ইলমে নববীর ঘ্রাণ পেয়েছি যে বাবার বদৌলতে
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : বাবার কথা মনে পড়ে প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ। কোন নির্দিষ্ট দিন, কোন সময়ে নয়। আমার বাবা এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যাকে ভোলা যাবে না কোনদিন। আমার আমি যে খুঁজে পেয়েছি, সেটাতো সে বাবারই অবদান। আর কিছু নয়, এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পেরেছি, তারই কোরবানীর বদৌলতে। আমার বাবা কোন মন্ত্রী- মিনিষ্টার ছিলেন না। কোন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। বা তিনি কোন সমাজের প্রতাপশালী ব্যক্তিও ছিলেন না।
বিত্ত-বৈভবেও আমার বাবা বড় ছিলেন না। কোন বড় মালদার, টাকার কুমির ও তিনি ছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক। একজন পরহেজগার ঈমানদার মানুষ। একজন সৎ ও নির্ভিক ব্যক্তিত্ব।
কিন্তু গ্রামের এই সৎ নিরীহ মানুষটি, এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ছিলেন, তাঁর সিদ্ধান্তই সঠিক। তিনি এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন, যে পথে সমাজপতিদের কেউ চলেনি। আবার বাবা এমন কাজ করে গেছেন,যে কাজটি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা করতে পারেনি।
সেই আশির দশকে এদেশের মানুষের মাঝে এক নিরব দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছিল। সে সময়ে কৃষিতে আমাদের দেশ এত এগিয়ে যায়নি। তৎকালীন সময়ে জমিতে ভাল ফসল হতো না। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজের উপর নিজেদের জীবিকার ব্যবস্থা ছিল। আমাদেরও পুরো পরিবারটা ছিল কৃষি নির্ভর। জমির ফসল যে বৎসর ভাল হত, সে বৎসর তো ভালই চলত। কিন্তু কোন কারণ বশতঃ জমির ফসল ঠিকমত না হলে, সে বছর তো অনেক টানাটানির মধ্যেই সংসার চলেছে।
আমিতো অনেক ছোট, সবে মাত্র প্রাইমারী থেকে হাইস্কুলে। মানে ছোট থেকে কৈশোরে। বাবার তো পরিবার নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। অনেক হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম। তারপরেও পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন না। ভাই -বোন সকলের চাহিদা মেটাতে পারেন না।
আমার সহপাঠি বন্ধু -বান্ধব অনেকে লেখা পড়া ছেড়ে তারা তাদের বাবার কাজের সহযোগিতায় নেমে গেল। আবার অনেক বন্ধু হাইস্কুল জীবনে লেখা পড়া চালিয়ে যেতে লাগল।
বাবার অনেক গুণগ্রাহী বন্ধু মহলের ধারণা ছিল, আমি যদি লেখাপড়া করি, এস এস সি পাশ করলেই চাকরী মিলে যাবে। কোন না কোন প্রতিষ্ঠান বা সরকারি কোন চাকুরী পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি। তাহলে আমাদের পরিবারের জন্য বড় উপকার হবে। এই ঘঁষা মাজার সংসারে কোন কষ্ট থাকবে না। বিশেষ করে আমার বাবার বড় উপকার হবে। তার খাঁটুনিটা কমে যাবে।
আমার বাবা ছিলেন ঈমানের বলে বলীয়ান। তাঁর ঈমানী শক্তি ছিল প্রখর। দ্বীন ইসলামের প্রতি তাঁর তীব্র ভালবাসা ছিল। যার কারণে দুনিয়াবী কোন লোভ, দুনিয়াবী কোন শান্তির আশা করেন নি তিনি। তিনি কামনা করেছেন আখেরাতের শান্তি।
আমি হাইস্কুলে ভর্তি হলাম ঠিকই। কিন্তু আমার বাবা আমাকে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করতে লাগলেন। দ্বীনী জ্ঞান শেখানো এবং দ্বীনি পরিবেশের সাথে আমাকে জোড়াতে লাগলেন।
আমাকে সব সময় বলতেন, তোমাকে আলেম হতে হবে। তাই তিনি বিভিন্ন আলেমদের মাহফিলে আমাকে নিয়ে যেতেন। এবং আলেমদের কাছে আমার জন্য দোয়া চাইতেন।
আবার বাবাকে দেখেছি, তিনি অসম্ভব আলেম ভক্ত একজন লোক ছিলেন। এদেশের খ্যাতনামা আলেমদের ওয়াজ শোনার পাগল ছিলেন। বিশেষ করে ওলামায়ে দেওবন্দ এবং কওমী মাদ্রাসার প্রতি তাঁর প্রবল ভালবাসা ছিল।
বাবার মুখেই প্রথম শুনেছি, হাফেজ্জী হুজুরের গুণগান। বাবাই বলতেন, মুজাহিদে মিল্লাত শামসুদ্দীন কাসেমী ( রহঃ) এর কথা।
আবার বাবা শায়খুল হাদীস আজিজুল হক ( রহ.) এবং চরমোনাই- এর সৈয়দ ফজলুল করিম ( রহ.) ওয়াজের খুব ভক্ত ছিলেন। উনাদের ওয়াজ শোনার জন্য অনেক দূরে চলে যেতেন।
বাবার ইচ্ছানুযায়ী হাইস্কুল জীবনের ইতি টানতে হল। দুনিয়ার অনেক আরাম -আয়েশ, টাকা-পয়সা যেখানে হাতছানি দিচ্ছিল, সে রাস্তা ত্যাগ করে এক মাত্র আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দি হাসিলের জন্য আমাকে মাদ্রাসাতে ভর্তি করা হল।
আমি তো ছোট, তবে ঈমানী পরীক্ষা দিতে হয়েছিল সব বাবার। একটা কৃষক পরিবারের সন্তান লেখা পড়া করা কত যে মেহনত মোজাহাদা করতে হয়, যারা ভুক্ত ভোগী তারাই জানেন।
মফস্বল শহর থেকে ঢাকা শহরের সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ মালিবাগ মাদ্রাসা। এবং বিশ্ব বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ পর্যন্ত আমার লেখা- পড়া, সবই ছিল বাবার অবদান। তাঁর আন্তরিকতা এবং কোরবানীর বদৌলতে আমি নির্বিঘ্নে ইলমে দ্বীন হাসিল করতে পেরেছি।
আমি বহুবার চিন্তা করে দেখেছি, আমার বাবা যদি, আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত না নিতেন এবং তিনি যদি এত কোরবানী না করতেন, হয়ত আমি কালের গর্ভে হারিয়ে যেতাম। এজন্য বলি, সে সময়ে আমার বাবার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
“আমার মধ্যে যা কিছু আছে, তার জন্য আমি বাবার কাছে ঋণী”।
হে আল্লাহ! তুমি আমার বাবাকে ক্ষমা কর। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব কর। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক


