নবীজীর জন্য ভালোবাসা
মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ ‘হে রাসূল/ ফেলে দিও না/ ছেড়ে যেও না/ সম্বলহীন পাথেয় বিহীন/ আমি দেওয়ানা। তোমার তো ওগো আছে বহু জন/ আমার তো কেউ নাই কেউ নাই/ পাগল আমি তোমারি দেওয়ানা। হে রাসূল/ ওগো প্রিয়/ ফেলে দিও না/ ছেড়ে যেও না।’
বেলায় বেলায় কবিতা তো অনেক পড়া হলো। কিন্তু রাসূল সা. কে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে ইসলামি বিশ্বের জীবন্ত কিংবদন্তি আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব বিরচিত উল্লেখিত কবিতাখানা যতই পড়ি ততই মনে হয় নবীজী সা. এর সাথে আমার আত্মিক বন্ধন এখনও অটুট আছে, ছিড়ে যায়নি। মনের গহীনে রাসূলের বরকতময় সান্নিধ্য লাভের লালিত স্বপ্ন একটু একটু করে ডালপালা মেলতে শুরু করে। আর যখন আমাদের কলিজার টুকরো নবীজীকে নিয়ে যখন কেউ উন্মাদনায় মেতে উঠে তখন বেদনায় আমাদের কলিজা ছিড়ে যায়। দেহে রক্তের সঞ্চালন রবে আর মহানবীর বিরুদ্ধে কিছু করে, বলে পার পেয়ে যাবে অথচ তাঁর প্রেমে আমরা জেগে উঠব না তা কি করে হয়?
অতি সম্প্রতি কুলাঙ্গার আবু জেহেলের এক কুলাঙ্গার সন্তান, ফ্রান্সের উন্মাদ প্রেসিডেন্ট মুসলিম বিশ্বের প্রাণের স্পন্দনে ইট মারার হীন পরিকল্পনা করেছে মাত্র কিন্তু পাটকেল খেতে দেরি হয়নি। বিশ্ব মুসলিম এক সুতোয় গেঁথে গেছে তাদের নবীজীর প্রেমে, প্রিয় রাসূলের ভালোবাসায় ।রাসূলে পাক সা. এর অবমাননার ইস্যুতে এবার আরব বিশ্ব বিশেষকরে সৌদি আরব মোটামুটি জেগে উঠেছে। মুসলিম বিশ্বের জন্য এটা আশাজাগানিয়া সংবাদ। আরব জাতি জেগে উঠা মানেই কাফের মুশরিক সম্প্রদায়ের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া। সময় এখন জাগবার, সময় এখন সংশোধন হবার।
ফ্রান্সের ব্যঙ্গচিত্রের প্রতিবাদে আরব থেকে আফ্রিকা, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ইউরোপ থেকে আমেরিকা সবাই জেগেছে, হৃদয়ে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে মাশাআল্লাহ।
আমেরিকা, ব্রিটেন, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ সমগ্র কুফফার সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের রক্ত চুষে খেয়েছে অথচ আমাদের ঘুম ভাঙ্গেনি, বোধদয়ের উন্মেষ ঘটেনি কিন্তু এখন একটু আধটু করে মুসলমানরা জাগছে, জাগাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের ব্যঙ্গচিত্রের প্রতিবাদে আরব থেকে আফ্রিকা, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ইউরোপ থেকে আমেরিকা সবাই জেগেছে, হৃদয়ে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে মাশাআল্লাহ। এখন কর্তব্য রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে সম্মুখ পানে এগিয়ে চলা। আজকের আন্দোলন যেন অতীতের মতো ইস্যু কেন্দ্রীক আন্দোলন না হয়। ইস্যু এসেছে আন্দোলনে নেমেছি ইস্যু নেই আবার আল্লাহ রাসূলের নাফরমানির যুগে প্রবেশ করেছি। [নাউজুবিল্লাহ]
পাঠক! গোস্বা না করলে বলব এই দেশে এর নজির ভুরি ভুরি। ২০১২ সালের কথা। হলিউডের চলচ্চিত্র পরিচালক স্যাম বাসিল ‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ নামে ইসলাম বিদ্বেষী একটি বিতর্কিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এই শর্ট ফিল্মে পর্দায় ইসলামকে বিরূপভাবে ফুটিয়ে তোলার প্রতিবাদে বিশ্ব মুসলিম ক্ষোভে ফেটে পড়ে। দুনিয়াজুড়ে এর বিরুদ্ধে মিটিং মিছিল, সংগ্রাম, আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে।
মনে পড়ে তখন আমি জামিয়া ইকরায় পড়ি। এক শুক্রবার আমার উস্তায মুফতি ইদ্রিস সাহেব খেতাবতের ইন্টারভিউ দিতে উত্তর বাড্ডার হোসেন মসজিদে গেলেন। খাদিম হিসেবে আমাকে হুজুর সঙ্গে নিয়ে গেলেন। ইনোসেন্স অব মুসলিমস ইস্যুতে জুমার পর মসজিদের সামনে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হলো। মিছিলের গন্তব্য জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম। নামাজের পর আমরা সভাপতির বাসায় গেলাম খেতে সাথে গন্যমান্য আরো অনেকে। খানিক বাদে সেই প্রতিবাদ মিছিলের মধ্যমণি বাসায় উপস্থিত।ঘেমে নেয়ে উঠা জামাটা খুলতে খুলতে বলতে লাগল, ‘সেই রকম একটা আন্দোলন কইরা আইলাম’ একজন বলল আপনি মিছিলের সাথে গেলেন না? অমনি আশেকে ইসলাম খেঁকিয়ে উঠল, অতদূর যাইব কেডা? মিছিল উডায়া দিছি, গরম কইরা রাস্তায় লইয়া গেছি এইডাইতো বেশি!’
কি বুঝলেন পাঠক! তার কথাবার্তায় মনে হয়েছে মিছিলে গলাবাজি করে সে ইসলাম ও নবীর উপর অনেক বড় ইহসান করেছে! তার ঘামের মূল্য কত তা কি ইসলাম জানে? ফ্রান্স ইস্যুতে আমাদের আন্দোলন যদি এমন হয় তাহলে তো তাহলে। যদি পাঠক রাগান্বিত না হতেন তাহলে সাহসিকতার সাথে বলে ফেলতাম আজ ফ্রান্স নবীজীর অবমাননা করেছে প্রত্যক্ষভাবে আর আমরা মুসলমানরা নবীর অবমাননা করছি পরোক্ষভাবে।
আল্লাহ পাক কি সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে বলেননি, ‘হে নবী! আপনি বলে দিন যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমি রসুলের অনুসরণ কর।’
মহানবী কি বলেননি? যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে জিন্দা করল, সে আমাকেই ভালোবাসল। আর যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে। [জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৮]
অথচ আজকের আমি মুসলমান? আমার ঘর আমার বাহির আমার টোটাল জিন্দেগী কি রাসূলের সুন্নাত অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে? রাসুলের সুন্নাতকে ইচ্ছায় সজ্ঞানে পিঠ পিছনে ফেলে আমি কি পরোক্ষভাবে রাসুলের অবমাননার মিছিলে শামিল হচ্ছি না? এগুলো আবেগ নয় বাস্তবতা।
আর কতকাল আবেগ দিয়ে বিবেককে পরিচালিত করব আমরা? ফ্রান্সকে বয়কট করার পাশাপাশি আমরা আমাদের পিছনে লেগে থাকা ইবলিস শয়তানটাকেও বয়কট করার মিছিলে যোগ দিয়ে তবেই আমাদের রাসুল প্রেম, বয়কট ফ্রান্স, বয়কট মিল্লাতুন ওয়াহিদা স্বার্থক হবে, সফল হবে। নইলে ইস্যু কেন্দ্রীক আন্দোলন আন্দোলনের জায়গায় থাকবে আর মুসলমানদের কল্যানে ইউনিলিভারের মতো ফ্রান্সের পণ্যগুলোরও বিশাল মার্কেটিং হয়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমাদের সবাইকে সুমতি দান করুন। আমিন।
লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


