সাদা পোশাকে প্রশ্নফাঁসের কালো দাগ

সাদা পোশাকে প্রশ্নফাঁসের কালো দাগ

সাদা পোশাকে প্রশ্নফাঁসের কালো দাগ

মাসউদুল কাদির : কওমী মাদরাসায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা খুবই কম। কিন্তু হয়নি বা হয় না তা বলা যাবে না। পড়ালেখার জন্য পরীক্ষাটাই কতটুকু জরুরি। এ ধরনের কথাও অনেকে বলেন। যে কারণে আকাবিরগণ স্বীকৃতির অনুষঙ্গ নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করতে দেখিনি বড়দের। কোন শিক্ষার্থী কেমন পড়ালেখা করে বা কেমন রেজাল্ট করতে পারে তা কিন্তু উস্তাদদের নখদর্পণে স্বভাবতই থাকে। একজন সাধারণ ছাত্র অকস্মাৎ ভালো করে ফেললে উস্তাদগণ এটা বুঝতে পারেন। স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নকল বা প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কওমী তরুণদের মাতামাতি অনেক সময় সীমা ছাড়িয়ে যায়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় একটা সম্মানের জায়গা। ওখানে আমাদেরই ভাই, ভাতিজা, বন্ধুবান্ধব পড়াশোনা করে। সেটা অনেক ক্ষেত্রে বুঝতেই চাই না আমরা।

২০০৮ বা ২০০৯ সালের দিকে আমাদের এক অনুষ্ঠানে এক বক্তা বললেন, অমুককে কুত্তা দিয়ে কামড়িয়ে মারা উচিত।

বিচার চাইতে পারি। আমার মতামত দিতে পারি। তাইবলে নবীযুগে যে আখলাকের চিত্র নেই ঠিক ওরকম করে আমরা প্রতিবাদি হয়ে উঠতে পারি না। সময়ে লজ্জিত হই। এখন আলেমদের সমালোচনা পান্তাভাত। হাইআতুল উলইয়ার পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা কেবল দুঃখজনকই নয় এটি কওমী অঙ্গনের জন্য একটি ভয়াবহ আগ্রাসনের ইঙ্গিত। এখন নতুন করে বলার আছে কি যে, আমাদের সচেতন হতে হবে। আলেম উলামা তো সচেতন সবসময়ই থাকেন। বিচক্ষণতা, দক্ষতা পুঁজি হওয়া উচিত সুন্দর কাজের জন্য।

শূন্য দশকে আমরা দেখেছি, বেফাকে যারা পরীক্ষাকেন্দ্রীক কাজের সঙ্গে যুক্ত মাদরাসায় মাদরাসায় তাদের আলাদা কদর। তারা হাদিয়াও একটু বেশি পেতেন। এসব যে উপরের কর্তারা জানতেন না-এমন কথা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। কারণ, তারা বা তাহারা এসমাজেরই মানুষ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মাদরাসাকেন্দ্রীক পরীক্ষায় কখনোই প্রশ্ন ফাঁস হয় না। ইনসাফ ও সততানির্ভর এ প্রতিষ্ঠাগুলোর উস্তাদদের মধ্যে আল্লাহভীতি অতটাই প্রবলতর। শিক্ষার্থীদের মাথায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি কখনো উঁকিই দেয় না।

হাইআতুল উলইয়া প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে- এটা ভালো দিক। কওমী অঙ্গন সবচেয়ে বেশি নীতিবান মানুষ তৈরী করছে— এ বক্তব্য কতটুকু যৌক্তিক তাও ভাবনীয়। সতের বছর থেকে সাত বছরে আরও বিভিন্ন নেসাবের নামে যে সংক্ষিপ্ত রূপায়ণ চলছে মাদরাসায় তা নিয়ে আজই না ভাবলে খাদের কিনারায় পড়তে হবে নিঃসন্দেহে। অনেকে বলেন, আমাদের ছেলেরা পরিপক্ব হওয়ার আগেই আলেম হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব নিতে হচ্ছে সমাজের। অনেক ক্ষেত্রে কাজ করতে হচ্ছে বয়স্ক মুরুব্বীদের সঙ্গে। বিশেষত মসজিদগুলোতে। সেখানে তারা যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ধৈর্য ও সহনশীলতার অভাবে চাকুরিও হারাচ্ছেন অনেকে। যেগুলোর হিসাব কেউ নেয় না। কারণ এই কওমী অঙ্গনের ছেলে মেয়েদের চাকুরি কেউ দেয়ও না, খোঁজও কেউ নেয় না। মিডিয়াতো এদেরকে অচ্যুত মনে করে। কালেভদ্রে এসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো দোষ পেলে এটাকে ফুলিয়ে বড় করে উপস্থাপন করা হয়। সব অভিযোগগুলোকেই ধর্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে মিডিয়া। কারণ, এ সমাজে সাধারণত মসজিদের ইমাম, মাদরাসার মান্যবর উস্তাদগণ বেশ্যাদের সঙ্গে উঠাবসা করেন না। দূরত্ব রেখে চলেন। মিডিয়া যখন সামান্য কিছু পায় তখন এটিকে বড় ইস্যু বানাতে চায়। আর এটা মানুষও খায়। বিস্মিত হয়ে মানুষ পড়ে। পরচর্চাটা এমনভাবে করে মনে হয় সব হুজুরই এমন।

বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সবসময় একশ্রেণির মিডিয়া বড় করে উপস্থাপন করে আঘাত হানতে চায় মূ্লে। রাষ্ট্রে খুন ধর্ষণ বা ইত্যাদি সবই চলে তাই বলে কেউ কিন্তু দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় না। বিচ্ছিন্ন ঘটনা সবখানে ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে অপ্রীতিকর নানা ঘটনা ঘটেনি। এখানে আমি ওসব উল্লেখ করতে চাই না। অন্যায় যে করবে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। এটা মসজিদের ইমাম করুক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক করুক।

কওমী মাদরাসা নিয়ে যারা ভাবেন, যারা দায়িত্বশীল তাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। এ বিষয়ে তরুণদের ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেকেলে সেই পদ্ধতিতে এখন আর প্রশ্নফাঁস ঠেকানো যাবে না। অর্থনৈতিক দৈন অবস্থা থাকলেও সেটি আলোচনার মাধ্যমে অতিক্রম করতে হবে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যত বড় দায়িত্বশীলই থাকুক এর বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে শিগগিরই ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে, দারুল উলূম দেওবন্দের সিঁড়ি থেকে বাংলাদেশের এসব মাদরাসা ছিটকে পড়বে। শুরু হয়ে যেতে পারে নতুন দরসে নেজামীর চিন্তা। যারা কোনো স্বীকৃতি চাইবে না আর প্রশ্নফাঁসও করবে না। শুধুই হুব্বুল্লাহ এবং হুব্বে রাসূ্লের জন্যই পড়াশোনা করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বাঁচান। গর্জন বেশি হলে বর্ষণ হয় কম। যোগ্য, দক্ষ জনবলের মাধ্যমে হাইআতুল উলইয়াকে উচ্চতর মার্গে নিয়ে যেতে হবে।

আফসোস, সবগুলো শিক্ষাবোর্ড ও পাবলিক ইউনিভার্সিটির জন্য শিক্ষনীয় একটি মাধ্যম হতে পারতো হাইআ। পারলো না। শুরুতেই হোঁচট খাওয়ায় ভালো হয়েছে। সতর্ক হওয়া সহজ হবে। ভবিষ্যৎ সুন্দর হোক— প্রত্যাশা এটুকুই

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, আলেম মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম ফোরাম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *