মূর্তিবিরোধী আন্দোলন ও কিছু কথা
আমিনুল ইসলাম কাসেমী
এক. আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব বিগত ২০ নভেম্বর রাজধানীর ঝিল মসজিদের এক জুময়ার বক্তৃতায় বলেছিলেন, সাউন্ডগ্রেনেডের মত হুমকি দিয়ে মূর্তি সরাতে বলা এটা সম্পূর্ণ দাওয়াতের মেযায বিরোধী। আল্লামা মাসঊদ সাহেবের বক্তৃতা যথার্থ ছিল এবং বাস্তব সম্মত, সেটা কিন্তু আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছে।
আসলে দাওয়াতের ক্ষেত্রে হেকমত -কৌশল, মাওয়ায়েজে হাসানা জরুরি। মিষ্টি কথার মাধ্যমে মানুষকে যতটুকু কাছে টেনে নেওয়া যায়, সেটা কিন্তু হুমকি- ধমকি দিয়ে হয় না। ভয়- ডর দেখায়ে, চোখ রাঙানি দিয়ে, কাউকে কাবু করা যায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা বুমেরাং হয়ে যায়। এজন্য হেকমতের সাথে, সমাঝোতার মাধ্যমে, উত্তম আখলাক দ্বারা মানুষকে বোঝানো যেতে পারে।
মূর্তিবিরোধী আন্দোলন যথার্থ। এটা মুসলমানদের প্রাণের দাবি। কিন্তু মানুষ কয়জনে বোঝে সেটা। আমরা স্পষ্ট করে না বলে, ভাস্কর্য- মূর্তির ব্যাপারে শরীয়াতের সমাধানটা মানুষের সামনে তুলে না দিয়ে আগেই আন্দোলনে যাওয়াটা কতটুক সঠিক, সেটা চিন্তার বিষয়।
আমার মনে হয়, প্রথমে মানুষকে বোঝানো দরকার। মূর্তির অসারতা সম্পর্কে, ক্ষতির দিকগুলো পুরো দেশের মানুষকে জানাতে হবে। আবার এ ব্যাপারে আলেমদের সম্মিলিত ফতোয়া প্রদান জরুরি।
একটা বড় সমস্যা দেখা দিচ্ছে এখন। শুধু হুমকি- ধমকি দিয়ে কাজ হয় না তা আবার প্রমাণ হল। সরকার কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, রাজধানীতে কোন সভা- সমাবেশ হলে অনুমতি লাগবে। এটা কিন্তু চিন্তার বিষয়। আমাদের দুর্দশিতার অভাবে আমরা ব্যাকফুটে যাচ্ছি।
সত্যি যদি সভা- সমাবেশ বন্ধ হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারা? আমাদের নির্বুদ্ধিতার কারণে দাওয়াতের কাজ বন্ধ হলে আমরাই সেই মহান কাজ থেকে মাহরুম হব।
দুই. দেশের শীর্ষ আলেমদের নিয়ে একটি লিয়াঁজো কমিটি হওয়া চাই। যারা সরকারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। এ ব্যাপারে কারো সাথে হিংসা না করে, সকলকে সাথে নেওয়া জরুরি। সরকারের কাছে গিয়ে সরকারকে বোঝানো। আমাদের অনেক ওলামায়ে কেরামের সাথে সরকারের সুসম্পর্ক রয়েছে, ওনাদেরকে সামনে রেখে চলা যায়। বেফাকের মাননীয় সভাপতি সাহেবের সাথেও সরকারে সুসস্পর্ক। এ ব্যাপারে মুরুব্বীর পরামর্শ চাওয়া যেতে পারে।
মুরুব্বী ছাড়া কিন্তু কোন কাজ হয় না। ইয়াং আলেমদের আন্দোলনে সফলতা পেতে মুরুব্বীদের সম্পৃক্ততা জরুরি। সাপোর্ট দরকার মুরুব্বীদের। তাছাড়া আন্দোলনে সফলতা আসবে না। নিজে নিজে ময়দানে জোরালো বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে, মুরুব্বীদের পরামর্শ এবং তাদের দিক নির্দেশনায় সামনে বাড়ানো যেতে পারে।
একটা সংবাদ সম্মেলন হল। এটা আরো আগে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ সম্মেলন সকল পর্যায়ের মুরুব্ববীদের আনা হয়নি কেন? এখানে মুরুব্বী আলেমদের দু -চার জন থাকলে মানানসই হত। এত্ত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু তাতে আমাদের উচ্চ পর্যায়ের কোন মুরুব্বী নেই।
তিন. আন্দোলনে সফলতা পেতে সকল আলেমকে এক প্লাট- ফরমে নিয়ে আসুন। কাউকে বাদ রাখা যাবে না। অমুকের গায় গন্ধ, তমুকের গায়ে গন্ধ, এটা বন্ধ রাখা চাই। অন্তত এই সময়ে ওলামায়ে হকের ঐক্যবদ্ধ প্লাট- ফরম হওয়া চাই।
মুফতী ওয়াক্কাস সাহেব, মুফতী ফয়জুল্লাহ, আনাস মাদানী এরকম আরো যারা আছেন, তাদেরকেও নিয়ে আসতে হবে। তাদের ঠেলে ফেলে দেওয়া যাবে না। এতে কোনো লাভ নেই।
মুফতী ওয়াক্কাসের মত খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের এখানে থাকা খুবই জরুরি।
আমাদের দেশে অনেক বাঘা বাঘা মুফতী থাকতে, কিছু অখ্যাত লোক দিয়ে সাংবাদিক সন্মেলন জোরদার মনে হয় নি। দেওবন্দী সিলসিলার সকল আলেমকে ঐক্যবদ্ধ করা সময়ের দাবি। আর কারো সাথে কোন হিংসা রাখা যাবে না। অভিন্ন প্লাট- ফরম দেখতে চাই।
চার. নেতাদের উদারতা থাকতে হবে। কোন সংকীর্ণতা রাখা যাবে না। কিন্তু মামুনুল হক সাহেবদের মনে হয় এখনো কিছু ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা কাজ করে। এটা পরিত্যাগ করে, মনটা বড় করা জরুরি। নেতার মন থাকবে উদার। নানান জন নানান কথা বলবে। কিন্তু খোলামন থাকবে নেতার।
পাবলিক অনেক কিছু বলতে পারে, কিন্তু উদারতার সাথে সব সামাল দিতে হবে। এজন্য সব কিছু ভুলে হকপন্থী আলেমদের এক জায়গায় আনার চেষ্টা করুন। তবে বাতিলকে নয়। বাতিল থেকে দুরে থাকুন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট


