ধর্ম তোমার উৎসব আমার?

ধর্ম তোমার উৎসব আমার?

ধর্ম তোমার উৎসব আমার?

মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ ইসলাম প্রচারে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের মহানবী মুহাম্মাদ সা.। ইথারে পাথারে, নগরে বন্দরে সবখানে একই আওয়াজ উচ্চারিত, উচ্চকিত ইসলাম ইসলাম। শান্তি! চির শান্তি!

ধনসম্পদ, ক্ষমতা, নারী কোন প্রলোভনের বেড়াজালে যখন প্রশংসিত সত্তাকে আটকানো গেল না তখন এক সন্ধ্যায় বুকভরা আশা নিয়ে মহানবীর সা. দোরগোড়ায় এলো অলীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়ায়েল, আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব ও উমাইয়া ইবনে খালফ। তারা প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ! এসো আমরা তোমার মাবুদের ইবাদাত করি এবং তুমি আমাদের মাবুদদের ইবাদাত করো। আর আমাদের সমস্ত কাজে আমরা তোমাকে শরীক করে নিই। তুমি যা এনেছো তা যদি আমাদের কাছে যা আছে তার চেয়ে ভালো হয় তাহলে আমরা তোমার সাথে তাতে শরীক হবো এবং তার মধ্য থেকে নিজেদের অংশ নিয়ে নেবো। আর আমাদের কাছে যা আছে তা যদি তোমার কাছে যা আছে তার চাইতে ভালো হয়, তাহলে তুমি আমাদের সাথে তাতে শরীক হবে এবং তা থেকে নিজের অংশ নেবে।’

মাকাল ফলওয়ালা প্রস্তাব পেশ করতে দেরি সপ্ত আসমানের উপর থেকে আল-কাফিরুন নামের পূর্ণাঙ্গ এক সূরা নিয়ে হযরত জীব্রীলে আমীনের আসতে দেরি হলো না। তিনি এসেই মহানবী সা. কে আল্লাহর পয়গাম শুনিয়ে দিলেন।

১. বলে দাও, হে কাফেররা!
২. আমি তাদের ইবাদাত করি না যাদের ইবাদাত তোমরা করো৷
৩. আর না তোমরা তার ইবাদাত করো যার ইবাদাত আমি করি৷
৪. আর না আমি তাদের ইবাদাত করবো যাদের ইবাদাত তোমরা করে আসছো৷
৫. আর না তোমরা তার ইবাদাত করবে যার ইবাদাত আমি করি৷
৬. তোমাদের দীন তোমাদের জন্য এবং আমার দীন আমার জন্য।

কথা ক্লিয়ার?

সূরাটি উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে জানা যাবে, আসলে ধর্মীয় উদারতার উপদেশ দেবার জন্য সূরটি নাযিল হয়নি। যেমন আজকাল কেউ কেউ মনে করে থাকেন বরং কাফেরদের ধর্ম, পূজা অনুষ্ঠান ও তাদের উপাস্যদের থেকে পুরোপুরি দায়িত্ব মুক্তি এবং তার প্রতি অনীহা, অসন্তুষ্টি ও সম্পর্কহীনতার ঘোষনা দেয়া আর এই সাথে কুফরী ধর্ম ও দ্বীন ইসলাম পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের উভয়ের মিলে যাবার কোন সম্ভাবনাই নেই একথা ঘোষণা করে দেয়ার জন্যই এ সূরাটি নাযিল হয়েছিল। যদিও শুরুতে একথাটি কুরাইশ বংশীয় কাফেরদেরকে সম্বোধন করে তাদের আপোস ফরমূলার জবাবে বলা হয়েছিল কিন্তু এটি কেবল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং একথাগুলোকে কুরআনের অন্তরভূক্ত করে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে কিয়ামত পর্যন্ত এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, কুফরী ধর্ম দুনিয়ার যেখানেই যে আকৃতিতে আছে তার সাথে সম্পর্কহীনতা ও দায়িত্ব মুক্তির ঘোষণ তাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। কোন প্রকার দ্বিধা–দ্বন্দ্ব ছাড়াই তাদের একথা জানিয়ে দেয়া উচিত যে, দীনের ব্যাপারে তারা কাফেরদের সাথে কোন প্রকার আপোস বা উদারনীতির আশ্রয় গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এ কারণেই যাদের কথার জবাবে এ সূরাটি নাযিল হয়েছিল তারা মরে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এটি পঠিত হতে থেকেছে। যারা এর নাযিলের সময় কাফের ও মুশরিক ছিল তারা মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও এটি অব্যাহতভাবে পড়েছেন। আবার তাঁদের দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার শত শত বছর পর আজো মুসলমানরা এটি পড়ে চলেছেন। কারণ, কুফরী ও কাফেরের কার্যকলাপ থেকে সম্পর্কহীনতা ও অসন্তুষ্টি ঈমানের চিরন্তন দাবী ও চাহিদা।

এখানে ভেজাল আছে:

বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তবে এখানে মুসলমানরা ছাড়াও হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য আরো কিছু ধর্মের লোক বসবাস করে। প্রত্যেক ধর্মের লোকদেরই আছে আলাদা ধর্মীয় কার্যক্রম ও উৎসব। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও এখানে নির্বিঘ্নেই তাদের উৎসব পালন করে থাকে। সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উৎসব পালন করাটা কোন অসুবিধার বিষয় নয়। বরং নিজস্ব গন্ডির মধ্যে অন্যান্য ধর্মের আচার-আচরণ পালন করতে দেয়া ইসলামেরও নীতি। কিন্তু আজকাল একটা স্লোগানে আমাদের দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছে। খুব জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’

প্রিয় পাঠক! শুনতে ভালো লাগলেই সেটা আসলে ভালোলাগা? এই স্লোগানটির ভেতর-বাহির নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট বিশ্লেষণের অবকাশ আছে।

উদ্দেশ্য ও প্রয়োগক্ষেত্র:

‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’- কথাটার বাহ্যিক অর্থ হলো, ‘ধর্মীয় দিক থেকে এক ধর্মের লোকের সাথে অন্য ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও উৎসবের দিক দিয়ে সবাই এক। অর্থাৎ ধর্মের আচার-আচরণ সবাই নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী পালন করবে আর উৎসবগুলো সবাই একত্রে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পালন করবে। সে হিসেবে মুসলমানরা হিন্দুদের পূজায় শরীক হবে আর হিন্দুরা অংশ গ্রহণ করবে ঈদের নামাযে। বুদ্ধপূর্ণিমার দিনটা বৌদ্ধদের পাশাপাশি মুসলমানরাও উদযাপন করবে।’

তবে বাইরের দিক ছাড়াও স্লোগানটির ভেতরগত আরেকটি অর্থ আছে। সেটা হলো- অন্যান্য ধর্মের লোকেরা মুসলমানদের উৎসবে যোগ দিক আর না দিক; মুসলমানদের দায়িত্ব হলো সব ধর্মের উৎসবে যোগ দেয়া। প্রতি বছর পূজা বুদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিন এলে কথাটা খুব বেশি শোনা যায়। পূজা বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের লোকেরা কথাটা বিভিন্নভাবে বলেন। সেসব অনুষ্ঠানে আগত রাজনৈতিক বক্তারাও কথাটা খুব গর্বের সাথে বলে থাকেন। এর দ্বারা বুঝা যায়, এ শ্লোগানের প্রবক্তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘মুসলমানগণ’। অন্যান্য ধর্মলম্বীদের কার্যক্রম যাই হোক না কেন, মুসলমানরা যেন নিজ নিজ ধর্ম স্বস্থানে রেখে অন্য সব ধর্মের উৎসবে যোগদান করে; ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ ‘স্লোগান দ্বারা মূলত এটাই উদ্দেশ্য।

মুসলমানদের জন্য ভিন্ন ধর্মের উৎসবে যোগ দেয়া বা তাদের উৎসবে আনন্দ প্রকাশ করা কিছুতেই বৈধ হতে পারে না। কারণ ধর্ম আর উৎসব একটাকে অন্যটা থেকে পৃথক করে দেখার কোন সুযোগ নেই। অন্য ধর্মের উৎসবে একাত্মতা ঘোষণা করা মানে সে ধর্মের মাঝে নিজেকে একাকার করে দেয়া। বিষয়টা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে ধর্মের সাথে উৎসবের সম্পর্কের বিষয়টা বুঝতে হবে।

ধর্মের সাথে উৎসবের সম্পর্ক:

প্রত্যেক ধর্মের রীতিনীতির অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হলো সে ধর্মের উৎসব। যেমন হিন্দুদের পূজা, যেখানে দেবতাদের আরাধনা করা হয়। সে হিসেবে সেটা হিন্দুদের একটা ধর্মীয় কাজ। আবার এই পূজাকেই ওরা বলে উৎসব। দূর্গাৎসব শব্দটা নিশ্চয়ই আপনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। এ বিষয়ে ইসলামের নীতি আরো মজবুত। ইসলাম সমর্থিত সকল উৎসবই ইবাদত। ইবাদত ছাড়া নিছক উৎসবের অনুমোদন ইসলামে নেই।

মদীনায় ইসলামপূর্বযুগে দু’টি উৎসব চালু ছিলো। নওরোজ ও মেহেরজান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সে দু’টি উৎসব পালনের অনুমতি দেননি। বরং বিকল্প হিসেবে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা পালন করতে বলেছেন। এই দু’টি উৎসবই ঈদের নামায আদায় করা প্রধান একটি কাজ। তাছাড়া ঈদুল ফিতরের আগে এক মাস রোজা রাখতে হয়। আর ঈদুল আযহাতে সক্ষম ব্যক্তিরা কুরবানী করে থাকেন। এমনকি সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করবে না তাকে ঈদগাহে উপস্থিত হতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং বোঝা গেলো, ইসলামে নিছক কোন উৎসবের অস্তিত্ব নেই। এখানে সকল উৎসবই ধর্মীয় চেতনা সম্পন্ন।

অন্য ধর্মের উৎসবে যোগদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা:

১. অন্য ধর্মের উৎসবসমূহে আল্লাহ তা‘আলার সাথে প্রতীমা ইত্যাদিকে শরীক করা হয় এবং প্রতিমা সমূহের পূজা করা হয়। অথচ ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না।’ [সূরা নিসা, আয়াত: ৩৬]

২. অন্য ধর্মের উৎসব সমূহে শরীক হওয়ার অর্থ হলো সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য ধর্ম বলে স্বীকার করে নেয়া। অথচ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতেও সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’ [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫]

৩. অন্য ধর্মের উৎসবে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করা হয়। অথচ যারা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে না তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করতে কঠোভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি নিজের বাবা-ভাইও যদি কাফের হয়, তবে তার সাথেও একই নীতি অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘হে ঈমানদারগন, তোমাদের পিতা ও ভাইয়েরা যদি ঈমানের উপর কুফরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়, তবে তাদেরকে নিজেদের অভিবাবক বানিও না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিবাবক বানাবে, তারাই জালেম।’ [সূরা তাওবা, আয়াত: ২৩]

৪. এক বর্ণনায় খলীফা হযরত উমর রা. বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর দুশমনদের উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাক।’ [আসসুনানুল কুবরা, হাদীস: ১৮৮৬২] অন্য বর্ণনায় তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘কারণ এক্ষেত্রে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নাযিল হয়ে থাকে।’

৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেছেন, ‘যারা বিধর্মীদের মত উৎসব করবে, কিয়ামত দিবসে তাদের হাশর ঐ লোকদের সাথেই হবে।’ [আসসুনানুল কুবরা, হাদীস: ১৫৫৬৩]

সম্প্রীতি মানেই ঢলাঢলি নয়:

অন্য ধর্মের উৎসবে যোগ দেয়ার বিষয়ে এসব স্পষ্ট বক্তব্য শুনে অনেকে হয়তো বলবেন, তাহলে ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্যগুলোর কী অর্থ হবে? আসলে এসব প্রশ্নকারী অবুঝের মতো ধর্মের সাথে অধর্মকে গুলিয়ে ফেলেছেন। সব ধর্মের উৎসবকে একাকার করে ফেলাকে তারা সম্প্রীতি মনে করছেন। অথচ হাদীসে বার বার বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে, ‘ইয়াহুদী মুশরিকদের সাথে ভিন্নতা অবলম্বন করো।’

দেখুন, দশই মুহাররমে রোজা রাখা ইসলামে মুস্তাহাব। নবীযুগে দশই মুহাররমে ইয়াহুদীরাও রোজা রাখতো। তাদের সাথে যেন মিলে না যায় সে জন্যে রাসূল সা. দশই মুহাররমের আগের দিন বা পরে দিন আরো একটি রোজা রাখতে আদেশ করেছেন। [মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ৪/২৮৭, আল মাজলিসুল ইলমী, ইন্ডিয়া]

যদি ভিন্ন ধর্মের সাথে উৎসবে শরীক হওয়ার মাধ্যমে সম্প্রীতি বজায় রাখার অনুমোদন থাকতো, তাহলে রাসূল সা. এই আদেশ করতেন না। এমনিভাবে ইসলাম নামাযের আহবানের জন্যে খৃষ্টানদের ঘণ্টা গ্রহণ না করে আযানের প্রচলন করেছে। অভিবাদনের জন্যে হাত উঠানোর প্রথাকে বাদ দিয়ে সালামের প্রচলন করেছে। সপ্তাহের পবিত্র দিন হিসেবে শনি রবি-কে গ্রহণ না করে জুমু‘আবারকে গ্রহণ করেছে।

এসব বিষয় থেকে এ কথা স্পষ্ট- সবকিছু একাকার করে ফেলার নাম সম্প্রীতি নয়। বরং সম্প্রীতির ক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা। এক ধর্মের সাধে অন্য ধর্মের সহবস্থানকে ইসলাম সমর্থন করে। প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী যেন আপন আরাধনা স্বগণ্ডিতে নির্বিঘ্নে করতে পারে ইসলামে তার দিকনির্দেশনা রয়েছে। হযরত ওমর রাযি. তার শাসনামলে ভিন্নধর্মালম্বীদের কানীসা (উপাসনালয়) বানানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। নিজধর্মের আচার আচরণ পালন করার সুযোগ পাওয়া প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর অধিকার। সে অধিকার তাদেরকে যথাযথভাবে প্রদান করার নাম হলো সম্প্রীতি। আর সেখানে উপস্থিত হওয়া বাড়াবাড়ি এবং সম্পূর্নরূপে ইসলামী চেতনাবিরোধী।

এরচে’ বড় কথা হলো সম্প্রীতি রক্ষার ঠুনকো অজুহাতে অনেক আত্মমর্যাদাশূন্য মুসলিম ভিন্ন ধর্মের উৎসবে যোগ দিচ্ছেন। অথচ ওরা কিন্তু কেউ আমাদের ইবাদাতে অংশগ্রহণ করছে না। রোজা রাখছে না বা ঈদের নামায পড়ছে না। আর কুরবানী করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং আমাদের পাশের দেশে তো রীতিমতো কুরবানীতে বাধা প্রদান করা হচ্ছে। গোমাতাকে রক্ষা করার নামে মুসলমানদের হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছেনা। আমাদের উৎসবের ব্যাপারে তাদের এই স্পষ্ট অবস্থানের পরও আমরা তাদের উৎসবে যোগদান না করলেই সম্প্রীতি বিনষ্টকারী হয়ে যাবো?

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের সবক’টিতে ওরা শতভাগ অনুপস্থিত; আর উৎসবে সার্বজনীনতার এ শ্লোগান তুলে একতরফাভাবে আমরা ওদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছি! এটা তা খোদ এই শ্লোগানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রমাণ করছে যে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ শ্লোগানটি বাস্তবতা বিরোধী একটি শ্লোগান। পাশাপাশি এ চিত্রটি মুসলমানদের আত্মমর্যাদাবোধকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

ভিন্নধর্মের মানুষ যদি আমাদের উৎসবগুলোতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে; তারপরও তো আমাদের জন্য তাদের উৎসবে হাজির হওয়ার কোনো অবকাশ ছিলো না। কারণ, তাদের উৎসবগুলো শিরক ইত্যাদি দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। আর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উপস্থিত হওয়া বা তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা মুসলমানদের জন্য কিছুতেই বৈধ নয়।

এ দেশের রাজনীতি:

‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এ বাক্যটা সবচে’ বেশি যারা ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও রয়েছেন। বর্তমানে তো অনেকে এর প্রয়োগও শুরু করে দিয়েছেন। পূজায় উপস্থিত হয়ে ঢোল-তবলা বাজিয়ে, সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে নিজেদেরকে অসম্প্রদায়িক বানানোর খুব চেষ্টা করছেন। ব্যানার, ফেস্টুনে অলিগলি ভরে তুলছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই মুসলিম যুব সমাজ বৃদ্ধ সমাজ,তরুণ সমাজ (রাজনীতিবিদ) ঢালাওভাবে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাচ্ছে। এ এক এলাহী কান্ডকারখানা।

হে আমার রাজনীতিবিদ বন্ধু! যদি বলি, ‘রাজনৈতিক দল যার যার উৎসব সবার’ তাহলে কি আপনারা কথাটিকে সমর্থন জানাবেন? এক দলের বর্ষপূর্তিতে অন্যরা উৎসব করবেন? একদলের সভানেত্রীর জন্মদিনে অন্যেরা কেক কাটবেন?

বর্ষপূর্তি উদযাপন করা বা জন্মদিন পালন করা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কী-সেটা ভিন্ন আলোচনা। এখানে কথা হচ্ছে- এক দলের বর্ষপূর্তিতে অন্য দলের আনন্দিত না হওয়ার চিরায়ত চিত্র এটাই প্রমাণ করছে যে, তারা নিজেদের দল থেকে উৎসবকে আলদা করে দেখতে পারছেন না। তাহলে ধর্মের চেয়ে উৎসবকে আলাদা করে দেখার দুঃসাহস আপনারা কিভাবে করেন?

আমি দুই দুইটা ঈদ ইন্ডিয়ার মাটিতে কাটিয়েছি কিন্তু মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় হিন্দু নেতা নেত্রী, রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে হাতেগোনা কয়েকটি চটি মার্কা ব্যানার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি অথচ এ দেশের তুলনায় ঐ দেশের মুসলিম ভোটারদের প্রয়োজন তাদের খুব বেশি।

পাঠক! সময় এসেছে সচেতন হওয়ার,জাগ্রত হওয়ার। উৎসবের নামে এক টানে লুঙ্গি খুলে ফেলার কোন মানে হয় না। পোষাক পরেও উৎসব হয়। ‘গাছ যার যার ফল সবার’ নীতি অবলম্বনে যেমন রক্তারক্তি কান্ড ছাড়া ফল আর কিছুই পাওয়া যাবে না ঠিক তেমনি চটকদার শ্লোগান ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ বলে উদোম গায়ে নাচগান আর প্রাসাদ খাওয়ায় ঝাপিয়ে পড়লে পিঠের চামড়া কিন্তু থাকবে না।

ঐ দেখ! মালেক দারোগা ডান্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে…

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *