কাউসার মাহমুদ : সম্প্রতি ভারতের ইতিহাস সমৃদ্ধ শহর এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করেছে ভারতের রাজ্য সরকার। ঐতিহাসিক এ শহরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে প্রয়াগরাজ।
৪৭-এর দেশভাগ। আজ থেকে ৭১’র বছর অাগে সেই যে ভারত ভাগ হল। তারপর পাকিস্তান আর ভারতের মাঝে খুব সুখকর কোনও সম্পর্ক স্থাপন হয়নি। এই ভাগ স্পষ্টই ছিল দুই জাতীর মাঝে একটি বিভেদের নাম। পাকিস্তান আর হিন্দুস্থান। সীমান্তের দুই দিক থেকেই মানুষেরা পারি জমিয়েছে দুই দেশে। অধিকাংশ মুসলমানরা চলে গেল পাকিস্তানে। পাকিস্তান অঞ্চলে বসবাস করতে থাকা হিন্দুরা চলে এল ভারতে। কিন্ত দুই দেশের অধিবাসীদেরই ছিল তাদের মাটির প্রতি টান। তাদের জন্মস্থানের প্রতি হৃদেয়র গভীর মমতা। তবে সমেয়র আবর্তে দুই ধর্মের মানুষের মাঝে সবচেয়ে কঠিন হয়ে যে বিষয়টি আঘাত হানতে লাগলো। তা হলো তাদের ধর্মীয় দাঙ্গা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সমস্যার সৃষ্টি করেছে ভারতের হিন্দুরা। তারা সবসময়ই ভারতে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলমানদের সঙ্গে নির্মম আচরণ করে আসছে। সেই দেশভাগের পর থেকেই মুসলমানদের প্রতি তাদের আচরণ। যার নির্মমতা তারা শুধু ধর্মীয় ইস্যুগুলোতেই আটকে রাখেনি। বরং তাদের এই রাক্ষুসে দৃষ্টি এখন ভারতের মুসলিম স্হাপত্যগুলোর দিকেও। ইসলামি নামে কোনও শহর বা স্থাপনার নাম থাকলে তাও যেন নিশ্চিহ্ন করার পায়তারা করছে উগ্রবাদি হিন্দুরা।
১৬ অক্টোবর ‘এলাহাবাদ’ শহরের নাম বদল করে বিজেপি সরকার এর নাম দিয়েছে প্রয়াগরাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ঘোষণা করেছেন যে ইলাহাবাদ শহরের নাম হবে প্রয়াগরাজ। ফলে ইলাহাবাদ স্টেশনের নামও হবে প্রয়াগরাজের নামে। আগামী বছর জানুয়ারি মাসে ত্রিবেণী সঙ্গমে অর্ধকুম্ভ। তাই তার আগে এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমেই কী হিন্দুদের আবেগ ক্রয় করে রাজনৈতিক বাজিমাত করতে চাইছে বিজেপি? ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির পরিকল্পনা কী এমনটাই!
অবশ্য তাদের এ অনৈতিক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে স্বয়ং কংগ্রেসসহ ভারতের বেশ ক’জন উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ এবং চিন্তাবিদরা । জোর করে এলাহাবাদ থেকে প্রয়াগ নামকরণ করে ২০১৯-এর আগে হিন্দুত্বের তাস প্রয়োগ কি সুস্থ রাজনীতি? এই প্রশ্নই এখন কঠোর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিজেপির বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে ১৮ অক্টোবর আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘জয়ন্ত ঘোষালের” একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ঘোষণা করেছেন যে ইলাহাবাদ শহরের নাম এ বার হবে প্রয়াগ। ফলে ইলাহাবাদ স্টেশনের নামও হবে প্রয়াগরাজের নামে। আগামী বছর জানুয়ারি মাসে ত্রিবেণী সঙ্গমে অর্ধকুম্ভ। তাই তার আগেই এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নাকি বিজেপি রাজনৈতিক বাজিমাত করবে। এমনটাই ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির পরিকল্পনা। এটাও এত দিনে আমরা জেনে গিয়েছি, এ বার প্রজাতন্ত্র দিবসের সময় যে সব বিদেশি প্রতিনিধি আসছেন তাঁদেরও নিয়ে যাওয়া হবে কুম্ভমেলায়। শুধু বোটক্লাবে কুচকাওয়াজ দেখলে কি ভারত দর্শন হবে!
এ সব বুঝলাম। কিন্তু নাম পরিবর্তন কেন? নাম পরিবর্তনের চেয়ে রাজ্য ও ইলাহাবাদ নগরীর উন্নয়ন করাটা কি বেশি জরুরি নয়? আর নাম বদলের প্রয়োজনটাই বা কি? এত দিন ধরে শহরটাকে জেনে এসেছি ইলাহাবাদ বলে৷ এখন সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে নতুন নাম প্রয়াগ বলা হলেই কি তা মানুষের মনে প্রয়াগ হয়ে যাবে? ধরুন, দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোডের নাম বদলে এখন নাম হয়েছে আব্দুল কালাম রোড। দিল্লির লোকেদের কিন্তু কাউকেই নতুন নাম বলতে শুনি না। দিল্লির কনট প্লেসের নাম বদলে রাজীব গাঁধী চক করে দেওয়া হয় কংগ্রেস জমানায়। এখনও দিল্লিবাসী কনট প্লেসই বলে। ক’জন রাজীব গাঁধী চক বলে তাঁকে স্মরণ করে?
মেট্রো স্টেশনের নাম যেমন কলকাতায় উত্তমকুমার, নজরুল, নেতাজি সুভাষ, সর্বশেষ নামকরণ কবি সুভাষ। আমার মনে হয়, এই সব নামকরণ আরোপিত। এলগিন রোডকে এলগিন রোড বলাই বাঞ্ছনীয়। ব্রাবোর্ন রোড তো ব্রাবোর্ন রোডই। নামকরণের সঙ্গে সেই সময়ের ইতিহাসের অনুষঙ্গ থাকে, সেটা ভুললে চলবে কী করে? নাম বদলালেই কি মুঘল সাম্রাজ্যের ঔরঙ্গজেবের ইতিহাসকে মুছে দেওয়া সম্ভব হবে?
ইতিহাসের নির্মোহ নিরপেক্ষ বিচার হোক, কিন্তু তার জন্য নাম বদলে লাভ কী? যোগী আদিত্যনাথের উচিত উন্নয়নের কাজে মন দেওয়া। শুধু নাম বদলালেই কি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি হবে?
কংগ্রেস দলের মুখপাত্র ওঙ্কার সিং বলেন, ‘এলাহাবাদের নাম বদল হলে ইতিহাসের ওপর এর প্রভাব পড়বে। যদি এই নাম পরিবর্তন করা হয় তাহলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখা এই শহরটির ঐতিহাসিক ভূমিকাকে খাটো করা হবে।
এ শহর থেকেই প্রথম প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে ভারত। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ‘স্বাধীনতা-আন্দোলন চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এলাহাবাদ। ১৮৮৮, ১৮৯৩ ও ১৯১০ সালে সেখানে মহা অধিবেশন হয়েছে।
যদি সরকার একান্তই ‘প্রয়াগরাজ’ নামটি চায়, তা হলে আলাদা শহর গড়ে তার নাম প্রয়াগরাজ করা হোক বলেই দাবি করেন ‘কংগ্রেস মুখপাত্র ওঙ্কার সিং। তাই বলে এলাহাবাদের নাম বদল করা উচিত নয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার পুনরায় হিন্দুত্বকে পুজি করে আগামী লোকসভা নির্বাচনের তাস খেলছে। তাই উগ্র হিন্দুদের ভারতে তাদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করেই মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি নানা অমূলক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিজেপি সরকার।
বিজেপিবিরোধীরা বলছেন, আগামী বছর অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনের আগে হিন্দু আবেগ উসকে দেওয়ার জন্যই যোগী আদিত্যনাথ সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৌদ্ধা শ্রেণী বলছে, এই নাম পাল্টানোর মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণিত হলো যে, নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারত থেকে মুসলিম ঐতিহ্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কংগ্রেস নেতা প্রমোদ তিওয়ারি এ বিষয়ে বলেন, লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে হিন্দুত্বের তাস খেলতে চাইছে যোগী আদিত্যনাথ সরকার। তারা বুঝতে পারছে কাজের নিরিখে আর জিততে পারবে না বিজেপি। তাই এখন হিন্দুত্বকে ভরসা করে এগোতে চাইছে দলটি। আদিত্যনাথের এই নাম পরিবর্তন প্রক্রিয়া যার ইন্ধন।
সূত্র : আনন্দবাজার


