অামরা যদি না জাগি মা | আদিল মাহমুদ

অামরা যদি না জাগি মা | আদিল মাহমুদ

আমাদের জাতীয় কবি নজরুল। যাকে বিদ্রোহী কবি বলে আমরা জানি। নজরুল যেমন বিদ্রোহী ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রেমের কবি। সে প্রেম প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য, দেশের জন্য। বাঙালিত্বের সবটুকু রঙ নিয়ে তিনি কবিতা লিখতেন। নজরুল সঙ্গীতের স্রষ্টা। তবে তিনি শিশুদের কথাও ভাবতেন। শিশুদের জন্যে তিনি ছড়া, কবিতা, গান ও নাটিক রচনা করেছেন। তাঁর শিশু কবিতা জাগিয়ে তুলেছে শিশুদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সব ইচ্ছা, অনিচ্ছা এবং প্রতিভাকে। শিশুদের জন্য রচনার ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ।

কবি নজরুল ইসলাম শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। শিশুদের সঙ্গে অতি সহজেই তিনি মিশে যেতে পারতেন। নজরুল সর্বপ্রথম শিশুদের মনোরঞ্জক কবিতা লিখেন ‘লিচুচোর’। এই কবিতায় শিশুর দুরন্তপনাকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা এককথায় বলতে হয় অনন্য। এ কবিতায় কবি বলেন-

‘বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।’

নজরুলের আরেকটি অনবদ্য গীতকবিতা ’ঘুম পাড়ানী গান’। বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে এই কবিতাটি আবৃত্তি হয় না। প্রতিটি মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় কবিতাটি গেয়ে শোনায় শিশু সন্তানকে। কবিতাটির কি আশ্চর্য ক্ষমতা, শোনার সাথে সাথে শিশুর ঘুম আসবেই। কবি বলেন-

‘ঘুম-পাড়ানী মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো
বাটা ভরা পান দেবো গাল ভরে খেয়ো
ঘুম আয় রে, দুষ্ট খোকা ছুঁয়ে যা
চোখের পাতা লজ্জাবতী লতার মতো নুয়ে যা
ঘুম আয়রে, ঘুম আয় ঘুম।’

শিশুকে ঘুম পাড়াবার জন্যে যেমন নজরুল লিখেছেন ঘুমপাড়ানী গীতকবিতা, তেমনি ঘুম থেকে জাগাবার জন্যেও লিখেছেন উল্লেখযোগ্য ছড়া ‘প্রভাতী’। প্রভাতী কবিতায় কবি বলেন-

‘ভোর হল দোর খোল
খুকুমণি ওঠরে
ঐ ডাকে জুঁই শাঁখে
ফুলখুকী ছোটরে।’

কিছু আগে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের শিশু শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে সুন্দর সুস্ঠ ভাবে দেশ পরিচালনা করতে হয়। কবি নজরুল জানতে শিশুদের মধ্যে এমন প্রতিভা আছে। শিশুরা জাগলে তারা পারবে সুন্দর একটি দেশ উপহার দিতে। তাই কবি নজরুল শিশুদেরকে নিয়ে লেখা ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ কবিতায় বলেন-

‘আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠবে মা গো
রাত পোহাবে তবে।’

আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজ যারা শিশু আগামী দিন তারা জাতির কাণ্ডারী। তাই এ সময় থেকেই তাদের গড়ে ওঠতে হবে। যেতে হবে বহুদূর। এমন এক উজ্জীবনের কবিতার নাম ‘নতুন পথিক’। এ কবিতায় কবি বলেন-

‘নতুন দিনের মানুষ তোরা
আয় শিশুরা আয়!
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।
নতুন তারায় বেভুল পথিক
আসলি ধরাতে
ধরার পার আনন্দ-লোক
দেখাস ইশারায়।’

আমাদের সমাজে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য সমাজে নিজেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এর ফলে শিশুর শৈশব জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে পিতা-মাতার চাপে পড়াশোনা ও বাস্তবতার জ্ঞান লাভের আশায় ছুটতে ছুটতে। কিন্তু শিশুদের সে যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে নজরুল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন ‘চলব আমি হালকা চালে’ নামক কবিতায়। তিনি বলেন-

‘নাই বা হলাম মস্ত ভারি,
নাই হলো ঘর লাখ-দূয়ারী,
বিশটে ঘোড়া দশটা দ্বারী
ভিড় যে দেওয়ান গোমস্তার।’

আমাদের প্রিয় কবি লিখেছেন অনেক। বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন, ছোটদের জন্যও তেমনি লিখেছেন। তাঁর শিশু পাঠ্য হলো-পুতুলের বিয়ে (নাটিকা ও কবিতা), ঝিঙেফুল (কবিতা), সাতভাই চম্পা (কবিতা), সঞ্চায়ন (কবিতা), মক্তব সাহিত্য (পাঠ্যবই), ঝড় (কবিতা ও গদ্যের কিছু সংকলন), পিলে পটকা, ঘুম জাগানো পাখি (কবিতা), ইত্যাদি।


পাথেয়টোয়েন্টিফোরডটকম/৪০১
সম্পাদনা : মাসউদুল কাদির

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *