দারুল উলূম দেওবন্দের এক কাফেলার কথা
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : মাদ্রাসায় পড়া- লেখার শুরু জমানার কথা। আমি তখন যশোর জামেয়া কাসেমিয়াতে। সবে মিজান জামাত। হঠাৎ একদিন দারুল উলূম দেওবন্দের এক কাফেলা আমাদের মাদ্রাসাতে এসে হাজির হল।
৭/৮ জনের এক জামাত। ওরা ঢাকা মালিবাগ / বারিধারার ছাত্র। দেওবন্দের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। রাতে যশোর শহরে আমাদের মাদ্রাসায় অবস্থান নিলো, সকালে বেনাপোল বর্ডার পার হবে।
দারুল উলূম দেওবন্দে যাচ্ছে? এই কথা শুনেই যেন মনটা উথলে উঠল। আগে উস্তাদদের মুখে দেওবন্দের গল্প শুনেছি। এখন দেওবন্দগামী কাফেলা আমাদের সামনেই।
দেওবন্দগামী কাফেলাকে যেন আমরা বরণ করে নিলাম। আমরা ছাত্ররা মিলে তাদেরকে ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখলাম।
কোনদিন দেওবন্দগামী কাফেলা তো দেখিনি। এই প্রথম। এক বাড়তি অনুভুতি সৃষ্টি হল। কৌতূহল জাগল।
সব সময় দেওবন্দের যাত্রীদের পাশে সময় দিতে লাগলাম। আর গল্প শুনতে লাগলাম দেওবন্দের। যদিও তারা এখনো দেওবন্দে যায়নি কিন্তু তারাতো আমাদের থেকে অনেক জানে দেওবন্দ সম্পর্কে। অনেক বড় বড় উস্তাদদের মুখে তারা দেওবন্দের গল্প শুনেছে।
দেওবন্দগামী কাফেলার কাছ থেকে গল্প শুনে দেওবন্দের প্রতি যেন ইশক-মহব্বত আরো বেড়ে গেল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন আজই তাদের সাথে রওয়ানা হয়ে যাই।
মফস্বলের ছাত্ররা সাধারণত অনেকখানি সহজ সরল থাকে। অধিকাংশ ছেলেরা হয় মুখলিস। আর সেই আশির দশকের মানুষ তো এখনকার সময় থেকে অনেক নম্র- ভদ্র ছিল।
আমরা তো ঠিক ওরকমই ছিলাম। দেওবন্দের যাত্রীদের দিকে যেন শুধু তাকিয়ে থেকেছি।আর নিজের মনের মাঝে প্রতিজ্ঞা করছিলাম, দারুল উলূম দেওবন্দে আমার যেতেই হবে একদিন।
ওরা ঢাকা শহরের ছাত্র। তারপর আবার মালিবাগ/বারিধারার ছাত্র। সে সময়ে মালিবাগ বারিধারার সোনালী যুগ চলছিল। আবার যারা দেওবন্দে যাচ্ছে, তারাতো অনেক খানি মেধাবীদের অন্তর্ভুক্ত।
অনেক প্রাঞ্জল ভাষায় দেওবন্দের গল্প তাদের কাছ থেকে শুনেছিলাম। দেওবন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে সে সব বড় ভাইদের আলোচনাগুলো ছিল হৃদয়গ্রাহী। এমনিতে দেওবন্দের প্রতি এক মায়াবী টান। কাফেলার সদস্যদের মুখে দেওবন্দের গল্প শুনে আরো যেন বেকারার হয়ে পড়লাম।
দেওবন্দে পড়ার স্বপ্ন সিঁড়ি সেখান থেকে যেন গাঁথা শুরু হয়ে হয়ে যায়। হাঁটি-হাঁটি, পা-পা করে চলতে থাকি।
যশোর থেকে যখন ঢাকা ভর্তি হলাম, তখন দেওবন্দগামী কাফেলা দেখেছি হরসাল। রমজানের আগে সালানা ইমতেহানের পরে, কখনো মাহে রমজানে ছুটে চলত দেওবন্দী কাফেলা।
আমার স্বপ্নের জাল যেন আরো বড় হতে লাগল। বাড়তে লাগল দেওবন্দের প্রতি প্রেম। যে প্রেম- ভালবাসা আমাকে টেনে নিয়েছিল মাদারে ইলমী দারুল উলুমে।
ঢাকা মালিবাগের উস্তাদদের কাছ থেকে দেওবন্দের গল্প শুনেছি সবচেয়ে বেশী। বিশেষ করে আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. থেকে এবং মালিবাগ জামিয়ার অন্যান্য আসাতিযায়ে কেরাম, যখন দেওবন্দের গল্প করতেন, মনে হত দেওবন্দ যেন আমাদের সামনে। বর্ণনার ভঙ্গি এবং যে ভালবাসা নিয়ে বয়ান করতেন, হৃদয় মাঝে দারুল উলূ্মের ভালবাসা জন্মাতো অপরিসীম।
মেশকাত জামাতে যখন পড়ি, তখন দেওবন্দগামী এক কাফেলার সাথে রওয়ানা হয়ে ছিলাম। পাসপোর্ট ভিসা করে, বেনাপোল বর্ডার দিয়ে কোলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে ছিলাম। কিন্তু কোলকাতা থেকে ফিরে আসি। নানাবিধ কারণে আর সে বছর যাওয়া হল না। তবে আশা ছাড়লাম না।
পরবর্তি বছর দাওরায়ে হাদীস শেষ করে দেওবন্দগামী কাফেলায় শরীক হলাম। তবে এবার কোলকাতা থেকে আর অপেছি নয়। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে পাঞ্জাব মেইলে কাফেলার সাথে রওয়ানা হলাম।
বড় মনে পড়ে আজ, সেই কাফেলার কথা। কী আনন্দ, কী অনুভুতি, কী প্রেম নিয়ে সেদিন রওয়ানা হয়েছিলাম, সে সময়কার সেই ভালবাসার কোনো তুলনা হয় না।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


