মহান বিজয় দিবসে স্বাধীনতা হোক অর্থবহ
মাসউদুল কাদির : যতই বিভীষিকাময় হোক ১৯৭১ তবু একাত্তরই আমাদের গর্ব। অহঙ্কার। বীর বিক্রমে যে মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করেছিলেন তাদের অভিনন্দন, সালাম। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই সুশীতল ছায়া ভোগ করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করছি। গোলামি জিঞ্জির থেকে তারাই আল্লাহর মেহেরবানীতে আমাদের মুক্ত করে এনেছে। পাকিস্তানী হানাদাররা কোনো বর্বরতাই তো বাদ রাখেনি। তারা কেবল যোদ্ধাদের মারেনি। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকেই তারা বাদ দেয়নি। নৃশংসতার যেমন একাত্তর। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার নামও একাত্তরই। ষোল ডিসেম্বর আমাদের গৌরবময় বিজয় দিবস, আনন্দের দিন। খুশির দিন।
রাজধানীর রেসকোর্স ময়দান জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাকহানাদার বাহিনী। এরপরই পৃথিবীর বুকে অভ্যুদয় ঘটে লালসবুজের একটি পতাকার। একটি নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের। যেই বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য নয় মাস অবধি কারও ঘুম ছিলো না চোখে। জালেমের বিরুদ্ধে যে দামাল ছেলেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল তা যুগ যুগ নয় শত শত বছর মনে রাখে এই বাঙালি।
দেশবিরোধীরা এখনো সহ্য করতে পারে না এই বাংলাদেশ। কোনো সুযোগ পেলেই তারা একাত্তরের বিরুদ্ধে কথা বলে। শহীদদের নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।
একজন মানুষ এ দেশের কোটি কোটি তাজাপ্রাণে গতি সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানুষকে মুক্ত ও স্বাধীন হতে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। তিনিই ছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সফল নেতৃত্বকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাদের সবাইকেই আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
আমরা জানি, বাঙালির বুকজুড়ে একরাশ সুস্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ যাত্রায়। কোথাও কোথাও বাঙালি আজ অস্ফুট যন্ত্রণায় সাঁতরায়। সত্যটা কী? ৪৭ বছরেও দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারছি না কেন? এখনো তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চৈতন্যবোধ জাগ্রত হয়নি। এখনো ত্যাগি মানুষদের জীবন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখি অনেককে। সমাজব্যবস্থায় সেই মান্দাতা বৈকল্যই প্রতিয়মান। কেন? কিছু রাজনৈতিক কারণও আছে। কেউ উন্নয়ন করতে চায় আবার কেউ পেছন থেকে টেনে ধরে।
রাজনৈতিক বলয়ে আমাদের সাধারণ জনতা কখনো পুড়ে ছাড়খার হয়, কখনো বাসে ঘুমন্ত কিশোর ভস্ম হয়ে যায়। আবার কখনো রাজনীতির কর্মসূচির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয় সাধারণ জনতা। আমরা বাঁচতে পারি না। এগিয়ে যেতে পারি না। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আবারও মাথা উঁচু করেই দাঁড়াতে হবে। যেমনটা কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, বাজিছে দামামা, বাঁধরে আমামা/ শির উঁচু করি মুসলমান/ দাওত্ এসেছে নয়া জমানার/ ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান।।
মুখেতে কলেমা, হাতে তলোয়ার/ বুকে ইসলামী জোশ দুর্বার/ হৃদয়ে লইয়া ইশক্ আল্লার/চল্ আগে চল্ বাজে বিষাণ।
তাহলে আবার একটি বাংলাদেশ আমাদের গড়া হবে। যেই স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই স্বপ্ন পূরণে আমরা সক্ষম হবো। অনাকাঙ্ক্ষিত অসংখ্য ঘটনায় বার বার আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। পতাকা উঠেছে দেশবিরোধী মানুষদের গাড়িতেও। যোদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ কিছুটা হলেও নিষ্প্রভ হয়েছে।
ষোল ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। প্রতিবছরই আমরা উদযাপন করি। বাস্তবতার নিরীখে স্বাধীনতাকে ধরে রাখা আর অর্থনৈতিকভাবে বলিষ্ঠ অবস্থায় পৌঁছুলেই বিজয় হয়ে উঠবে অর্থবহ। জাতীয় কাজগুলোতে আমাদের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। কারণ জাতির শক্তির প্রধান উৎস হলো ঐক্য। এই ঐক্যই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নয়মাস মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। ভীতু ও শক্তিশালী পাক বাহিনীকে পদানত করা সহজ হয়েছিল এই একটি মূলমন্ত্রের মাধ্যমেই। তাই ঐক্য ও ঐকমত্য আমাদের উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি। দেশ রক্ষার মৌলিক সূত্র। দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরী করতে পারলে ভিন্ন দেশ, ভিনদেশীরা এই লালসবুজকে লুটেপুটে খাওয়ার চক্রান্ত করবে; তা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়।
সম্ভাবনার বাংলাদেশ। সম্ভাবনাকে পাথরও চাপা দিতে পারি আবার সম্ভাবনাকে পথ দেখিয়ে দেশ গড়ায় অবদানও রাখতে পারি। একজন সাধারণ জনতার কাজ হবে সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখা। কী হবে আমাদের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার। ভুলে যেতে হবে বিভেদ। ছড়িয়ে দিতে হবে ভালোবাসা। তাহলেই আমরা কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ খুঁজে পাবো।
লেখক : ছড়াকার


