২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

নারী চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা

নারী চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা

জীবন রায়হান : আলীনগর চা বাগানের শ্রমিক সুমি। বয়স ২৬ বছর। এর মধ্যেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে সে। ঘাড় ও পিঠে অসহনীয় ব্যথা। শারীরিক এ সমস্যা নিয়েই প্রতিদিন চা পাতা সংগ্রহ করে চলেছেন সুমি। ব্যথাটা খুবই তীব্র হওয়ায় শরণাপন্ন হন বাগানের মেডিকেল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। যদিও চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় কদাচিৎ। একজন কম্পাউন্ডার থাকলেও সব সময় পাওয়া যায় না তাকে। বাধ্য হয়ে চিকিৎসা ছাড়াই রোগ পুষে রাখতে হচ্ছে এ চা শ্রমিককে। ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ খুপড়িতেই বছরের পর বছর পরিবার নিয়ে বাস করছেন সুমি। মজুরি হিসেবে দৈনিক যে ৮৫ টাকা পান, তা দিয়ে কোনোমতে খাওয়া-পরা চললেও পুষ্টির ঘাটতি থেকেই যায়। রোগব্যাধি হলেও ওষুধপথ্য কেনার সামর্থ্য থাকে না। বাধ্য হয়ে রোগব্যাধিকে সঙ্গী করেই বেঁচে থাকতে হয় সুমিদের মতো চা শ্রমিকদের।

কী ধরনের পরিবেশে দেশের চা শ্রমিকদের কাজ করতে হয়, তা নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। ‘আ স্টাডি রিপোর্ট অন ওয়ার্কিং কন্ডিশনস অব টি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কার্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত। চা শ্রমিকদের ৬৩ শতাংশই রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। দেশের ১০টি চা বাগানের ২৯৭ জন শ্রমিকের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘসময় ধরে কাজ করলেও ঝড়বৃষ্টিতে আশ্রয় নেয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই কর্মক্ষেত্রের পাশে। বিশ্রামও সেভাবে পান না শ্রমিকরা। অভাব রয়েছে নিরাপত্তা কিটস, টয়লেট সুবিধার। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ছাড়াও পুষ্টিকর খাদ্য না পাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে চা শ্রমিকদের মধ্যে। স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ৭৫ শতাংশের বেশি চা শ্রমিকের। ৮৪ শতাংশ চা শ্রমিক ভোগেন মাথাব্যথায়। মাংসপেশির ব্যথা নিয়েও কাজ করেন ৭৪ শতাংশ শ্রমিক। আর পিঠের ব্যথায় আক্রান্তদের ৭২ শতাংশ এসব রোগে ভুগলেও চা শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা বেশ দুর্বল। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চা শ্রমিকরা প্রতিদিন গড়ে ৮৫ টাকা মজুরি প্রাপ্য হলেও পাচ্ছেন গড়ে ৬৯ টাকা। দেশের এ মজুরি হার ভারতের চেয়েও অনেক কম। নির্দিষ্ট ওজনের মধ্যেই চা তুলতে পারলে কেবল ৮৫ টাকা পেয়ে থাকেন। এর চেয়ে কম তুললে হাজিরা থেকে কাটা পড়ে নির্দিষ্ট হারে। ৫৫ শতাংশ চা শ্রমিকের মাসিক আয় ১ হাজার ৫০১ টাকা। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশ শ্রমিকের আয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ৩ হাজার টাকা আয় করেন মাত্র ২ শতাংশ চা শ্রমিক। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। কেননা ৯৩ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পাচ্ছেন। চা শ্রমিকদের ৬৪ শতাংশই নারী। গবেষণার তথ্য মতে, ৯০ শতাংশ চা শ্রমিকই তাদের সুপারভাইজারের কাছে হয়রানির শিকার হন।

১৯৬২ সালের ট্রি প্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স ও ১৯৭৭ সালের প্ল্যান্টেশন রুলসে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য বাগান মালিকদের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও এর কোনো বাস্তবায়ন প্রতিফলন আজ অবধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চা বাগান মালিক বলেন, চা শ্রমিকদের জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করা হচ্ছে। চা শ্রমিকদের আমরা নিজেদের মানুষই মনে করছি। এজন্য সরকারের বেঁধে দেয়া ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন ছাড়াও রেশন ও স্বাস্থ্যসুবিধা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া চা বাগানের নারীদের যে ধরনের মাতৃত্বকালীন সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তা অন্যান্য শ্রমঘন শিল্পের তুলনায় অনেক ভালো। পাশাপাশি প্রতিবছরই তাদের মজুরি বাড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের একজন নেতা বলেন, বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত চা শ্রমিকরা। ৮৫ টাকা মজুরিতে কারো পক্ষেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। মালিকরা অনেক বেশি লাভবান হলেও শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে দিনের পর দিন। সময় উপযোগী ও বাজারদরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সবার সম্মতিক্রমে চা শ্রমিকদের জন্য একটা মজুরি নির্ধারণ এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

চা শ্রমিকদের আবাসও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ শ্রমিক মালিকের দেয়া ব্যবস্থাপনায় থাকলেও তাদের আবাসস্থলের আকার, সুযোগ-সুবিধা, পরিমাণ ও জায়গা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন ৫৬ শতাংশ শ্রমিক। কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই রোদ-বৃষ্টিতে চা বাগানের টিলাগুলোর জঙ্গল ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখতে গিয়ে তারা নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন। কিন্তু বাগানে ভালো চিকিৎসা ও ওষুধ না থাকায় তারা রোগাক্রান্ত হয়েও কাজ চালিয়ে যান। কারণ হিসেবে তারা জানান, যা মজুরি তারা পান তা দিয়ে পরিবারের দু’বেলা ভাতের নিশ্চয়তা থাকে না। আর্থিক এ টানাপোড়েনের মধ্যে বাগানের বাইরে গিয়ে কীভাবে নেবেন চিকিৎসা সেবা। তাই নানা রোগবালাই তাদের চিবিয়ে খায়।

চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত নিম্নমানের কথা উল্লেখ করে এক চা শ্রমিক নেতা বলেন, অধিকাংশ চা বাগানের মেডিকেলে রোগীদের জন্য বসার কোন ব্যবস্থা নেই। একজন অসুস্থ চা শ্রমিক মেডিকেলে সিকলিস্টে নাম লেখাতে দীর্ঘসময় ধরে মেডিকেলের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে হয়। রোগীদের জন্য স্যালাইন, নাপা, হিসটাসিন, প্যারাসিটামল, মেট্রিল ছাড়া এখানে আর কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যানুসারে, দেশে এখন চা বাগানের সংখ্যা ১৬৪টি, যেখানে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমিতে চা আবাদ করা হয়। এসব বাগানে নিবন্ধিত চা শ্রমিকের সংখ্যা ৮৯ হাজার ৮১২ জন। কিন্তু পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় সাড়ে তিন লাখ শ্রমিক। নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী প্রায় ১২ লাখ, যার সিংহভাগই ক্ষুন্দ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। সাঁওতাল, ওঁরাও, মোন্ডা, দেশওয়ারী, মোরা, উড়িয়া, খাড়িয়া, রাজবংশী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের চা শ্রমিক। কয়েক বছর ধরেই ছয় থেকে সাড়ে ছয় কোটি কেজি চা উৎপাদন করছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা। বিশ্ববাজারে প্রায় ২ শতাংশ চায়ের অংশীদার বাংলাদেশ, তারপরও চা শ্রমিকরা থাকছেন বঞ্চিত। এমনকি চা বাগানগুলোয় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের উপযোগী শিশুর অর্ধেকই রয়েছে শিক্ষার বাইরে।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় চা-শ্রমিকেরা সব দিক থেকেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ নিরক্ষরতা। দেশে বাজেটের বিরাট অংশ যেখানে ব্যয় হচ্ছে শিক্ষাখাতে, সেখানে চা শ্রমিকদের শিক্ষার হার অতি নগণ্য। দেশের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য চাকুরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন কোটা-সুবিধা রয়েছে, চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য তেমন কিছু নেই। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়তুফান সবকিছু মাথায় নিয়েই চা বাগানে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। বৃষ্টি বা ঝড়ের সময় সামান্যতম আশ্রয়ের জন্যও নেই কোনো শ্রমিক ছাউনি।

চা বাগানগুলোতেও নারী শ্রমিক বা তাদের পরিবারের জন্য থাকে না পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধাও। শিক্ষা, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা, বসবাসের জন্য উপযোগী বাসস্থানসহ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাগান কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে চা শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইনে উল্লেখ করা এসবের কোনো কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন বাড়াতে হলে শ্রমিকদের দিকে নজর দেয়া সবার আগে জরুরি। আর মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের অধিকার লঙ্ঘন করা তো রীতিমতো দ-ণীয় অপরাধ এবং অমানবিকতাতো বটেই।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com