নুসরাত হত্যা ও আমাদের বোধোদয়

নুসরাত হত্যা ও আমাদের বোধোদয়

নুসরাত হত্যা ও আমাদের বোধোদয়

অরুণ কুমার বিশ্বাস : নুসরাত জাহান রাফি এখন এক আন্দোলনের নাম। দেশব্যাপী যেখানেই নারীনিগ্রহ সংঘটিত হচ্ছে, সেখানেই শান্তিপ্রিয় অথচ প্রতিবাদী মানুষ ফুঁসে উঠেছেন নুসরাতের নামে। ভাগ্যিস, দেরিতে হলেও আমাদের চেতনা জেগেছে। আমাদের বাঙালির এই হুজুগে চেতনা যদি আরো কিছুকাল আগে জাগতো, তাহলে হয়তো মানুষরূপী দানবদের হাতে ইয়াসমিন, তনু কিংবা তোহাকে অকালে মরতে হত না। নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধী একে একে গ্রেফতার হচ্ছে, পুলিশ বুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অত্যন্ত যত্ন ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজটি করছেন। ফলে আমরা সাধারণ মানুষ ন্যায় বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছি।

নুসরাত একজন ছাত্রী, তিনি পরীক্ষা দিতে গিয়ে ঘাতকদের বর্বরতার শিকার হন। তাই সঙ্গত কারণেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই কেসে পার্টি হতে পারে। আবার তিনি একজন মেয়ে, তাই অতি উৎসাহী কেউ কেউ নারীবাদের প্রেক্ষাপটে পুরো বিষয়টি দেখতে পারেন। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে নুসরাত মেয়ে হোক বা ছাত্রী- সবার আগে তিনি একজন মানুষ। তাকে তার মৌলিক মানবিক অধিকারটুকু অটুট রেখে বেঁচে থাকবার নিশ্চয়তা দিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, নুসরাতকে আমরা সেই নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারিনি। নুসরাতকে বাঁচানো যায় নি। পিবিআই তদন্তে নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত বিশাল এক চক্রের নাম উঠে এসেছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে চার্জগঠনসহ খুনিদের কঠোর বিচারের আওয়াত আনা হবে।

নুসরাতের পুরো ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সঙ্গে জুড়ে আছে অর্থকড়ির বিষয়টি। কোমলমতি ছাত্রীদের জিম্মি করে স্থুল নারীলিপ্সা চরিতার্থ করবার জন্য পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও ছাড় দেয়া হয়নি এখানে। এই অবস্থা চলতে থাকলে কোনো বাবা-মা তার সন্তানকে আর মাদ্রাসা বা বিদ্যায়তনে পাঠাতে সাহস করবে না। ফলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উপরেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। এমনিতেই প্রাইমারি লেভেলের পরে ছাত্র-ছাত্রীদের ঝরে পড়ার বিশেষ প্রবণতা দেখা যায় এখনো। তার উপর যদি আবার অধ্যক্ষ সিরাজের মতো নীতিজ্ঞানহীন মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকে, তাহলে তা শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক অবস্থার জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শুধু ছাত্রীই নয়, ইদানীং মাদ্রাসার ছাত্রদের উপরেও যৌননিগ্রহসহ আরো নানা নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পড়া না পারা বা বেয়াদবি করেছে এমন অজুহাতে ছোট শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় শিক্ষক নামধারী কিছু বিবেকবর্জিত মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে সদয় হয়ে নুসরাত হত্যার কেসের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যারা নুসরাতকে এমন নির্মমভাবে পুড়িয়ে মেরেছে বা মারবার ক্ষেত্রে ইন্ধন যুগিয়েছে, তারা কেউ যেন আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যেতে না পারে। তাদের এমন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কখনও এমন ধৃষ্ঠতাপূর্ণ আচরণ করতে সাহস না দেখায়। মর্যাদার বিচারে বাবা-মায়ের পরেই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষকের কাছে ছাত্রছাত্রীরা জ্ঞানলাভ শুধু নয়, বরং তারা সহবত শেখে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠার বিদ্যা অর্জন করে। অথচ বাস্তবে কী হচ্ছে! অধ্যক্ষ সিরাজের মতো অমানুষের কারণে বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের স্কুল বা মাদ্রাসায় পাঠাতে এখন ভয় পান। যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলছে।

তবে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যদি এমন ভাবি, আমার ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে যেহেতু কিছু ঘটেনি, আমি কেন মিছে কথা বলতে যাবো! এমন পলায়নপর আচরণ কখনও কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, সমাজটা আমাদের। এখানে অধ্যক্ষ সিরাজের মতো দুশ্চরিত্র মানুষের কোনো জায়গা হতে পারে না। এক্ষত্রে আমাদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও সবার মাঝে সচেতনতা তৈরি করা। সমাজের যে কোনো স্তরে কোনো অন্যায় দেখলে সবাই মিলে প্রতিবাদ করতে হবে। বিপদ নিজের নাকি অন্যের, সেই বিবেচনা না করে সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কবি সুভাষ মুখোপাথ্যায় যথার্থই লিখেছেন, ‘এক হলে পারি, একা হলে হারি’। বর্তমান সমাজে সুষ্ঠু বিবেকবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইলে আমাদেরকে সেই একাত্মবোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই কেবল আমরা অধ্যক্ষ সিরাজের মতো মানুষরূপী হায়েনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবো। একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *