নবীজীর ‘মুহাম্মদ’ ‘আহমদ’ নামের রহস্য

নবীজীর ‘মুহাম্মদ’ ‘আহমদ’ নামের রহস্য

আদিল মাহমুদ ❑ যখন পুরো পৃথিবী নিকষ আঁধারে ছেয়ে ছিল, আল্লাহ তাআলার উপাসনা করার মত কেউ ছিল না পৃথিবীতে। ঠিক তখনই মানবজাতিকে অন্ধকারের ঘোর অমানিশা থেকে আলোর মিনারায় স্থানান্তরিত করা জন্য সর্বপূণ্যময় ভূমি, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল, মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন নবীজী মুহাম্মদ (সা.)।

তিনি বর্বরতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া আরবের মানুষগুলোকে সোনালি সময় এবং নতুন জীবন দান করেছেন। মানব গোলামীর জিঞ্জির ভেঙে একনিষ্ট ইবাদতের সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর আনিত ধর্ম ‘ইসলাম’ গ্রহণ করে, তাঁর পরশে থেকে ‘সাহাবী’ হওয়া সৌভাগ্য লাভের সুযোগ পেয়েছেন। আর তিনি প্রেম ও ভালোবাসার পতিক হয়ে ওঠেছেন।

মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তার রঙে জীবন রঙিন করে, তখন তাকে প্রেম ও আদরের অনেক নামে ডাকে। এমনিভাবে নবীজীকে সাহাবায়ে কেরাম, উলামায়ে কেরাম ও কবি সাহিত্যগণ হরেকরকম নামে, বিভিন্ন কিছুর সাথে উপমা দিয়ে নিজের মনের মত করে ডেকেছেন। তবে তাদের সবাই নবীজীর জন্মগত নাম ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’ এর কথা জানেন। এই দুই নামেই বেশির ভাগ ডাকেন। কিন্তু অনেক জানেন না নবীজীর ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’ নামের রহস্য!

‘মুহাম্মদ’ নামের অর্থ প্রশংসিত। নবীজীর ‘মুহাম্মদ’ নামের রহস্য হলো, আল্লাহ তাআলা তার মাখলুকাতের মধ্যে নবীজীর সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেছেন। এতো প্রশংসা তিনি অন্য কোন নবী-রাসূলের করেননি। তাঁর মত করে অন্য কাউকে জগতবাসীর জন্য সুন্দরতম নমুনা হিসেবে প্রেরণ করেননি, একমাত্র তাঁকেই করেছেন। শারীরিক গঠন কাঠামোর দিক দিয়েও নজিরবিহীনভাবে বানিয়েছেন। তাঁর মতো অঙ্গ সৌষ্ঠবের অধিকারী এত সুন্দর আর কেউ ছিল না, কিয়ামত পর্যন্ত হবেও না। আল্লাহ তাঁকে অনুপম চরিত্র মাধুরী দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। চারিত্রিক সৌন্দর্যেও তিনি ছিলেন সমস্ত সৃষ্টির সেরা। আল্লাহ তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘নিসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’। [সূরা আল কালাম-৪]

অসঙ্কোচ, অনাড়ষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক, ও অর্থপূর্ণ কথা। সহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার গুণবৈশিষ্ট্যসহ হাজারও গুণাবলী তাঁর মধ্যে ছিল। এ সবই ছিল প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া গুণরাজী, আল্লাহর প্রশংসার অংশ। আর তিনিই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত ব্যক্তি ছিলেন, আছেন, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন এবং হাশরের মায়দানেও বেশি প্রশংসিত ব্যক্তি হবেন। এই জন্য নবীজীর নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখা হয়েছে।

‘আহমদ’ নামের অর্থ প্রশংসাকারী। নবীজীর ‘আহমদ’ নামের রহস্য হলো, আসমান জমিনের মধ্যে যা কিছু আছে, মানুষ, জ্বীন ও ফেরেশতারা মিলেও আল্লাহর এতো বেশি প্রশংসা করেননি, যতটা প্রশংসা নবীজী একা করেছেন। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সুসম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম ও প্রধান কাজই হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও প্রশংসা করা। আর তা করতে হবে কথা, কাজ ও সম্মতির মাধ্যমে। কোনভাবেই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা থেকে দূরে থাকা যাবে না।

আরও পড়ুন: নবীজীর সভাকবির কাব্যপ্রতিভা | আদিল মাহমুদ

আল্লাহ মানুষকে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আরাম-ব্যারামসহ বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। এসব অবস্থায় বান্দা আল্লাহর উপর বান্দা কতটা নির্ভরশীল, তা পরীক্ষা করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য। খুশী ও কষ্ট উভয় সময়ে আল্লাহর প্রশংসা করাও ইবাদত। অনেক মানুষ খুশির সময় বা অতিআনন্দে আল্লাহর স্মরণ ভুলে যায়। আবার যখন চরম দুঃখ কষ্টে থাকে, তখন কেউ কেউ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে আবার কেউ কেউ আল্লাহর উপর নারাজ হয়। কিন্তু নবীজী ছিলেন ব্যতিক্রম! তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করতেন। তাঁর মত করে আল্লাহর প্রশংসা কেউ করতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবে না। এমনকি হাশরের ময়দানে নবীজী সিজদায় পড়ে আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকবেন। এই জন্য নবীজীর নাম ‘আহমদ’ রাখা হয়েছে।

নোট: নবীজীর ‘মুহাম্মদ’ নাম রেখেছেন তাঁর সম্মানিত দাদা আব্দুল মুত্তালিব। ‘আহমদ’ নাম রয়েছেন সম্মানিত মাতা আমেনা।

— বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম, মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর খলীফা, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.) এর বয়ান অবলম্বনে লিখিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *