জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপট ও পথচলা
১ম পর্ব
ফয়জুল্লাহ আমান : ভারতবর্ষে হাজার বছর ধরে ইসলামের চর্চা চলেছে। ইসলামী তাহযীব তামাদ্দুন ও জ্ঞান বিজ্ঞানের এক ধারাবাহিকতা রয়েছে এদেশে। সামাজিকভাবে ইসলামের মহত্তম প্রকাশ ছিল এখানে সুদীর্ঘ সময়। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজরা এখানের রাজক্ষমতায় আসার পর সেগুলো কি সব হারিয়ে গেল? তার কোন অস্তিত্ত্বই কি আর অবশিষ্ট নেই? সে সবের কোন নিদর্শন মুসলমানদের কাছে বাকি থাকবে না? নতুন করে উপমহাদেশে মুসলিম সমাজের পথ তৈরী করে নিতে হবে অতীত কোন নিদর্শন ছাড়াই? এ প্রশ্ন যে কোন সমাজতাত্ত্বিকের মনে জাগা খুব স্বাভাবিক।
এ খুব অসম্ভব ব্যাপার যে, একটি জনগোষ্ঠি হাজার বছরের ঊর্ধ্বে কোন এক ভূখণ্ডে বসবাস করবে আর সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টিগতভাবে তাদের কোন উত্তরাধিকার সেখানে অবশিষ্ট থাকবে না। বিশেষত যারা দীর্ঘ সময় সারা বিশে^ প্রভাব বিস্তার করেছে। তাদের বিরাট বিরাট শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে বিশ^জুড়ে। বোখারা, সমরকন্দ, কর্ডোভা, গ্রানাডা, কুফা, বসরা, বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক ও দিল্লির মত ঐতিহ্যমণ্ডিত কেন্দ্র যারা সৃষ্টি করেছে। এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপে যারা সভ্যতার সবক প্রচার করেছে।
কায়সার ও কিসরার মত অতীত উন্নত সভ্যতার সবকিছু ধুলায় মিশে গেছে যেই নবতর সভ্যতার উত্থানে। গাযালি, ইবনে খালদুন, ইবনে সীনা, ফারাবী, আলবিরুনী, ইবনে আরাবি, সহরওয়ার্দি, ইবনে রুশদ, রাজি, কিন্দি প্রমুখের মত বড় বড় দার্শনিক যারা উপহার দিয়েছে। এমন এক জনগোষ্ঠির রাজনৈতিক পতনের সাথে সাথে তার সব স্মৃতি ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া কোনভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।
অষ্টাদশ শতকে ভারতবর্ষে ইংরেজদের উত্থানে মুসলিম সমাজ হুমকির মুখে ছিল সত্য; কিন্তু এসময়েই হাজার বছরের ভারতীয় মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতা সংস্কৃতির উত্তরাধিকারগুলো সংরক্ষিত হয় শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.এর মাধ্যমে। এমন একজন মনীষীর আবির্ভাব প্রকৃতির স্বাভাবিক বিধান হিসেবেই অনিবার্য ছিল। পরাজিত অবস্থার মুকাবিলা কীভাবে করতে হবে তার জন্য প্রয়োজন ছিল তত্ত্ব কথার চেয়ে বেশি কার্যক্ষেত্রের প্রায়োগিকতা। প্রথমে শাহ ওয়ালিউল্লাহ কুরআন সুন্নাহ সীরাত ও ইতিহাস থেকে একটি দর্শন গড়ে তোলেন। শাহ আব্দুল আযীয তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট করেন। তারপর বাস্তবায়ন সূচনা করেন সায়্যিদ আহমাদ শহীদ ও ইসমাইল শহীদ। শাহ ইসহাক ও হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ.এর মাধ্যমে দারুল উলুম দেওবন্দে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করে।
কার্লমাক্স ও ডারউইনের সমসাময়ীক মুসলিম মনীষী ছিলেন কাসিমুল উলুম ওয়াল খাইরাত মাওলানা কাসিম নানুতুবী রহ.। হযরত নানুতুবী দারুল উলুম দেওবন্দে নতুন এই বস্তুবাদী সভ্যতার মুকাবিলার জন্য একটি যুথবদ্ধ সমষ্টি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। মুসলমানদের তখন সব দিক দিয়েই পতনের অবস্থা। তাদের হিম্মত নষ্ট হয়ে গেছে। সামাজিক ও আর্থিকভাবে তারা চরম দৈন্যের শিকার। নানুতুবি রহ. মুসলমানদেরকে বলেন, তোমাদের কাছে আমরা টাকা পয়সা চাই না। তোমাদের কাছে কেবল তোমাদের সন্তানদের চাই। তাদের খাবার দাবার খরচাদি আমরাই ব্যাবস্থা করব। তোমরা শুধু তাদের পড়াশোনা ও জীবনগড়ার জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দাও। এই চিন্তার ওপর অসংখ্য মাদারিস গড়ে ওঠে।
কিন্তু এ কথাও সত্য, শুধু মাদরাসার দ্বারা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অথচ ইসলাম একটি সামগ্রিক ধর্ম। যতদিন মুসলমানরা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল ততদিন যেভাবে জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে এখন পরিবর্তিত সময়ে সেভাবে সমাধান আসবে না। আমাদের মুসলিম দার্শনিকরা এ পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে ভাবেননি তা নয়। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম ছাত্র শাইখুল হিন্দ রহ. বলতেন, নানুতুবী রহ. দেওবন্দ মাদরাসার ব্যাপারে দুআ করেছিলেন, যেন তা পঞ্চাশ বছর টিকে থাকে। সে পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। এর অর্থ এ নয় যে, পঞ্চাশ বছর পর দেওবন্দ মাদরাসা ধ্বংস হয়ে যাক। না তা নয়। বরং একটা বিরাট পরিকল্পনা তাদের চিন্তায় ছিল।
পঞ্চাশ বছরে বিশ্বব্যাপি কাজ করার মত কিছু মানুষ গড়া সম্ভব হবে। নতুন এ সমষ্টি দিয়ে কোন সামাজিক সংগঠনের বুনিয়াদ রাখা যাবে। আমি বলতে চাচ্ছি, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সেই সামাজিক সংগঠন। এর সূচনা অবশ্য করে গিয়েছিলেন হযরত নানুতুবী নিজেই। ১৮৮০ সালে তিনি ইন্তিকাল করেন। সে বছর তাঁরই ইশারায় শাইখুল হিন্দ রহ. দেওবন্দে পড়াশোনা শেষ করা গুটিকয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তোলেন সামারাতুত্তারবিয়া নামের সংগঠন। ভারতবর্ষের সেসময়ে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে মুক্তি লাভ করা। বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে হজরত কাসিম নানুতুবী, রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহি প্রমুখ আকাবির যুদ্ধ করেছেন। আন্দোলন সংগ্রামে অনভ্যস্ত ভারতীয়রা সেই সংগ্রামে সাফল্য না পাওয়ায় নতুন পলিসি গ্রহণ করা হয়। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলে। ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় মুক্তিকামি মানুষের পথযাত্রা।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট, সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ ঢাকা।
২য় পর্ব ২৭ নভেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার প্রকাশিত হবে।


