বাংলাদেশের মানুষই এখন দানব হয়ে যাচ্ছে : রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের মানুষই এখন দানব হয়ে যাচ্ছে : রাষ্ট্রপতি

পাথেয় রিপোর্ট : বাংলাদেশের মানুষই এখন দানব হয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, গানে বলছে মানুষ দানব হতে পারে না, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষই এখন দানব হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের (গ্রাজুয়েট) ভালো ভূমিকা রাখতে হবে। তোমরা যদি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পেইন করো তাহলে এগুলি বন্ধ হবে।

রোববার বিকালে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পঞ্চম সমাবর্তনে সভাপতির ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, এগুলো বন্ধ না হলে একদিন আমরা জাতি হিসেবে ধ্বংস হয়ে যাবো, পঙ্গু হয়ে যাব। এর হাত থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে হবে। এ ব্যাপারে মানুষকে জাগ্রত করতে হবে, যাতে এগুলো বর্জন করে। অনেক জায়গায় পকেট মারলে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এধরণের কাজ করলে তাদেরকেও গণপিটুনির ব্যবস্থা হওয়া দরকার।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ একটা কথা বলতে চাই। গতকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে একটু শুরু করেছিলাম, সময়ের অভাবে পারি নাই। এখানে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আছে, শুধু মেয়র সাহেব নাই। তাদের বলেছিলাম- সামনে আমের মৌসুম আসছে। সামনের আমের মৌসুমে আমার জন্য যেন ফরমালিনমুক্ত আম পাঠায়। গত বছরের আগের বছর রাজশাহীর শত শত টন আম প্রশাসন নষ্ট করেছে। কারণ এগুলোর মধ্যে ফরমালিন দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ফরমালিন এক ধরণের বিষ, যা খাইলে মানুষের দেহের অপরিসীম ক্ষতি হয়ে যাবে। কিন্তু গত বছর আমে ফরমালিন দেয়ার প্রবণতা কমেছে, এটা একটা ভালো লক্ষণ। আবার এও শুনি কৃষকরা আম গাছে থাকতেই বিক্রি করে দেয়। ব্যবসায়ীরা গাছের মধ্যেই নাকি স্প্রে করে দেয়, যাতে এগুলিতে পোকামাকড় না ধরে। ছোটবেলায় দুই-তিনটা আম কাটলে একটাতে পোকা পাওয়াই যেত, আজকাল আর আমে পোকার বংশ নাই।’

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘বাজার থেকে দেখতে সুন্দর আপেল কিনলাম। ফরমালিনের কথা শুনে বাজার থেকে কিনে এনে বাসায় রাখলাম। দুইমাস পরেও দেখি আপেল পঁচে নাই, শুধু একটু কুঁচকে গেছে। ছোটবেলায় যখন প্রাইমারিতে পড়তাম, ইন্ডিয়া বা সিলেটের ছাতক থেকে নৌকায় নদী পথে কমলা আসতো। কমলার সিজনে আমরা কিছু কমলা পেতাম। বাজার থেকে ৩০-৪০টা করে কমলা নিয়ে আসতো। আমরা এখনকার মতো দুই-একটা ভাইবোন ছিলাম না, ভাই-বোন ছিলাম দশ-বারোজন। ভাইবোনদের সাথে প্রতিযোগিতা করে কমলা বেশি নিয়ে দুই একটা খেয়ে বেশিভাগ লুকিয়ে রাখতাম। পরে সুযোগমত খাওয়ার জন্য। দুইদিন পরে দেখা যেত সবকমলা পচে গোবর হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘চীন থেকে আসে ছোট ছোট কমলা। গাছ থেকে পেড়ে চীন থেকে এনে বাংলাদেশে বাজারজাত করতে মিনিমাম দুই মাস লাগে। গ্রামের বাজারে বাজারে যাওয়ার পরও তরতাজা দেখা যায়। যেখানে তিনদিন কমলা রাখতে পারলাম না। সেখানে দুইমাস রেখে বিক্রি হয়, আমরা সেগুলো খাই। এমন কোনো জিনিস নেই যে ফরমালিন দেওয়া হয় না। আমার মনে হয় কাঁঠালের মধ্যেও ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে। এখন কাঁচাকলায়ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল এন্ড ফুড প্রসেসিং বিভাগ চালু হবে। আমার মনে হয় একমাত্র কচু ছাড়া সবকিছুতে ফরমালিন দেওয়া হয়। এব্যাপারে তোমাদের (গ্রাজুয়েট) দায়িত্ব আছে। মানুষকে বলতে হবে বোঝাতে হবে, এগুলো ভালো না।’

স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, যখন কলেজে পড়াশোনা করি তখন শুনছি কয়েকটা ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে একটা ক্যান্সারের রোগী পাওয়া যেত। আর এখন এমন কোনো গ্রাম নাই যেখানে ৭-৮টা ক্যান্সার রোগী পাওয়া যায়না। অধিক মুনাফার জন্য ব্যবসায়ীরা-মজুদদাররা এ ধরণের কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। মানে নিশ্চিন্তে যে মানুষ একটা জিনিস খাবে, ভালো একটা জিনিস, নির্ভেজাল একটা জিনিস। এটা রেয়ার (বন্ধ) হয়ে গেছে। আজকে দুঃখ হয়, কষ্ট হয়, পৃথিবীর প্রায় ৮০-৮৫টা দেশ ঘুরছি। পৃথিবীর কোনো দেশে খাদ্যের মধ্যে এ ধরণের প্রতারণা-প্রবঞ্চনা কোথাও তারা করে না।

তিনি বলেন, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, কয়েকদিন আগে নেপাল গেলাম, ওখানে খাদ্যের মধ্যে এগুলো করে না। পৃথিবীর মধ্যে এই বাংলাদেশের আমরাই মনে হয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছি। আমার কাছে সাহায্যের জন্য যারা আসে তাদের ৮০% ক্যান্সার রোগী। খাদ্যে ভেজাল-ফরমালিনের কারণেই এগুলো হচ্ছে। মানুষকে সচেতন হতে হবে। এখন রাজশাহী যশোর খুলনা বেল্টের মানুষ অসুখ হলেই কলকাতা যায়। কেন? আমাদের দেশে ডাক্তাররা তো কম না। ইন্ডিয়ার ডাক্তার-নার্স-ব্রাদাররা যে আচরণ করে তাদের মতো আমাদের দেশের ডাক্তার নার্সরা ভালো আচরণ করে না, সময় দেয় না। এজন্য ওখানকার ৮০% রোগী আমার দেশের। এখানে অনেক রাজনীতিবিদসহ অনেকেই আছেন। এই বিষয়টা নিয়ে ভাবা দরকার। এর কারণ হল খাবারে ভেজাল ও ফরমালিন বিষ। এখন মানুষ নিশ্চিন্তে আর কিছু খেতে পারে না।’

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ প্রকৌশলী সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে দেশ যতবেশি উন্নত সে দেশ ততবেশি সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। আমাদের বিপুল মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা কাঙ্খিত মাত্রায় অর্জিত না হওয়ায় আমরা আশানুরুপভাবে এগুতে পারিনি। বর্তমান সরকার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ যাবত কালের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নয়ন বাজেট প্রদান ও গবেষণা বরাদ্দ প্রদান করা হচ্ছে। বিদ্যমান সুবিধাসমূহের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুণগত উচ্চশিক্ষা প্রদানে ব্রতী হবে বলে আমার বিশ্বাস।

শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, সার্টিফিকেট দেওয়া এবং শিক্ষার প্রসারই শেষ কথা নয়। আমাদের প্রেয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা। বর্তমানে প্রতিনিয়তই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই আমাদেরও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বাস্তবভিত্তিক এবং প্রায়োগিক শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। গুণগত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সাথে ল্যাবরেটরির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি গবেষণা ও হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয়। এ জন্য গবেষণা ও ল্যাবরেটরি কর্মের উপর অধিক মনোনিবেশ করা জরুরি।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে মাথায় রেখে ন্যানো টেকনোলোজি, রোবোটিক্স, ব্লক চেইন ম্যানেজমেন্ট, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো বিষয়গুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা যাতে দেশের কল্যাণে, মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলে উদ্যোগী হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *