স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে

স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে

ধনধান্য । আব্দুল বাতিন বাবু

স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে

শিশুর জন্মের পর থেকে তিন মাস বয়স পর্যন্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সময়। দুই যুগ আগেও এ বয়সে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ববরণ বাংলাদেশের শিশুদের জন্য নিয়মিত ঘটনা ছিল। শুধু পোলিও নয়, এক সময় যক্ষা, হাম, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশির মতো রোগের কারণে বহু শিশুকে প্রাণ হারাতে হতো কিংবা প্রতিবন্ধী হয়ে জীবন কাটাতে হতো। কিন্তু সে দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না, বরং টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে অনেক সংক্রামক রোগই এখন বিলুপ্তির পথে। সরকারি হিসাবে গত ২৪ বছরে শিশুমৃত্যু কমেছে ৭৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা সর্বক্ষেত্রে আলোচিত। সীমিত সম্পদ দিয়ে কত অভূতপূর্ব কাজ করা যায়, বাংলাদেশ তা বিশ্বকে দেখিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ টিকার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছে। কারণ তারা রোগ প্রতিরোধ করতে চায়। বিশ্বে ৮০ শতাংশ মানুষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিছু টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বের উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বেশি। পোলিও ও হামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য।

সরকারের একান্ত প্রচেষ্টায় শহর, গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল সবাই জানে শিশুকে টিকা দিতে হবে। পত্রপত্রিকা এবং মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে টিকার দিন জানিয়ে দেয়া হয়। মায়েরা এখন নিজ উদ্যোগেই তাদের সন্তানকে নিয়ে টিকাকেন্দ্রে চলে আসেন। পরিকল্পিতভাবে সরকার এ কাজ করেছে বলেই মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে শিশুর মুক্তি মিলেছে। এর পেছনে রয়েছে বিশ্বসংস্থার সহায়তায় পরিচালিত সরকারের সফল টিকাদান কর্মসূচি। সফল এ কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কারে ভূষিত করেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক টিকাদান সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফল ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন’। এ পুরস্কার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল শিশুকে উৎসর্গ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আগামী দিনেও সফল হবে- আমাদের প্রত্যাশা ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সূত্র মতে, ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শুরু হয়। ১৯৮৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের পূর্ণ টিকা প্রাপ্তির হার ছিল মাত্র ২ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ৮৫ শতাংশ। শিশুকে মারাত্মক ১০টি রোগ থেকে রক্ষার জন্য টিকাদান কর্মসূচিতে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। শিশুর টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, রুবেলা, হিমোফাইলাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি, হেপাটাইটিস বি ও নিউমোনিয়াসহ শিশুদের ১০টি মারাত্মক রোগের টিকা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্র, অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের এই টিকাগুলো দেওয়া হয়। এরমধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনতে অতিরিক্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এ সকল টিমের সদস্যরা রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বিভিন্ন কারখানা, হাসপাতালে ভর্তি শিশু, জেলখানায় মায়েদের সঙ্গে অবস্থানরত শিশু, দুর্গম অঞ্চল, বস্তি এলাকায় শিশুদের খুঁজে টিকা দেয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইপিআই কর্মসূচির কর্মীরা ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবীরা দেশজুড়ে এ কাজে সহায়তা করেন।

সফল টিকাদান কর্মসূচির ফলে আরো কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের আরো কয়েকটি রোগও বিলুপ্তির পথে। বিশ্বের সব জায়গায় টিকাদানের ক্ষেত্রে ভালো অবস্থান থাকে শহর এলাকা। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে গ্রামের অবস্থা বেশি ভালো। সাফল্যকে শতভাগে নিয়ে আসতে সরকার শহরের পাশাপাশি চা বাগান, হাওড় এলাকা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে জোড় দিচ্ছে। এখন ভাবনার বিষয় অসংক্রামক রোগ, যাতে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। অসংক্রামক রোগ জীবাণুঘটিত নয়। ফলে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, এক্ষেত্রে টিকা অকার্যকর। কিন্ত কিছু অসংক্রামক রোগ টিকাদনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। জলাতঙ্ক রোগের জন্য হাতে বা পায়ে মাত্র চারবার টিকা নিতে হয়। সরকার বিনামূল্যে তা সরবরাহ করছে। টিকাদানের এসব তথ্য মানুষকে জানাতে হবে।

বর্তমান সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে, যেখানে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে স্বাস্থ্যখাতের অর্জনগুলো। এ সরকারের আমলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গতিশীল করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ নামে দুটি নতুন বিভাগ সৃষ্টি করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও মাঠ পর্যায়ে মা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাথমিক সেবা প্রদানে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বিগত এক দশকে। মাঠ পর্যায়ে ১২ হাজারের বেশি নারীকে Skilled Birth Attendent হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে; Midwifery সেবা জোরদার করতে ৩ হাজারের বেশি Midwife পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০০৭ সালে দেশে নারীপ্রতি গড় সন্তান গ্রহণের হার ২.৭ ছিল, যা বর্তমানে ২.২-এ নেমে এসেছে। শিশুমৃত্যু উল্লেযোগ্য হারে কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় চার বছর আগেই ২০১০ সালে সরকার সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৪ এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ Millenium Development Goal Award-এ পুরস্কৃত করেছে।

স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাপ্রসূত কমিউনিটি ক্লিনিক বিরাট ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৮৮২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধমে সারা দেশের গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ সেবাগ্রহীতা সেবা গ্রহণ করেছেন। ক্লিনিকসমূহে সেবা গ্রহীতাদের ৮৫ ভাগ প্রাপ্ত সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বিগত কয়েক বছরে দেশে ৬ হাজারের বেশি চিকিৎসক, ৪২৭ জন ডেন্টাল সার্জন ও ১০ হাজারের বেশি নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজার চিকিৎসক ও ৪ হাজার নার্সের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধিতে ও গবেষণা কাজে লাগানোর লক্ষ্যে দক্ষ চিকিৎসা পেশাজীবী সৃষ্টি এবং চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব পূরণ করতে বিগত এক দশকে দেশে তিনটি নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১০৭টি সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এবং একটি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য আসন বৃদ্ধি, নতুন কোর্স চালুকরণ, নার্সিং বিষয়ে পিএইচডি ও মাস্টার্স প্রশিক্ষণ, বিএসসি নার্সিংয়ের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স চালুকরণসহ দক্ষ জনবল তৈরিতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে স্বাস্থ্য খাতেও ডিজিটালাইজেশন শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক তথ্য জাতীয় স্বাস্থ্য তথ্যভা-ারে জমা করছেন উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে। দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ ১৬২৬৩ সার্বক্ষণিক কল সেন্টারের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে যে কোনো মানুষ যে কোনো সময়ে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য জানতে পারছে।

ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারছে। এসবই সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী চিন্তার সফল বাস্তবায়নে কারণে। প্রয়োজন শুধু আমাদের সচেতনতা এবং উন্নত দেশ গড়তে সরকারের পাশে থাকা।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *