শম্পা প্রদীপ্তি : সৃষ্টির শুরু থেকেই নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে সমাজ-সংসার, অন্দরে ও বাহিরে। পুরুষের চলার পথে সহযাত্রী হয়েছে। প্রাচীন সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। গৃহকর্মের পাশাপাশি সংসার নির্বাহের জন্য বাইরে গিয়ে কায়িকশ্রমও করতে হয়েছে নারীকে। এরপরও নারী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে নানা শাখায়। আজকের নারীসমাজও প্রভূত অগ্রগতি এবং উৎকর্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে যদিও এ পথ পরিক্রমায় তাকে অতিক্রম করতে হয় এবং হয়েছে বহু বাধা।
সেই কবেকার এক লীলাবতী খনা-ত্রিকালদর্শী মহাজ্ঞানী সেই নারী শুধু তার জ্ঞানটুকু প্রকাশের অপরাধে ঈর্শাকাতর শ্বশুরের হিং¯্রতার শিকার হন। তার জিহ্বা কেটে নেয়া হয়, যাতে সে আর কখনোই সত্য-ভবিষ্যবার্তা প্রকাশের ক্ষমতা না রাখেন। খনার জীবনে ঘটে যাওয়া ক্ষতটি আধুনিক নারীসমাজ এখনও যে বহন করে চলেছে তার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই।
আজ থেকে ১৬১ বছর আগে নিউইয়র্কেও একটি সূঁচ কারখানার নারীশ্রমিকরা মালিকপক্ষের অনিয়ম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। পুলিশি নিপীড়নের পরও তারা সংগ্রামে অবিচল ছিলেন। দিনটি ছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ, যা আজ নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে নারী আজ সংগঠিত। নারী এগিয়ে চলেছে আলোর দিকে আর নারীর এই আলোকিত এগিয়ে যাওয়ার সহযাত্রী হয়েছেন আলোকিত পুরুষেরা, যা নারীকে নতুন শক্তিতে বিকশিত হতে শক্তি জুগিয়েছে।
বিশ্বরাজনীতিতেও নারীর উত্থান লক্ষ্যণীয়। দেশে দেশে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষপদে নারী। প্রশাসন, আইন ও বিচার, শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, তথ্য, শিল্প-ব্যবসাবাণিজ্য-সব সেক্টরেই আজ নারীর ক্ষমতায়নের দিব্য-দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। শিল্প-সাহিত্য তথা সৃজনশীল কর্মযজ্ঞেও নারীর অবস্থান গর্ব করার মতো। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের দিকে তাকালেও নারীর সেই বৈশ্বিক বিভাময় অগ্রযাত্রাটি দেখতে পাই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক তথ্যে দেখা যায়, দেশের ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে কর্মরত আছেন। জিডিপিতে নারীর অবস্থান ২০ শতাংশ। দেশের উৎপাদনখাতে মোট ৫০ লাখ ১৫ হাজার কর্মী কর্মরত। এর মধ্যে ২২ লাখ ১৭ হাজারই নারী। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকই নারী। ২০১০-এ কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬২ লাখ। ২০১৩-তে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখে। অন্যান্য খাতওয়ারি হিসেবে নারীর সংখ্যা- কৃষিতে ৯০ লাখ ১১ হাজার, শিল্পতে ৪০ লাখ ৯০ হাজার, সেবাতে ৩৭ লাখ। এদিকে দেশের রপ্তানি সেক্টরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখ কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী।
পরিবারের পেছনেও নারীর রোজগারের ব্যায়ের হিসাবটাও পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় সেটা ¯পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের গবেষণা অনুযায়ী পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় নারীর আয়ের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই ব্যয় হয়। এক্ষেত্রে পুরুষের আয় থেকে ব্যয় হয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এসব বিবেচনায় পরিবার ও সমাজ-রাষ্ট্রে নারীর উপযোগিতা যেমন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তেমনি নারীর কর্মসংস্থানের বিস্তৃতিও সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতির চাকা সচল করে তোলার পেছনে নারীর ভূমিকা অতুলনীয়। আর এসবই হয়েছে সরকারের ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা এবং কর্মযজ্ঞের ফলে।
দেশের এই স্বর্ণোজ্জল অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশকে অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ বিশ্বে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য-সর্বত্রই সংসদে-সিনেটে এবং বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় বাংলাদেশের এমন স্বপ্নজয়ী অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা অব্যহত রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ এখন নারী উন্নয়নে বিশ্বে রোল-মডেল। সেই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন এমডিজি পুরস্কার-২০১০, জাতিসংঘের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড-২০১১, ইউনেস্কো পিস ট্রি পুরস্কার- ২০১৪, উইমেন ইন-পার্লামেন্ট গ্লোবাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড-২০১৫, জাতিসংঘের প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন ২০১৬, এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়র্ড-২০১৬, মাদার অফ হিউম্যানিটিসহ আরো অসংখ্যা স্বীকৃতি। নিঃসন্দেহে এসব প্রাপ্তি এদেশের নারীদের ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এরপরও প্রশ্ন ওঠে, নারীর এত উত্থানের পরও কি নারীরা নিরপাদ? নারী হয়ে জন্ম নিয়ে সে কী স্বজন-পরিবার, সমাজ, ঘরে-বাইরে সর্বত্র অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার নয়? শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত এবং নিরক্ষর-সর্বশ্রেণির নারীর জন্যই বর্তমানে বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র রয়েছে- একথা সত্য, তারপরও নারীর জন্য নিরাপত্তা এবং সম্মান নিশ্চিত করার পথ এখনো অনেকটাই বাকি। যে যার যার অবস্থান থেকেই সকল নারী যেন জীবন নির্বাহে সঠিক পথটি খুঁজে নিতে পারে, সমাজে তারা যেনো ভালো অবদান রাখতে পারে-এমন প্রত্যাশা, এমন স্বপ্ন দেখতে চাই। অন্ধকার থেকে নারী যেন আলোর দিকে এগিয়ে যায়, আলোকিত স্বপ্নযাত্রায় নারী যেন জয়ী হয়, এমন স্বপ্ন দেখুক সবাই আর নারীর সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসুক সকলে তাদের নিজ নিজ শক্তি আর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায়।


