জোয়ার-ভাটায় ইমরান খান বনাম মাওলানা ফজলুর রহমান

জোয়ার-ভাটায় ইমরান খান বনাম মাওলানা ফজলুর রহমান

পাকিস্তানের রাজনীতির জোয়ার-ভাটায় ইমরান খান বনাম মাওলানা ফজলুর রহমান

সৈয়দ মবনু : আজকে আমার জোয়ার তো কালকে আসছে ভাটা, আজকে আপনার ভাটা তো কালকে আসছে জোয়ার। রাজনীতিতে অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলছে জোয়ার-ভাটার কারবার। দাবা খেলোয়াড়িদের মতো রাজনীতিকরাও ধ্যানে থাকেন চাইল দিয়ে রাজা চেকের। প্রতিপক্ষ রাজার চেক প্রতিরোধ করতে না পারলে খেলা শেষ। আবার কখনও কখনও প্রতিপক্ষের পাল্টা চাইলে গণেশ উল্টে যায়। কেউ কেউ রাজা চেক দিতে ভুল করে নিজের রাজা কিংবা মন্ত্রী হারান।

রাজনীতিতে এমন জোয়ার-ভাটার দাবা খেলা চলছে যুগযুগ থেকে। পাকিস্তানের রাজনীতির মাঠে কিছুদিন আগেও ইমরান খান ছিলেন একা খেলোয়াড়ি। কাশ্মির ইস্যুতে জাতিসংঘে যৌক্তিক এবং শৈল্পিক বক্তব্য দিয়ে ইমরান খান একেবারে দু ছক্কা পাঁচ উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এরই মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান নতুন দান দিয়ে একেবারে রাজা চেক দিয়ে বসলেন।

মুসলিমলীগ নেওয়াজ শরিফ-শাহবাজ শরিফ, পিপলস পাটি ইত্যাদি মাওলানা ফজলুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলো।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কিংবা তাঁর সরকার কিছুটা বেকায়দায় আটকে গেলেন। মাওলানা ফজলুর রহমান এবং তাঁর সঙ্গীদের এক দফা এক দাবী; ইমরান খানের পদত্যাগ। তবে মাওলানা ফজলুর রহমানের এই চাইলকে একেবারে খেলার শেষ পর্যায়ের রাজা চেক বলা যাবে না। ইমরান খান পাল্টা চাইল দিতে পরিকল্পনায় রয়েছেন বলে মনে হয়। ইমরান খান রাজনীতিতে কিছুটা নতুন হলেও একেবারে আনাড়ি বলা যাবে না। ক্রিকেটের মাঠের ভালো খেলোয়াড়ি ইমরান খান সর্বদাই প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরোধে কিংবা প্রতিপক্ষকে গায়েলের ব্যাপারে কৌশলী এবং ধীমান।

সাধারণত ইমরান খানের সিদ্ধান্ত তড়িৎ হয় না। যতটুকু মনে হয় ইমরান খান ও তাঁর সরকার এখন কৌশল তৈরি করছেন মাওলানা ফজলুর রহমানের চাইল ফিরিয়ে পাল্টা চাইল দিতে। প্রতিপক্ষকে গায়েল করার কৌশলে ইমরান খান কতটুকু সফল হবেন তা দেখার জন্য সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

ইমরান খানের পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না এবং এ প্রকারের মিছিল-মিটিং দিয়ে কোন সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করানোটাও বেশ কঠিন। ইমরান খান ইচ্ছে করলে মাওলানা ফজলুর রহমানকে কৌশলে আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী দিয়ে আটকিয়ে দিতে পারতেন, পারতেন অন্য কোন রকশের একশনে যেতে। কিন্তু কৌশলী ইমরান খান সেগুলোতে যান নি।
তিনি প্রথমত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান চাচ্ছেন। তবে তিনি মাওলানা ফজলুর রহমানকে নিয়ে যে সকল মন্তব্য করেছেন এই ক’দিনে তা প্রধানমন্ত্রী সূলভ নয়।

ফলে আলোচনা শুরু হয়েও হচ্ছে না। মুফতি তকি উসমানী-মুফতি রফি উসমানী কিংবা তাঁদের বাবা মুফতি শফি (র.) আমার অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ হওয়ার পরও আমাকে ইতিহাস থেকে স্বীকার করতে হচ্ছে, এই পরিবার ইস্কান্দর মির্জা, আয়ূব খান, ইয়াহিয়া খান, ভূট্টো, জিয়ারউল হক, জেনারেল মোশাররফ, বেনজির, হয়ে ইমরান খানের সরকার পর্যন্ত সবসময় পাকিস্তানের রাজনীতিতে সরকারপক্ষীয় বা দরবারী আলেম। তবে তারা কোনদিনই রাজনীতি ময়দানে সক্রিয় নয়, তাদের অবস্থান মূলত বুদ্ধিভিত্তিক। মুফতি তকি ও মুফতি রফি দুই ভাই ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে মোলাকাত করেছেন। মুফতি ফজলুর রহমানের সাথেও তাদের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তারাও বিষয়টার মিমাংসার জন্য কিছুটা মধ্যস্থতা করছেন বলে মনে হয়।

মাওলানা ফজলুর রহমানের অনেক বদনাম পাকিস্তানি সাধারণ মানুষের মুখে শোনা যায়। তবে একথা সত্য, তিনি ও তাঁর বাবা মুফতি মাহমুদ একেবারে সেই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত সবসময়ই সরকার বিরোধী। সরকারের সাথেও যখন তাদের আপোষ হয়েছে তখনও তারা সরকার বিরোধী হিসাবেই আপোষ করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে কৌশল মাওলানা ফজলুর রহমানের কিছুটা জানা রয়েছে। তা ছাড়া মাওলানা ফজলুর রহমান জাতে পাঠান, পাঠানরা সাধারণত পালিয়ে যায় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তারা যা বলে তা করেই দেখায় কিংবা এই পথে মরে প্রমাণ করে তারা আপোষহীন। মাওলনা ফজলুর রহমানের ক্ষেত্রেও এর বিচিত্র হবে না। মাওলানা ফজলুর রহমানের এই আজাদী লং মার্চের মূল উদ্দেশ্য কি তা আল্লাহই ভালো জানেন। এই আজাদি লং মার্চ দেখার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে হলেও বাস্তবে হয়তো এর পিছনে বৃহৎ এবং দ্বীনি কোন স্বার্থ রয়েছে।

মাওলানা ফজলুর রহমানকে আমি সম্মান করি একটি কারণে, তা হলো তিনি মুফতি মাহমুদের ছেলে। মুফতি মাহমুদ ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে অনেক সংগ্রাম করেছেন এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন। বৃটেন এবং বাংলাদেশে মাওলানা ফজলুর রহমানের সাথে আমার দু’বার দেখা এবং কথাও হয়েছে। রাজনীতিতে তিনি খুবই দক্ষ একজন আলেম। তাঁর সততা নিয়ে যে যাই বলুন না কেন, আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি যে, তিনি এমন কোন কাজ করবেন না যে মুসলিম উম্মাহ এবং দ্বীনের ক্ষতি হয়। কারণ, দ্বীনই তার মূল পূঁজি। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে আমি সরাসরি দেখেছি, বক্তব্য শোনেছি, তবে অন্তরঙ্গ কথা হয়নি। আমি সাধারণত খেলার পাগল নয়, তাই ক্রিকেট খেলোয়াড়ি ইমরানের প্রতি আমার কোন দূর্বলতা নেই। তবে যতটুকু জানি তিনি একজন সৎ মানুষ। অনেকে হয়তো জানেন কিংবা না, একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজির পরিবারের ছেলে হলেন ইমরান খান। তাঁর পূর্ণাঙ্গ নাম হলো ইমরান খান নিয়াজি।

এখানে ইমরান খানকে শ্রদ্ধা জানাতে আমার মনে একটু বাঁধা রয়েছে। তা ছাড়া যে কারণে আমি শেখ হাসিনার সরকারকে সম্মান করেছি গ্রমীণ ব্যাংকের ড. ইউনুসের বিরোধীতা করায়, সেই কারণেই আমি মাওলানা ফজলুর রহমানকে সম্মান করছি ইমরান খানের বিরোধীতার জন্য। তবে তিনি কতটুকু সফল হতে পারবেন তা সময়ের ব্যাপার। এখানে এসে আমি বাংলাদেশে মাওলানা শাহ আহমদ শফির হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন আর পাকিস্তানে মাওলানা ফজলুর রহমানের আজাদী লং মার্চকে একটু একাকার করে পর্যবেক্ষণ করতে চাই, যদি এখানে একটা নিরেট দ্বীনি আন্দোলন এবং অপরটি সরাসরি রাজনৈতিক। কিন্তু অবস্থান কর্মসূচীর ধরণ এক। যদি মাওলানা ফজলুর রহমান তাঁর অবস্থান থেকে পিছু না যান তবে হয়তো ইমরান খানের সরকার এমন কিছু করে বসতে পারে যা সেদিন শাপলা চত্বরে বাংলাদেশ সরকার করেছিলো।

যদি মাওলানা ফজলুর রহমান অবস্থান না ছাড়েন তবে ইমরান খানের সামনে এই পদক্ষেপ কিংবা পদত্যাগের বিকল্প আর কিছু থাকবে না। আর মরতে দম তক কোন সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চায় না, ইমরান খানও চাইবেন না। আমার যতটুকু মনে হয় ইমরান খানের সরকার সেদিকে অগ্রসরের জন্য বিভিন্ন কৌশলি পরিকল্পনা নিচ্ছেন।

মাওলানা ফজলুর রহমান যদি হেফাজতে ইসলামের মতো বেশ ক’টি দাবী উত্থাপন করতেন তবে সরকারের সামনে কিছু একটা মানার পথ খোলা থাকতো। কিন্তু মাওলানা এমন দাবী করে বসে আছেন যা ইমরান খান কিংবা তাঁর দলের পক্ষে মানা সম্ভব নয়।

আমি মনে করি, তা সহজে মানা উচিৎও নয়। যে কোন দলই হোক, এভাবে ঘেরাও এর প্রেক্ষিতে ক্ষমতা ছাড়লে নেতৃত্বের দূর্বলতাই প্রকাশ পাবে এবং এতে দেশ একটি নৈরাজ্যের দিকে চলে যাবে। প্রত্যেক জিনিষের একটা নিয়ম আছে, রাজনীতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরেরও একটা নিয়ম আছে। ইমরান খানকে ক্ষমতা ছাড়তে হলে সেই নিয়ম অনুসরণ করেই করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *