সন্তান যখন বাবার ভূমিকায়

সন্তান যখন বাবার ভূমিকায়

সন্তান যখন বাবার ভূমিকায়

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আমার বাবা মারা গেছেন দশ বছর। সেই থেকে বাবার স্নেহ- ভালবাসা বঞ্চিত। বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন, তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা আমাকে জাগিয়ে তুলত সবসময়। কি যে এক ছায়া ছিল মাথার উপর, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাই।

বাবার শাসন ছিল খুব কঠোর। বিশেষ করে আল্লাহর হুকুমের কোন গাফলতি তিনি সহ্য করতেন না। একদম ছোট থাকতেই নামাজে পাবন্দী আমি। এটা বাবার কারণেই। তিনি ছোট থেকে আমাকে নামাজ শিক্ষা দিয়ে ছিলেন। বাড়ীতে যখন নামাজ পড়তেন, বাবার সাথে আমিও পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। দুজনে এক জামাতে নামাজ পড়তাম।

বাবা যখন মসজিদে যেতেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন।এবং এই নিয়মে কোন ফাঁকি- বাজি করা যেত না।

ছোট বেলা থেকেই দেখতাম, বাবা শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে অপেক্ষা করতেন ফজরের আজানের জন্য। আজানের সাথে সাথে বাবার ডাক শুরু হয়ে যেত। না উঠা পর্যন্ত তিনি ডাকতেই থাকতেন।

আমাদের গ্রামে সে সময় কোন মসজিদ ছিল না। বাবার সাথেই ফজরের নামাজ জামাতে পড়তে হত। বাবা ইমাম আর আমি মুক্তাদী। বাবার সাথে জামাতে নামাজ পড়তে পড়তে তাঁর সকল ক্বেরাতগুলো মুখস্থ হয়ে ছিল আমার।

বাবা কোরআন পড়া জানতেন, কোরআনুল কারীমের বিশেষ বিশেষ জায়গা তাঁর মুখস্থ ছিল। যেমন ২৬ পারার সুরা “ক্বফ” থেকে কিছু অংশ। ১১ পারার সুরা তাওবার শেষের আয়াত। সুরা হাশরের শেষের তিন আয়াত। সুরা দোহা, সুরা ইনশিরাহ, সুরা ফীল, থেকে নাছ পর্যন্ত।

বাবার পিছনে নামাজ পড়তে পড়তে আমারও ক্বেরাত গুলো মুখস্থ হয়ে যায়। আমি হুবহু বাবার মত বলতে পারতাম। বাবা পর্দার ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। গান- বাদ্য অপছন্দ ছিল। সুদ- ঘুষ ইত্যাদি গর্হিত কাজ গুলো কখনো দেখতে পারতেন না।

বাবার শাসনেই বড় হয়েছি। লেখা পড়া শেষ করেছি। কর্ম জীবনেও বাবার শাসনেরর বাইরে যায়নি কখনো। আমি কোথায় কি করি, সেটাও তিনি খোঁজ রাখতেন। বাড়ীতে গেলে তাঁর শাসন মেনেই চলতে হয়েছে।

যাইহোক বাবার সে সব স্মৃতি গুলো বার বার মনে পড়ে। তাঁর শাসনের কথা খুব স্মরণ হয়। তিনি কঠোর ছিলেন বলে মনে হয় কিছু শিখতে পেরেছি। তাঁর কঠোর নেগরানীর কারণে এ সমাজে দাঁড়াতে পারছি।

২০০৯ সনে বাবা ইন্তেকাল করেন। সেই থেকে বাবার স্নেহ মাখা শাসন বন্ধ হয়ে আছে। বাড়ীতে গেলে এখন আর কেহ নামাজের জন্য ডাকেনা। এখন আর কেহ বলেনা জামাতে গাফলতি কেন?

আলহামদুলিল্লাহ, বাবা চলে যাওয়ার পরে ২০১২ সনের শেষের দিকে আমি একজন বাবা পেয়ে গেলাম। এক পুত্র সন্তানের জনক হলাম। ঠিক তার শাসনটা ও আমার সেই বাবার মত। অবিকল যেন আমার সেই বাবা। মেজাজটা ঠিক আমার বাবার ফটোকপি।

ছেলেটা সাত বছর পেরিয়ে গিয়েছে। আমার সাথেই মাদ্রাসায় আসা যাওয়া। এখন নাজেরা বিভাগে পড়ে। তবে চাল- চলন আমার বাবার মতই। শাসনটা করে আমার সেই বাবার মত।

নাজেরাতে পড়লেও পাগড়ী থাকে নামাজের সময়। আর মাঝে – মধ্যে একটু শাসন করে আমাকে। জামাতে গাফলতি, কোন সময় জামাতে মাসবুক হলে তো আমার আর রক্ষা নেই। একটু নিরিবিলি টাইমে চলে আসে আমার দপ্তরে। একটু আস্তে আস্তে বলবে, অমুক সময় জামাতে মাসবুক হলে কেন?

খানা খেতে বসলে যদি টুপি ভুল করে ফেলি, আস্তে করে উঠে গিয়ে টুপি এনে আমার মাথায় পরায়ে দিবে। দস্তার খান না থাকলে দস্তার খানের ব্যবস্হা করবে। আবার আমাকে না দেখলে তার কাছেই জবাবদিহি করতে হয়, গতকাল অমুক সময় কোথায় ছিলে? আবার কোথায় রওয়ানা হলে, বলবে, কোথায় যাচ্ছ?

একদম আমার বাবার মত শাসন চলছে। বাবার অভাব টা যেন মেটায়ে দিচ্ছে আমাকে। আসলে সন্তানকে ছোট থেকে দ্বীন শেখালে এটাই ফায়দা। তাকে নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না। শিশু কালের শিক্ষা পাথরে অংকনের মত। যা শেখানো হবে, সেটা খোদাই করার মত গেঁথে যাবে শিশুর অন্তরে।

শিশুকাল থেকে বাচ্চাদের নামাজ শেখালে, সুন্নাত শেখালে জীবনটা তার সেভাবেই পরিচালিত হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *