নিম্নমানের ওষুধ তৈরি। ফলে ওসব ওষুধ ব্যবহারে একদিক থেকে কাক্সিক্ষত ফল তো পাওয়াই যায় না, বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে রোগীর মৃত্যুও আশঙ্কা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নানাভাবে প্ররোচিত করার মাধ্যমে ওসব ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি করা হয়। আবার অনেক সময় মূল ওষুধের উচ্চমূল্যের অজুহাত তুলে একই মানের দাবি করে অন্য ওষুধও ধরিয়ে দেয়া হয়। তাছাড়া নামিদামি ব্র্যান্ডের ওষুধের মতো দেখতে বিভিন্ন ভেজাল ওষুধ বিক্রির বিষয়টি তো রয়েছেই। প্রথমসারির গুণগত মানসম্পন্ন ৩০টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দেশের ওষুধের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি চাহিদা পূরণ হয় আমদানি, অন্যান্য মাঝারি ও ছোট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের মাধ্যমে।

সূত্র আরো জানায়, দেশে নিম্নমানের ও নকল বা ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদনকারী ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে অধিদপ্তর। দেশের বাজারে বর্তমানে নিম্নমানের ও নকল-ভেজাল ওষুধের পরিমাণ ৩-৫ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। নকল-ভেজাল, মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধে দেশের বিভাগীয় শহরসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মডেল ফার্মেসি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার কার্যক্রম সারাদেশে চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা, সিলেট, নোয়াখালী ও খুলনায় মোট ৩০টি মডেল ফার্মেসি ও সাতটি মডেল মেডিসিন শপের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের সহায়তায় ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া, নকল ওষুধ চিহ্নিতকরণ ও নির্ধারিত মূল্যে ওষুধ বিক্রয়ের বিষয়ে অনলাইনভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের জন্য ওয়েব পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপি¬কেশন শীর্ষক একটি প্রকল্পের কার্যক্রমও এখন পাইলট পর্যায়ে রয়েছে। অ্যাপটির মাধ্যমে ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া অ্যাপটির মাধ্যমে ওষুধের নির্ধারিত মূল্য যাচাই করাও সম্ভব হবে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সিনিয়র ড্রাগ সুপার সৈকত কুমার কর জানান, অধিদপ্তরের জনবল বেড়েছে। ফলে তদারকি এবং দেশব্যাপী নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। এ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে ঔষধ প্রশাসনের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com