আল্লামা শিবলী নুমানী রহ.

আল্লামা শিবলী নুমানী রহ.

আল্লামা শিবলী নুমানী রহ.

ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী : উর্দু সাহিত্য সমালোচক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক, সংস্কারক, কবি আল্লামা শিবলী নু‘মানী। তিনি সিপাহী বিপ্লবের বছর ১৮৫৭ সালের মে মাসে (মতান্তরে ৩ জুন) ভারতের উত্তর প্রদেশের আযমগড় জেলার বান্দুলে এক সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা-শায়খ হাবীবুল্লাহ একজন উকিল ছিলেন। তার পূর্বপুরুষেরা কিছু চারশ বছর পূর্বে রাজপূতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার নিজস্ব গ্রামেই। শুকরুল্লাহ্নামক জনৈক ব্যক্তির কাছে পড়েন প্রাথমিক পর্যায়ে। তারপর তিনি মাদরাসায়ে ইসলামিয়া আযমগড়ে ভর্তি হন। সেখানে প্রসিদ্ধ আলিম দার্শনিক মাওলানা মুহাম্মদ ফারুক চিড়িয়াকুটির কাছে বিশেষভাবে লেখাপড়া করেন। তার কাছে দর্শন, জ্যোতিবিদ্যা, সাহিত্য পড়েন। আযমগড় থেকে তিনি রামপুরে চলে যান। সেখানে মৌলবী আব্দুল হক খায়রাবাদীর কাছে যুক্তিবিদ্যা পড়েন। সেখানেই মৌলবী আরশাদ হুসাইনের কাছে হাদীস ও ফিক্্হ্ শিক্ষা লাভ করেন। সেখান থেকে তিনি লাহোরে চলে যান। সেখানে সাহিত্যিক মাওলানা ফয়যুল হাসানের কাছে হামাসা পড়েন। সেখান থেকে সাহারানপুর পৌঁছে মাওলানা আহমদ আলীর কাছে তাকমীলে হাদীস করেন। প্রাতিষ্ঠানিক লেখা পড়া মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ১৮৭৬ সালে সমাপ্ত হয়।

এ বছরই হজ্জের নিয়ত করে বের হয়ে পড়েন। পথিমধ্যে আবেগপূর্ণ ভাষায় ফার্সী কাসীদা লেখেন। ১৯ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করলেও বইপত্র অধ্যয়নে তিনি সর্বদা ডুবে থাকতেন। পড়ায় মনোযোগী ছিলেন অত্যন্ত বেশী। কোন বই পেলে শেষ না করে তিনি উঠতে পারতেন না।

রামবাবু সাকসিনা লেখেছেন, তিনি ওকালতি পরীক্ষা পাস করেছিলেন। কিছু দিন আযমগড়ে ওকালতি করেন। এ পেশায় অনীহা আসায় তিনি তা ছেড়ে দেন।

উকালতি ছেড়ে তিনি আমীন দেওয়ানী’র চাকরি নেন। এ চাকরিতে অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হত। এমনকি রোযা রেখে গ্রীষ্মের প্রখর রোদেও ঘোড়ায় চড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হত। এ কাজ তার কাছে ভাল না লাগায় তিনি তা ছেড়ে দেন। আবার সর্বাতœক লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়ে উঠেন।

১৮৮২ সালে তার ছোট ভাইকে আলীগড়ে ভর্তি করতে নিয়ে যান তখন স্যার সায়্যিদ এর সাথে সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠতা হয়। তিনি স্যার সায়্যিদকে লক্ষ্য করে একটি আরবী কাসীদা রচনা করেন। ১৮৮৩ সালে আলীগড় কলেজে আরবী বিভাগের শিক্ষক পদ শূন্য হলে তাতে শিবলী নু‘মানীকে শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হয়। তখন তিনি আরবী ও ফার্সী বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে আলীগড়ে যোগদান করেন।

আলীগড়ে যোগদানের পর স্যার সায়্যিদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়। তার যোগ্যতা দেখে স্যার সায়্যিদ তাকে স্যার সায়্যিদের বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করেন। এ সময়ে প্রফেসর আরনল্ড এর সাথে শিবলী নু‘মানীর পরিচয় হয়। পরস্পরে শিক্ষা দান ও শিক্ষা গ্রহণের কাজ করেন। শিবলী থেকে আরনল্ড শিখেন আরবী আর আরনল্ড থেকে শিবলী শিখেন ফ্রান্স ভাষা।

শিবলী নু‘মানী স্যার সায়্যিদের সাথে আলীগড় আন্দোলনে শরীক হন। তা শিক্ষা ও মুসলিম জাগরণে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। স্যার সায়্যিদ রাজনৈতিকভাবে নতজানু নীতি অবলম্বন করায় শিবলী নু‘মানী তা গ্রহণ করতে রাজী ছিলেন না। যদিও উভয়ই পারস্পরিক সহযোগী ছিলেন তবু তাদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য ছিল। মুসলিম মনীষা গ্রন্থেআব্দুল মওদুদ বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন।

তিনি স্যার সৈয়দ আহমদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন। একদিকে তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্ব,অসামান্য সাংগঠনিক শক্তি ও আশ্চর্য সৃজনী-প্রতিভা যেমন শিবলীর উপর প্রভাব বিস্তার করে, সেরূপ শিবলীর প্রগাঢ় পান্ডিত্য ও সৈয়দ আহমদকে বহুলাংশে উপকৃত ও সংযত করে। শেষের দিকে অবশ্য দুজনেরই চিন্তাধারা ও কর্মসূচীতে প্রবল প্রতিকূলতা দেখা দেয়। সেজন্য অনেকে শিবলীকে সৈয়দ আহমদের প্রতিপক্ষ হিসাবে বিবেচনা করেন। স্যার সৈয়দ আহমদ আধুনিক পাশ্চাত্যের ছাঁচে ইসলামকে ঢালাই করতে চান,কিন্তু শিবলী ইসলামের পটভূমিতে আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানকে গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন। শিবলী আধুনিকতার যজ্ঞশালায় ইসলামকে শোধন ও পরিবর্তন করতে চাননি- তিনি ইসলামী তাহযীব ও তমদ্দুনের বিজ্ঞানসম্মত ও উৎকৃষ্ট মূল্যবোধের উপরেই তার উন্নয়ন ও পূনর্বাসন করবার পক্ষপাতী ছিলেন। সোজা কথায় শিবলী ইসলামী ঐতিহ্যের সংগে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের কল্যাণপদ সম্পদ মিলিয়ে নব নব সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্যার সৈয়দ আহমদের স্বপ্নও ছিলো তাই এবং এই দুজন মনীষী এ ক্ষেত্রে হাত মিলিয়েছিলেন। কিন্তু সৈয়দ আহমদের উৎকট ইংরেজ-প্রীতি ও বৃটিশ শাসনের নির্বিরোধ বশ্যতা স্বীকার শিবলী আদৌ পছন্দ করতেন না।

মাওলানা শিবলী নু‘মানী মে ১৮৯৮ পর্যন্ত আলীগড় কলেজে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

এ সময়ে আরনল্ডের সাথে ১৮৯২ সালে সিরিয়া, মিশর, তুরস্ক, ইস্তাম্বুল, রোম সফর করেন। এ সময়ে তিনি মুসলিম দেশসমূহের রাষ্ট্র্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা অবহিত হন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার এ সফরের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি লেখেন সফরনামায়ে রূ“ম মিসর শাম (سفر نامہ روم و مصرشام ইতালী, সিরিয়া ও মিশর সফর)। এ সফরে তিনি ‘উমার (রা.) এর জীবনী ‘আলফারূ“ক’ লেখার তত্ত্ব উপাত্ত সংগ্রহে মনোযোগী ছিলেন। শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুহূ-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন তিনি।৮ এ সফরে তিনি তুর্র্কী বাদশাহ সুলতান আব্দুল হামীদ খান থেকে সন্মানসূচক পদক (تمغہ مجیدی) লাভ করেন। সফর থেকে ফিরে আসার পর ইংরেজ সরকার তাকে ‘শামসুল উলামা’ খেতাবে ভূষিত করে।

১৮৯৯ সালে তিনি কাশ্মীর সফর করেন। সেখানে অসুস্থহয়ে পড়ায় বেশী সময় থাকতে হয়। তখনই তিনি ‘আলফারূক’ গ্রন্থলেখা শেষ করেন।

মৌলবী সায়্যিদ আলী বলগিরামীর মধ্যস্থতায় তিনি হায়দারাবাদের নিযামে জ্ঞান ও শিল্পকলা বিভাগে ব্যবস্থাপক হিসাবে দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯০১ থেকে -১৯০৫ পর্যন্ত চার বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। পরিস্থিতির প্রতিকুলতার জন্য ১৯০৫ সালে এ দায়িত্ব থেকে ইস্তিফা দেন।

হায়দারাবাদে থাকা অবস্থায় তিনি অনেক গ্রন্থরচনা করেন। এ সময়েই তিনি লেখেন- আলগাযালী (الغزالی), সাওয়ানেহে মাওলানা রূম (سوانح مولانا روم) , আলকালাম (الکلام), ইলমুল কালাম (علم الکلام) এবং মুওয়াযানায়ে আনীস ও দবীর(موازنہ انیس و دبیر) ইত্যাদি। এ সময় তিনি হায়দারাবাদে মাশরিকী ইউনিভার্সিটি করার প্লান করেছিলেন। তা-ই পরবর্তীতে উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ুদারূল ‘উলূম নাদওয়াতুল উলামা: মাওলানা শিবলী নু‘মানীর অমরর্কীতির একটি হল দারুল ‘উলূম নাদওয়াতুল ‘উলামা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা। নাদওয়াতুল ‘উলামা -এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সমকালীন বিষয়াবলীকে সামনে রেখে একটি উপকারী শিক্ষা সিলেবাস তৈরী করে পাঠ দান করার উদ্দেশ্যে। সেই সাথে আলিমদের সাথে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাও এর উদ্দেশ্য ছিল।

নাদওয়াতুল ‘উলামা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৪ খৃ. মুতাবিক ১৩১১ হিজরী সনে।

নাদওয়াতুল ‘উলামার প্রতিষ্ঠা মৌলবী আব্দুল গফূর, মওলবী সায়িদ মুহাম্মদ আলী মুঙ্গেরীর মাধ্যমে হয়েছিল। মাওলানা শিবলী নু‘মানী ও মৌলবী আব্দুল হক দেহলবী নাদওয়ার গঠনতন্ত্র তৈরী করেন।

১৩১৬ হি. মুতাবিক ১৮৯৮ খ্রি. সালে মাওলানা শিবলী নু‘মানীর প্রস্তাব অনুযায়ী নাদওয়ার তত্ত্বাবধানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা বর্তমানে দারুল ‘উলূম নাদওয়াতুল ‘উলামা লক্ষ্মৌ নামে বিশ্বখ্যাত। নাদওয়া প্রতিষ্ঠা হবার পর এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশ থেকে বইপত্র ও সাহায্য আসতে থাকে। এর ব্যানারে আলিমদের ঐক্য দেখে ইংরেজ সরকার এ প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। আহমদ রেযা খান বেরেলবী প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করতে থাকেন। যখন চারদিক থেকে এ প্রতিষ্ঠান কোনঠাসা হয়ে পড়ে, আর্থিক অবস্থাও নাজুক হয়ে উঠে তখন ১৯০৮ সালে মাওলানা শিবলী নু‘মানী হায়দারাবাদের চাকরি থেকে ইস্তিফা দিয়ে দারুল ‘উলূম নাদওয়াতুল ‘উলামার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সুনিপুণ পরিচালনায় আবার নাদওয়া ভালভাবে চলতে থাকে। তিনি তার জ্ঞান-প্রজ্ঞা, কৌশল দিয়ে নাদওয়াকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯১৩ সালে তার জন্মস্থান আজমগড়ে চলে আসেন। সেখানে তিনি তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান দারুল মুসান্নিফীন (دار المصنفین) প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে বহু সংখ্যক লেখক গড়ে উঠে। লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা করা, প্রকাশনা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজে এ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। এ জন্য শিবলী তার বাগানবাড়ী, কুতুবখানা সবকিছু উৎসর্গ করেন। তা গড়তে তিনি মাত্র এক বছর সময় পেয়েছিলেন। দারুল মুসান্নিফীন গড়ার এক বছর পর মাওলানা শিবলী নু‘মানী ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য ছাত্র সায়্যিদ সুলায়মান নদবী এবং তার অন্যান্য সাথীরা এ প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়ে যান। এ প্রতিষ্ঠান ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে এত বেশী গ্রন্থউপহার দিয়েছে যা তৎকালীন সময়ে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান উপহার দিতে পারেনি।

মৃত্যু: মাওলানা শিবলী নু‘মানী ১৯১৪ সালের ১৮ নভেম্বর ভারতের আযমগড়ে ইন্তিকাল করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

গ্রন্থাবলী : মাওলানা শিবলী নু‘মানী লেখালেখিতে বেশী আগ্রহী ছিলেন। তিনি ইতিহাস রচনায় কাজ করেছেন। তার চেয়ে বেশী লেখেছেন জীবনী সাহিত্য। তিনি কবিতা লেখেছেন। তিনি কাব্য সমালোচক ছিলেন। কবিতা ও কবিতার সমালোচনায় তার অন্যতম গ্রন্থহলো শি‘রুল ‘আজম (شعر العظم) । এটি ফার্সী কবিতা নিয়ে ৫ খন্ডে লেখা হয়েছে। জীবনী সাহিত্যে তার সবচেয়ে বড় অবদান সীরাতুন্নবী (স.) । তিনি দর্শন বিষয়ও লেখেছেন। রাজনৈতিক বিষয়েও লেখেছেন তিনি। তার গ্রন্থাবলী সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

১. আলমামূন (المامون) : মাওলানা শিবলী নু‘মানী র. এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থএটি। তিনি মুসলিম ব্যক্তিত্বদের জীবনী লেখার অভিপ্রায়ে গ্রন্থলেখা শুরু করেন। আলমামূন তার প্রথম প্রকাশনা। আলীগড় কলেজে থাকা অবস্থায় এটি ১৮৮৯ সালে ছাপা হয়। এ গ্রন্থদু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে আব্বাসী খিলাফতের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রয়েছে। মামূনুর রশীদ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের বর্ণনাও এতে রয়েছে। দ্বিতীয় অংশে মামূনের জীবনী ব্য্রক্তিজীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা, ভ্রমণ, কর্মতৎপরতা ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে।

২. সীরাতে আননু‘মান(سیرت النعمان): আবূ হানীফা নু‘মান ইবন সাবিতের জীবনী নিয়ে লেখা শিবলীর দ্বিতীয় গ্রন্থহল সীরাতে আননু‘মান। ১৫ ডিসেম্বর ১৮৯৩ সালে এটি লেখা শেষ হয়। এতে দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগে আবূ হানীফার ব্যক্তি জীবন, শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা এবং দ্বিতীয় অংশে আবূ হানীফার উসূলে ফিকহ ও ইলমে কালাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

৩. আলফারুক (الفاروق): উমার (রা.) এর জীবন নিয়ে প্রামান্য গ্রন্থহলো আলফারুক। এ গ্রন্থ১৮ আগষ্ট ১৮৯৩ সালে লেখা শুরু করেন। চার বছর শ্রম দিয়ে ১৫ জুলাই ১৮৯৮ সালে কাশ্মীর সফরে তা সমাপ্ত হয়।
আল্লামা শিবলী নু‘মানীর প্রসিদ্ধির পেছনে ‘আলফারুক’ গ্রন্থের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। এ গ্রন্থের প্রথম অংশে ‘উমার রা. এর ব্যক্তি জীবন, বিজয়সমুহ ইত্যাদি এবং দ্বিতীয় অংশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত সাফল্য ইত্যাদি তুলে ধরেন।
৪. সফরনামায়ে রূম ও মিসর শাম(سفرنامہ روم و مصر شام) : মাওলানা শিবলী নু‘মানী মুসলিম দেশসমূহের শিক্ষা ও সংস্কৃতি দেখার উদ্দেশ্যে ১৮৯২ সালের ২৬ এপ্রিল এক সফরে বের হন। সফরের শুরুতে আরনল্ড ছিলেন। তিনি বৃটেনে ফিরছিলেন। মাওলানা শিবলী নু‘মানী ছয় মাস ব্যাপী সফর করেন। এ সফরে ইতালীর রূম, ইস্তাম্বুল, মিসরের কায়রো, সিরিয়া, লেবাননের বৈরূত, ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস ইত্যাদি স্থানে ভ্রমণ করেন। তিনি অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে এসব শহরের শিক্ষা ও সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং রাজনৈতিক অবস্থাও অবহিত হন। তিনি স্থাপত্য, প্রাচীন কীর্তি, শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষা ব্যবস্থা, লেখালেখি, প্রকাশনা, পত্রিকা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা নেন। তার এ সফরের বর্ণনাই হলো সফরনামায়ে রূম ও মিশর শাম।

সাদাসিধে ভাষায় লেখা এ গ্রন্থটি তার সফর বিষয়ক একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ।

৫. আলগাযালী (الغزالی): ইসলামের বিখ্যাত লেখক ও দার্শনিকের একজন হলেন ইমাম আবূ হামিদ মুহাম্মদ আলগাযালী। শিবলী তার ইসলামের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বদের জীবনী লেখার ধারাবাহিকতায় ইমাম গাযালীর জীবনী তুলে ধরেন আলগাযালী গ্রন্থে। এ গ্রন্থহায়দারাবাদ অবস্থানের সময় ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ করেন।

৬. ইলমুল কালাম (علم الکلام): কালাম শাস্ত্র সম্পর্কে তখন খুব আলোচনা হতো। কালাম শাস্ত্র জানা থাকবে না আর বিজ্ঞ জ্ঞানী হিসাবে আখ্যায়িত হবে তা ভাবা যেত না। তাই তখন শিবলী নু‘মানী লেখেন ইলমূল কালাম। এতে তিনি কালাম শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, কালাম শাস্ত্রের জন্ম ও উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ইত্যাদি তুলে ধরেন।

৭.আলকালাম(الکلام): আলকালাম গ্রন্থটিকি ইলমুল কালামের দ্বিতীয় খন্ড বলা যায় । অবশ্য এটিও আলাদা গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিতে তিনি কালাম শাস্ত্রের আধুনিক রুপ দর্শন সম্পর্কে তুলে ধরেন। তৎকালে দর্শন শিক্ষার নামে নতুন প্রজন্ম নাস্তিকতার জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল তাই তিনি আধুনিক শিক্ষা ও দর্শন বিষয়ে লেখেন। তিনি ইসলামের আহকামকেও দর্শনের আয়নায় সুচিন্তিত ও যথার্থ প্রমাণ করেন ।

৮. সাওয়ানেহে মাওলানা রূম (سوانح مولانا روم) : মাওলানা জালালূদ্দিন রূমীর জীবন ও দর্শন নিয়ে লেখা শিবলীর সিরিজ গ্রন্থের একটি হলো সাওয়ানেহে মাওলানা রূম। রূমীর মাসনবী থেকে সবাই তাসাউউফ খুঁজে বের করেন। শিবলী তা থেকে দর্শন খুঁজে বের করেছেন। তিনি দর্শনগুলোই পেশ করেছেন তার গ্রন্থে।

৯. মুওয়াযানায়ে আনীস ও দবীর(موازنہ انیس ودبیر): উর্দু সাহিত্যের দুজন মারসিয়া কবি, ভারতের গৌরব মীর আনীস ও মির্যা দবীর-এর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে শিবলী নু‘মানী লেখেন ‘মুওয়াযানায়ে আনীস ও দবীর’। এ গ্রন্থের মাধ্যমে উর্দূ মারসিয়ার জন্মদাতা মীর আনীস এবং মারসিয়ার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী মীর্যা দবীর-এর মাঝে তুলনা করার সুযোগ হয়েছে। যদিও শিবলী নু‘মানীর ব্যাপারে অভিযোগ আছে -“ শিবলী পক্ষপাতিত্ব করে মীর আনীসের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন। এটা বাস্তব কেউ না কেউ এগিয়ে যাবেই। তাই আনীস এগিয়ে গেছেন মারসিয়া রচনায়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাল দিক হলো শিবলী নু‘মানী উভয়ের সাহিত্য প্রতিভা তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থে। এ গ্রন্থটি সমালোচনা সাহিত্যের একটি গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে। এর মাধ্যমে শিবলী সমালোচনা সাহিত্যিক হিসাবেও তার স্থান দখল করে নিতে পেরেছেন।

১০. শি‘রুল ‘আজম(شعر العجم) : শিবলী নু‘মানীর অমর কীর্তি হলো শি‘রুল ‘আজম। ১১০০ পৃষ্ঠার ৫ খন্ডের এ গ্রন্থের মাধ্যমে উপমহাদেশের ফার্সী কবিদের জীবনী ও তাদের সাহিত্য কর্ম তুলে ধরেছেন বিশ্ব দরবারে। প্রথম খন্ডের কাজ শুরু করেন ১৯০৬ সালের ৬ মার্চ। দেড় বছর পর ৬ সেপ্টেম্বর ১৯০৭ সালে তা শেষ করেন। আর এটি প্রকাশ পায় ১৯০৮ সালে। দ্বিতীয় খন্ডের কাজ শুরু করেন ১৯০৮ সালেই। ১৯০৯ সালে দ্বিতীয় খন্ড ছাপা হয়।

১৯১০ সালে তৃতীয় খন্ড ছাপা হয়। ১৯১২ সালে চতুর্থ খন্ড প্রকাশিত হয়। ৫ম খন্ড লিখে যান তার জীবদ্দশায় কিন্তু প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর ১৯১৮ সালে মাওলানা সুলায়মান নদবীর তত্ত্বাবধানে।

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ডে ফার্সী কবিতার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ দেখানো হয়েছে। কবিদের মধ্য থেকে মাত্র চব্বিশ জন কবি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের জীবনী লিখে তাদের কবিতা উল্লেখ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ খন্ডে কাব্যের রূপ ও ফার্সী কাব্যের সৌন্দর্য ও ত্র“টি আলোচনা করা হয়েছে। ৫ম খন্ডে কাব্যের বিভিন্ন শাখা, ইশক, চরিত্র, দর্শন, তাসাউউফ ইত্যাদি আলোকপাত করা হয়েছে।

১১. সীরাতুন্নবী (سیرت النبی): শিবলী নু‘মানীর শেষ জীবনের লেখা রাসূলুূল্লাহ (সা.) এর জীবন ভিত্তিক গ্রন্থ সীরাতুন্নবী (সা.)। এ গ্রন্থটির লেখা সম্ভবত তিনি ১৯০৬ সালেই শুরু করেছিলেন। অহুদ পর্যন্ত লেখার কাজ শেষ করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য ব্যস্ততায় এ লেখা থেমে যায়। আবার ১৯১২ সালে লেখা শুরু করেন। ৫ খন্ড তিনি সাজিয়েছিলেন। এভাবে-

১ম খন্ড- আরবের ইতিহাস, রাসূল্লাহর জীবনী, যুদ্ধসমূহ, চরিত্র ও স্ত্রী-সন্তান।
২য় খন্ড- নুবুওয়াতের লক্ষ্য, দায়িত্ব ও আহকাম
৩য় খন্ড-কুরআনের ইতিহাস, নিগূঢ়তত্ত্ব
৪র্থ খন্ড- মু‘জিযার স্বরূপ ও বিচার-বিশ্লেষণ
৫ম খন্ড- ইউরোপিয়ানদের লেখায় রাসূলের সীরাত ও এ বিষয়ে তাদের অভিযোগের জবাব।
যদিও ৫ খন্ডের টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি, প্রথম খন্ড শেষ হতেই তার জীবনও শেষ হয়ে যায়। তার লেখা সীরাতুন্নবী দুই ভলিয়মে ১৯১৮ সালে প্রকাশ হয়। বাকী ৪ খন্ডও তার ছাত্র মাওলানা সুলাইমান নদবী লেখেন তারই স্টাইলে ও তারই বাতলে দেয়া ছকে।
১২. মাকালাতে শিবলী (مقالات شبلی): শিবলী নু‘মানীর বিভিন্ন প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দারুল মুসান্নিফীন সংস্থা তার শতাধিক প্রবন্ধ ৮ খন্ডে প্রকাশ করেছে। খন্ডগুলো হলো-
১ম খন্ড- ধর্মীয় প্রবন্ধ
২য়খন্ড- সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ
৩য় খন্ড- শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ
৪র্থ খন্ড – সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ
৫ম খন্ড- জীবনী সাহিত্য প্রবন্ধ
৬ষ্ঠ খন্ড-ঐতিহাসিক প্রবন্ধ
৭ম খন্ড-দার্শনিক প্রবন্ধ
৮ম খন্ড-জাতীয় বিষয়ক প্রবন্ধ

এসব প্রবন্ধের মাধ্যমে তার সৃজনীশক্তি ও গবেষণা পরিমাপ করা যায়। তিনি যুক্তি দিয়ে তার প্রস্তাব প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন।
১৩. মাকাতীবে শিবলী(مکاتیب شبلی) : শিবলী নু‘মানীর চিঠিগুলোর সংকলন হলো মাকাতীবে শিবলী। ২ খন্ডে প্রথম প্রকাশ করেছে দারুল মুসান্নিফীন। ১ম খন্ডে সাধারণ চিঠি যা তিনি বিভিন্ন জনের কাছে লিখেছেন। ২য় খন্ডে তার ছাত্রদের কাছে লেখা চিঠিগুলি সংকলিত হয়েছে।

১৪. খুতূতে শিবলী (خطوط شبلی): আতিয়া বেগম ফয়জী ও যুহরা বেগমসহ বিভিন্ন জনের কাছে লেখা চিঠির সংকলন মৌলবী মুহাম্মদ আমীন যুবায়রী মারওয়ারদী ১৯৬২ সালে প্রকাশ করে এর নামকরণ করেন খুতূতে শিবলী নামে। এসব চিঠিতে নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, পর্দা, চাকরি ও নারী স্বাধীনতার প্রসঙ্গ বেশী স্থান পেয়েছে।

মাওলানা শিবলী নু‘মানী প্রথমসারীর জীবনীকার ছিলেন। তার অধিকাংশ লেখা এ বিষয়েই। এছাড়াও তিনি দার্শনিক, ঐতিহাসিক, বক্তা, সাহিত্য সমালোচক, প্রাবন্ধিক হিসাবে তার স্থান দখল রেখেছেন।

শিবলী নু‘মানীর ভাষা মনোমুগ্ধকর। তিনি একজন আলিম, তা মাথায় রেখেই তিনি লিখতেন। পাঠকের মাঝে তিনি তার লেখা, যুক্তি প্রমাণ দিয়ে সহজে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি তার রচনায় অনেক আরবী শব্দ ব্যবহার করার কারণে বাহ্য দৃষ্টিতে সমস্যা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু তার প্রকৃত পাঠকরা ভাষা ও রচনা শৈলীকে সানন্দে গ্রহণ করে শিবলীকেই সাধুবাদ জানান। শিবলী উর্দু সাহিত্যের সেরা পাঁচের একজন। তার লেখায় তিনি বেঁেচ থাকবেন চিরকাল।

ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানীর গ্রন্থ থেকে নেয়া

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *