শিশুর প্রতি মমতার আচরণ জরুরি

শিশুর প্রতি মমতার আচরণ জরুরি

শিশুর প্রতি মমতার আচরণ জরুরি

এম জসীম উদ্দিন : শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুদের মাধ্যমেই গড়ে ওঠবে সময়ের নতুন বিশ্ব। তাই যে কোন সচেতন ও সভ্য সমাজ শিশুকে দেয়া হয় সর্চোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ বয়স্করা চলে যাবে, শিশুরা সেই জায়গা দখল করবে এটিই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। সুস্থ, সুন্দর, উন্নত ও দক্ষ জাতি গঠনে শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত তাদের মাধ্যমেই এই বিশ্বের নিরন্তর এগিয়ে যাওয়ার নিয়ম প্রতিফলিত হয়। তাই ইসলাম শিশুকে স্নেহ-মমতা ও আদর যত্ন দিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে। যাতে শিশুরা প্রকৃত মানুষ ও সুনাগরিক হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারে।

শিশুদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (তিরমিজি হাদিস নং-১৯২১)। শিশুর প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের তাগিদ দিয়ে মহানবী (সাঃ) আরো বলেছেন, ‘ শিশুদের প্রতি স্নেহ ও আদর দেখায় না, এমন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করা উচিত’। ভালোবাসা ও স্নেহ শুধু নিজের বাচ্চাদের প্রতি সীমাবদ্ধ রাখা নয় বরং ইসলামের দৃষ্টিতে সকল শিশুর প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা প্রকাশ আবশ্যক, বিশেষ করে এতিম শিশুদের স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করা জরুরি।

অনেক সময় দেখা যায় শিশুরা ঠিকঠাক মতো খেলাধুলা করলেও পড়তে বসলে তাদের মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে বাবা-মাকে বিষয়টি অত্যন্ত সচেতনতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। অযথা রাগারাগি করা বা গায়ে হাত দেয়া এক্ষেত্রে অনুচিত। মনে রাখতে হবে শিশুরা অনুকরণ প্রিয়, তারা তাদের চারপাশে যা দেখে তাই শেখে। কাজেই শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণ করতে হবে খুব সাবধানতার সাথে।শিশুরা অত্যন্ত অনুসন্ধিৎসু। তারা আশেপাশে যা দেখে যে সম্পর্কে প্রশ্ন করে। এক্ষেত্রে তারা অনবরত প্রশ্ন করতে থাকে। এই বারংবার প্রশ্ন করা অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের বিরক্তির উদ্রেক করে। কিন্তু বিরক্ত হয়ে তাদের থামিয়ে দেয়া মোটেই ঠিক নয়। এতে একদিকে যেমন তাদের জানার আগ্রহ বাধাপ্রাপ্ত হয়, অন্যদিকে তারা মানসিকভাবেও আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

তারা তখন আর অভিভাবকের কাছে কিছু জানতে চায় না অথচ প্রশ্ন করার মাধ্যমেই একটি শিশু তার জ্ঞানের ভা-ারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তাই শিশুকে প্রশ্ন করতে দেয়া উচিত। অভিভাবকের মনে রাখতে হবে সন্তানদের জ্ঞানের ভা-ার সমৃদ্ধ করতে পড়ার বিকল্প নেই। তাই তাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে। কিছু নির্দিষ্ট পারিবারিক আচরণ জন্মের আগে থেকে শুরু করে শৈশব পেরোনোর আগ পর্যন্ত শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে জরুরি তথ্য দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য, গণমাধ্যমের অপ্রতুলতা এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এখনও মিডিয়া ডার্ক এলাকায়, যারা টিভি, রেডিও ও ইন্টারনেট ব্যবহার সুবিধার বাইরে রয়েছে।

শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে তারা সাধারণত জেদী হয়না। তাদের মতামত ধৈর্য্য সহকারে শুনে তাকে সঠিকভাবে বোঝালে সে ঠিক বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করবে। শিশুকে মিথ্যাবলার জন্য তিরস্কার না করে বুঝিয়ে বললে সে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকবে। শিশুকে বোঝাতে হবে, খেলার সাথে সাথে তার লেখাপড়াও কেন করতে হবে। শিশুর প্রতি কোনো রকম কঠিন আচরণ করার আগে নিজের শিশুবেলার কথা স্মরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সকল শিশুই আমাদের কাছে সমান তাই সকলের প্রতি একই আচরণ করতে হবে। স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে শিশুর মন জয় করা সবচেয়ে সহজ তাই যে দিকটা অভিভাবকদের বিবেচনায় রাখতে হবে।

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই বস্তিতে বাস করায় দ্রুত নগরায়ন মৌলিক সেবার ওপর আরো চাপ তৈরি করছে। বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সবাই সুবিধা না পাওয়ায় বহু পরিবার শিশুদের চাহিদা মেটাতে পারে না। এসব শিশুর অধিকার, বিকাশ ও সুরক্ষা নিয়ে কোনো কথাও তারা বলতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জন্য যে সব সেবা রয়েছে সে বিষয়গুলো সম্পর্কেও তারা জানে না। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে এবং সরকার প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে জানাতে প্রচার আরো বাড়াতে হবে।

তাই আসুন শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা আচরণে সচেতন হই। কারণ তাদের প্রতি সঠিক আচরণ না করলে তারা সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে না, ফলে সমাজ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনে রাখতে হবে লেখাপড়া, খেলাধুলা, বিশ্রাম, আদরযত্ন, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল শিশুর পরিপূর্ণ ও সঠিক বিকাশ সম্ভব।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *