আলেমজনতা ঐক্যের দাবিতে যশোর থেকে আল্লামা মাসউদের পথযাত্রা শুরু

আলেমজনতা ঐক্যের দাবিতে যশোর থেকে আল্লামা মাসউদের পথযাত্রা শুরু

পাথেয় রিপোর্ট : আলেমজনতা ঐক্য, মাদক, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও কওমী মাদরাসা স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে যশোর চাঁচড়ার মোড় থেকে ঐতিহাসিক পথযাত্রা শুরু করেছেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

তিনি শনিবার দুপুরে যশোর চাঁচড়ার মোড়ে এক পথসভায় পথযাত্রার উদ্বোধনী ঘোষণা করেন।

মাওলানা মাসউদুল কাদিরের পরিচালনায় ও মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, আজকের তরুণ ও যুব সমাজ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যুব সমাজকে ধ্বংস করতেই মাদকের বন্যা ধেয়ে আসছে আমাদের দেশে।

কেবল অভিযান চালিয়ে মাদকের বন্যা বন্ধ করা যাবে না উল্লেখ করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, মানুষের হৃদয় থেকে মাদকের চাহিদা মিটিয়ে দিতে হবে। আর না হলে মাদকের সয়লাব ঠেকানো যাবে না।

তাবলীগের ইস্যু নিয়ে যে বিভাজন তৈরী হয়েছে তা অনভিপ্রেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে সুন্দর একটা দাওয়াতি কাজ চলছিল। আফসোসের বিষয় হলো, এখানেও বিভক্তি তৈরী করা হয়েছে। বিভাজনকে কমাতেই আমরা এই পথযাত্রা করছি।
কওমী মাদরাসা স্বীকৃতি প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে আল্লামা মাসঊদ বলেন, দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে এর একটা বড় আলামত হলো কওমী মাদরাসা স্বীকৃতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সুন্নী মুসলমান। মাদরাসাকে ভালোবাসেন বলেই তিনি এই স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমরা তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

৬ অক্টোবর শনিবার সকাল দশটায় যশোর চাঁচড়ার মোড়ে ঐতিহাসিক এ পথযাত্রার প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, প্রথমেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি মিডিয়া ও প্রশাসনকর্মীসহ এখানে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষদের।

তিনি বলেন, শ্যামল সুন্দর আমাদের এ বাংলা আল্লাহর অশেষ দান। এ বাংলার অধিবাসীরাও আমাদের দেশের মতোই সুন্দর তাদের অন্তর কোমল ও নরম। এদেশের মানুষ সর্বদাই ইসলাম, আল্লাহ, রাসূলের প্রতি অনুগতশীল ও ধর্মপ্রাণ। ধর্ম ও দ্বীনের প্রতি এতো টান অন্যান্য দেশের লোকদের মাঝে কমই দেখা যায়। আমাদের দেশের মতো ঘনবসতি পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে। তবুও আমাদের দেশ আল্লাহর রহমতে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলছে, আমাদের দেশ সারা পৃথিবীর জন্য এখন একটি রোল মডেল। আমাদের উন্নয়নের গতি ও মাত্রাকে আন্তর্জাতিকভাবে সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন। এমনকি আমাদের এ দেশের দুশমন পাকিস্তানিরাও আজ তাদেরকে সরকারকে আহবান জানায় যে,আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের অন্তত বাংলাদেশ বানিয়ে দাও। অথচ এককালে এ পাকিস্তানিরাই আমাদের পরাধীন করে রেখেছিল।

আমাদের সমস্ত অধিকার খর্ব করে রেখেছিল। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি আজ সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ উন্নয়নের দিকে ধাবমান। কিন্তু আজকে আমাদের যুবসম্প্রদায় হতাশাগ্রস্থ। মাদকাসক্তির করাল থাবায় তারা নিমজ্জিত। মাদকাসক্তির কারণে যুব শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটি দেশের গৌরব ও বড় শক্তিই হল সে দেশের যুবশক্তি। আমাদের যুবসম্প্রদায়ও খুব সমৃদ্ধশালী ও সম্ভাবনাময়। যদি তাদের কাজে লাগাতে পারি তাহলে দেখা যাবে,তারা অনেক বড় বড় কাজ করতে সক্ষম। কাজে তাদের অস্বাভাবিক তৎপর দেখা যায়। তেমনিভাবে আমাদের দেশের থেকে বাহিরে গিয়ে যারা কাজ করছেন।

তারা প্রায় সকলেই প্রশংসিত। কিন্তু আমরাই তাদের কাজে লাগাতে পারছি না বলে তারা মাদকাসক্তিতে লিপ্ত। আর কিছি সংখ্যক দুষ্কৃতকারী আছে যারা নিজেদের আত্মিক লাভের জন্য যুবসমাজকে মাদকের বিশাক্ত ছোবলে আক্রান্ত করছে। আমি বারবার এ কথা বলেছি যে,ক্রসফায়ারের মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব নয়। সারাদেশ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেললেও এর সমাধান সম্ভব নয়। যদিনা এর ব্যবহারকে প্রতিহত না করা যায়। যতদিন পর্যন্ত এর ব্যবহারকারী থাকবে ততদিন পর্যন্ত মাদকের ছোবল কমানো যাবে না। তবে হ্যা! এই ব্যবহারকে রুখতে পারে উলামায়ে কেরাম। কারণ,তারা যদি মানুষকে নৈতিকতার দিকে উদ্বুদ্ধ করে তবেই কেবল মাদক রোধ করা সম্ভব। কারণ,যদি অন্তর পরিস্কার হয় তবেই কেবল অনৈতিকতা থেকে মুক্ত পাওয়া যায়। রাসূল সা. তার যুগে যখন মদকে হারাম করলেন। তখন সাথে সাথে তারা তা পরিত্যাগ করলেন। কারণ,তাদের হৃদয় ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তাই মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষেই আমাদের ঐতিহাসিক পথযাত্রা।

দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশের সমস্ত উন্নয়নকে গ্রাস করে নিচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতির ব্যাপকতাকে আমাদের দেশে কেউ অস্বীকার করছে না। এমনকি সমাজের প্রায় সর্বস্তরেই দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে। শুধু যে সরকারী কর্মকর্তারাই দুর্নীতি করছে এমন নয়। বরং সর্বস্তরেই দুর্নীতি ঢুকে গেছে। ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি করছে। যে যেভাবে পারছে দুর্নীতি করছে। এমনকি সেবার জন্য যে সংস্থাগুলো খোলা হয়েছিল,সেখানেও দুর্নীতি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আসলে দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধী। তাই আমাদের আহবান হবে আমরা যে পথযাত্রা করছি, এ পথযাত্রায় প্রায় ১হাজার আলেম আমাদের সঙ্গে থাকবেন ইনশাল্লাহ। প্রথম আমরা শুরু করছি যশোর থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত। পরে কক্সবাজার থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত পথযাত্রা করব। আশাকরি এতে যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজটা উঠবে,তখন মানুষ সচেতন হতে পারে। আজ তো দুঃখের বিষয়,আমাদের থেকে এ আওয়াজটাও চলে গেছে। দুর্নীতি খারাপ এটা সবাই জানে কিন্তু কারো ভেতর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই।কারণ,ঐ যে আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই আমরা এই আওয়াজকে নতুনভাবে তুলে ধরতে চাই। কারণ,এতে কথাবার্তা উঠবে। আওয়াজ উঠবে। তাতে যদি মানুষের সচেতনা আসে। শুভবুদ্ধি হয়। হবে ইনশাআল্লাহ।

দেশ ও সমাজকে দুর্নীতি থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা আমাদের দায়িত্ব পুরো করিনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন,আমি আমার দায়িত্ব পুরা করিনি। আমি সমাজ সচেতনতা সৃষ্টি করিনি। তাই আমাদের দায়িত্ববোধ রয়ে গেছে। সে দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা চাচ্ছি, আলেম-উলামারা যদি অগ্রসর হন তাহলে তাহলে আশাকরি এটার একটা প্রতিকার হবেই ইনশাআল্লাহ। কারণ,আমাদের সমাজে আলেমদের ভিন্ন একটা প্রভাব ও মাত্রা আছে। সেই শ্রদ্ধা ও ভরসার জায়গাটুকু আমাদের কাজে লাগানো উচিৎ।

এর আগে, সমাবেশে উদ্বোধনি বক্তব্য রাখেন, ঢাকা মহানগর বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার সভাপতি মাওলানা দেলোয়ার হুসাইন সাইফি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন,আজ সাধারণ জনগণ আলেম সমাজের দিকে তাকিয়ে। তারা সমাজে এক আলাদা সম্মানে আসীন। কিন্তু উলামায়ে কেরামের এ নিশ্চুপ বসে থাকা সুখকর নয়। তারা জানে, তাই সন্ত্রাস,মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের সবসময় সোচ্চার থাকা উচিৎ এবং জনগণকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয় বোঝানো উচিৎ। তাই সাধারণ জনগণ ও আলেমদের মাঝে ঐক্য করে এসবের বিরুদ্ধেই আমাদের ঐতিহাসিক এ পথযাত্রা।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, মাওলানা হোসাইন আহমদ, মাওলানা আব্দুর রহীম কাসিমী, মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাইফী, মাওলানা আবু সুফিয়ান যাকী, মুফতি তাজুল ইসলাম কাসেমী, মাওলানা সদরুদ্দিন মাকনুন, মাওলানা আইয়ুব আনসারী, মাওলানা আব্দুল আলীম ফরীদী, মাওলানা সাঈদ নিজামী, মাওলানা শুয়াইব আহমদ, মাওলানা মাসঊদুল কাদির, মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ মাসঊদ, মাওলানা জিয়া বিন কাসেম, মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ, মাওলানা রুহুল আমীন, মাওলানা কুতুব উদ্দীন, জামিয়তুল ইসলাহ কিশোরগঞ্জের শায়খুল হাদীস মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন, পঞ্চগড় জমিয়তের আহবায়ক মাওলানা ওয়াহীদুজ্জামান, গাজীপুর জমিয়তের আহবায়ক মাওলানা আব্দুর রহীম তালুকদার। কুমিল্লা জমিয়তুল উলামার আহবায়ক মাওলানা সারওয়ার আলম ভূইয়া। প্রমুখ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *