নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কথা বলে আসছেন অর্থমন্ত্রী। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি করপোরেট করে ছাড় দেয়ার ঘোষণাও এসেছে এরই মধ্যে। এসব বিবেচনায় নিয়েও ২০১৮-১৯ অর্থবছর চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আহরণের প্রাথমিক লক্ষ্য ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য কর রাজস্ব বাবদ এনবিআরকে ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা আহরণের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের বৈঠকে এ লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আহরণের এ লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার চেয়ে ৩০ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ কর রাজস্ব বাবদ ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য ঠিক করে এনবিআরকে খাতওয়ারি বিভাজনের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এরই মধ্যে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কে পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ভ্যাট থেকে। মূলত ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প সামনে রেখেই এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। রাজস্ব আহরণের এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হলেও আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাটের সব কার্যক্রম অনলাইনের আওতায় আনছে এনবিআর। ফলে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি অনেক কমে যাবে। অন্যদিকে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও বড় অংকের রাজস্ব আসবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ভ্যাট বাবদ রাজস্ব আহরণের প্রাথমিক লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছর ৮৩ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম নয় মাসে আহরণ হয়েছে ৫৫ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।
রাজস্ব আহরণে দ্বিতীয় বৃহৎ খাত হিসেবে আয়কর থেকে আহরণের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে এ খাতে ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি আয়কর, ভ্রমণ কর ও অন্যান্য কর আহরণ করতে হবে এনবিআরকে। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৪৩ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার আয়কর আহরণ করেছে এনবিআর। এ সময় পর্যন্ত আয়কর খাতে এনবিআরের প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
আমদানি-রফতানিতে আরোপিত শুল্ক থেকে রাজস্ব আহরণে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও খাতটি থেকে সবচেয়ে কম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য শুল্ক খাতে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এ খাতে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ শতাংশ।
উন্নয়ন অব্যাহত রাখতেই রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রা সাধারণত একটু বেশিই হওয়া উচিত। লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ বাস্তবায়ন হবে এমন কথাও নেই। সরকারের ব্যয়ের পরিকল্পনার আলোকেই আয়ের প্রাক্কলন করা হয়। অর্থবছর শেষে উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হয় না বলে টাকা থেকে যায়। ফলে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমলে অসুবিধা নেই। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে বাজেট ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরও হয়তো করা হবে।
এনবিআরের সক্ষমতা ও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে এ লক্ষ্যমাত্রাকে অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের মাধ্যমে ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা অবশ্যই অতি উচ্চাভিলাষী। রাজস্ব আহরণে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মতো সক্ষমতা এনবিআরের নেই। প্রতি বছরই বাজেটের সঙ্গে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায়ও বড় ধরনের কাটছাঁট দেখা যায়। আগামী অর্থবছরেও তা-ই করতে হবে।


