কৈশোরে খাদ্যাভাস
জিনাত আরা আহমেদ : খাবার হল শরীরের প্রাণশক্তির উৎস। একজন মানুষের সুস্থ থাকা এবং কর্মোদ্দীপণাময় ও প্রাণপ্রাচুর্যপূর্ণ জীবনযাপনের মূলশর্তও খাবার। খাদ্যাভাসের উপর মানুষের দেহকাঠামো গড়ে ওঠে। পাঁচ বছরের পর থেকে আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত অনেক ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবশিশু পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত হয়। এই সময়টাকে কৈশোর বলা হয়। কৈশোরের সুস্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে পরবর্তী জীবনে সুস্থ থাকা। এটা হলো বাড়ন্ত বয়স। খেলাধুলা, চঞ্চলতা, পড়াশুনার জন্য এ বয়সে প্রচুর ক্যালরি দরকার হয়। কৈশোরে পরিমিত পুষ্টি ও ক্যালরি চাহিদা পূরণ হলে দীর্ঘদিন সবল থাকা যায় এবং নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। তাই কিশোর- কিশোরীদের সুস্বাস্থ্যের জন্য সঠিক খাদ্যাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে শিশুর মস্তিস্কের প্রায় ৯০ ভাগ তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বাকি অংশ পূরণ হয়। তাছাড়া মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগও ঘটে এ সময়ে। এ কারণে শৈশবে পুষ্টির গুরুত্ব অনেক বেশি। খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা গ্রহণ করেই শৈশবে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি হয়। কিন্তু সঠিক উচ্চতা গড়ে উঠে দশ থেকে বিশ বছরের মধ্যে। এ সময় যেমন শারীরিক নানা পরিবর্তন ঘটে তেমনি মনের মাঝেও চলতে থাকে নির্দিষ্ট বিরতিতে নানা ধরনের ষড়ঋতুর খেলা। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য এসময় কিশোর-কিশোরী উভয়েরই বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। শরীরকে উপযুক্ত করে তুলতে এ বয়সে খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। কিশোর বয়সে সঠিক খাবারের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে পরবর্তী জীবনের সুস্বাস্থ্য আর উপযুক্ত খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ খাবারের উপর নির্ভর করে ভারসাম্যপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য।
কিশোর-কিশোরীদের খাদ্য তালিকা হতে হবে সুষম খাবারে পরিপূর্ণ। শুধু স্বাদের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে পুষ্টি ও খাদ্যগুণ বিবেচনা করে সবরকম খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন খাবারের উপকারিতা ও পুষ্টি সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের ধারণা থাকলে তারা সবরকম খাবার খেতে অভ্যস্ত হয়। যেমন অনেক বাচ্চারাই তিতা খাবার খেতে চায়না। কিন্তু তিতা খাবার আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করে দেয় সহজে।
বাড়ন্ত বয়সে শারীরিক বৃদ্ধির জন্য আমিষের প্রয়োজন। এ সময় আমিষ জাতীয় খাবার বেশি দিতে হবে। যেমন দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার, ডিম, মাখন, পনির, মাছ, মাংস ইত্যাদি। সুষম খাবার হিসেবে চালের সাথে বিভিন্ন রকমের ডাল ও সবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি খুব দরকারী। কারণ চালের সাথে ডাল মিশিয়ে রান্না করলে এতে পাওয়া যায় ২৪ রকমের এামাইনো এসিড, যা শরীরের গঠন ও বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিমের মধ্যে রয়েছে পানি ছাড়া খাদ্যের সবকয়টি উপাদান, তাই ডিম অবশ্যই নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখা দরকার। এগুলো শরীরের ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করে হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে। স্নায়ু জাতীয় খাবারের মধ্যে ঘি, মাখন ও বিভিন্ন ধরনের বাদাম খুব প্রয়োজন। এগুলো শরীরের স্নায়ু টিস্যু তৈরিতে সাহায্য করে এবং শরীরে শক্তি জোগায়।
উঠতি বয়সে কিশোর-কিশোরীদের শরীরের চাহিদা অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মৌসুমী ফল থাকা অত্যন্ত জরুরি। এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণ হয়। বিভিন্ন ধরনের তাজা ফলে আছে ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফাইবার ও কম ক্যালরি যা শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদানগুলো নির্মূলে সাহায্য করে। সেই সাথে চোখ ও ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং হজম শক্তি বাড়ায়। আমাদের দেশি ফলের মধ্যে আমলকি এমনই ফল যা অসংখ্য খাদ্যগুণে ভরপুর। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ আমলকি ত্বক, চুল, চোখ ভাল রাখতে অব্যর্থ। তাছাড়া লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে এবং দাঁত, নখ মজবুত রাখে। এর ভেষজ উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
শরীরে প্রয়োজনীয় আয়রনের জোগান দিতে কচুশাকের জুড়ি নেই। এতে প্রচুর ভিটামিন-এ রয়েছে। কচুশাকের ভিটামিন-এ রাতকানা, ছানিপড়াসহ চোখের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। নিয়মিত লেবু জাতীয় ফল দাঁত ও ত্বক ভাল রাখতে সাহায্য করবে। আবার কিশোরীদের রক্তশূন্যতা দূর করতে তেঁতুল খুব উপকারী। এ বয়সে ছেলেমেয়েরা রসুন, আদা এসব খেতে চায় না। তাই এসবের উপকারিতা বুঝিয়ে বলতে হবে, যাতে উপযুক্ত বয়সে ভেষজ খাবার হিসেবে এগুলো গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হয়। যেমন ছোটবেলা থেকে সকালে পরিমিত মাত্রায় মধু খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সর্দি, কাশি, জ্বর, হাঁপানী, পেটের পীড়া ইত্যাদি নির্মূল করে স্বাস্থ্যকর জীবন উপহার দেয়।
কৈশোরে অনেকেরই বিষন্নতা কিংবা হতাশায় ভোগার লক্ষণ দেখা যায়, এটা মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই আশা, আনন্দপূর্ণ, স্বপ্নময় জীবন গড়ে তুলতে অবশ্যই খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে ‘ফুড ফর হ্যাপিনেস’ অর্থাৎ মন ভাল করা খাবার। শর্করা জাতীয় খাবার সেরাটোনিন হরমোনকে সক্রিয় করে মন ভাল রাখে। এক্ষেত্রে ভূষিসহ আটার রুটি, কলা, নাশপাতি, আপেল এগুলো খুব কার্যকর। প্রতিদিন অন্তত একবার কফি বা চা মস্তিস্ককে প্রাণবন্ত রাখে, তবে বেশি চা-কফি অবশ্যই ক্ষতিকর। ‘কোলাইন’ ভিটামিন-বি কমপ্লেক্সের একটি উপাদান, মনযোগ অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির ওপর এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এর অভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তাই খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে ডিমের কুসুম, কলিজা ইত্যাদি। বিষণ্নতা দূর করতে কমলার রস, পালংশাক ইত্যাদি ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার ছাড়াও দই, মিষ্টি আলু, চকলেট মনকে রাখে সতেজ ও প্রফুল্ল।
বাড়ন্ত বয়সে কিশোর-কিশোরীদের লোভনীয় খাবারের প্রতি একটা সহজাত আকর্ষণ থাকে। কিন্তু উপকারী খাবার বলে যদি নিয়মিত একই খাবার দেয়া হয় তাহলে খাবারে এক ঘেয়েমি চলে আসতে পারে। এক্ষেত্রে খাবারের বৈচিত্র্য থাকা জরুরি। বাড়িতে সুষম খাবারের তালিকা করে এক একদিন এক এক রকম খাবার তৈরি করা যেতে পারে। এভাবে বিভিন্ন উপকারী উপাদানের বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাহার কিশোর-কিশোরীদের ঘরে তৈরি খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরিতে সাহায্য করবে। আর বাইরের খাবার যেমন-ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার ইত্যাদি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ একবার এসবে অভ্যস্ত হলে ঘরের পুষ্টিকর খাবারে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হবে।


