হকের উপর প্রতিষ্ঠিত সংগ্রামী এক নাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
মওলানা আমিনুল ইসলাম : আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাঃবাঃ), একটি নাম, একটি সংগ্রাম। একজন বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন। দারুল উলুম দেওবন্দের এক সূর্য সন্তান। যিনি দেওবন্দীয়্যাতের উপর অটল অবিচল আছেন সব-সময়। যিনি হক্ব-হক্কানিয়্যাতের পতাকাবাহী মিছিলের অগ্রসেনা।
এই মহান ব্যক্তি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত সংগ্রামী এক ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। বাতিলের সাথে তিনি আজীবন আপোসহীন। হক্বের পথে চলতে সারা দুনিয়ার মানুষ একদিকে চলেও যদি যায়— তবুও তিনি একাই হক্বের উপর অনড়-অবিচল থাকার চেষ্টা করে যান। যার জন্য তাঁকে বহু কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। এবং অবুঝ মানুষগুলো বারংবার ভুল বুঝে বহু কষ্ট-ক্লেশ এ জর্জরিত করে সেই মহান আলেমে দ্বীনকে। তারপরেও তিনি তাঁর নীতি আদর্শের উপর অবিচল, অটুট।
বহু ঝড় -ঝঞ্জা উপেক্ষা করে তিনি তবুও এগিয়ে চলেছেন সম্মুখ পানে। এ দেশকে, এ জাতিকে, এ দেশের আলেম-সমাজকে সঠিক রাস্তায় চলার মিশন নিয়ে তিনি ক্লান্তহীনভাবে কাজ করে চলেছেন।
এ কথা স্পষ্টভাবে বলা যায়— যে যাই বলুক না কেন, আল্লামা মাসঊদ কিন্তু বসে নেই। বিশেষ করে এ দেশের আলেম-সমাজকে বাতিলের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করে সঠিক রাস্তায় চলার জন্য সবচেয়ে বেশী কাজ করে যাচ্ছেন তিনি, নিবিষ্টচিত্তে।
আমাদের এই দেশে আলেম-সমাজের মধ্যে ছিল সবচেয়ে বেশী বিভক্তি। আরও বড় কথা হল, কিছু আলেম তো বাতিল শক্তির করায়ত্বে ছিল বহুকাল ধরে। আর এই কারণে ওলামায়ে কেরাম বাতিল শক্তির কাছে নমনীয় হয়ে পড়েছিলেন। কথা বলার শক্তি সাহস যেন তেমন কারো ছিল না। সারাদেশে হক আর বাতিলের তারতম্য করার মানসিকতাও যেন আলেম-সমাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন! কিন্তু আল্লামা মাসঊদ সাহেব কখনো বাতিল শক্তির সাথে আপোস করেননি। শত বাঁধা বিপত্তির সামনে তিনি থেকেছেন হক্ক-হক্কানিয়্যাতের উপর অটল।
একবার তো এই মহান ব্যক্তিকে জালিমের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু বিন্দু মাত্র তাঁকে হক্বের উপর থেকে হটানো যায়নি। জালিমের কাঠগোড়ায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হক্বের আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে। অনেক ষড়যন্ত্র করেও ওরা তাঁকে আর বন্দী রাখতে পারেনি। ফলে, তিনি নির্দোষ হয়ে বেরিয়ে এলেন আমাদের মাঝে।
দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে এ দেশের আলেম-সমাজ যখন জঙ্গীবাদের তকমায় জর্জরিত হয়ে ওঠেন; যখন আলেমদের ‘জঙ্গি’ বলে গালি দেওয়া হত; মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র বলে ধোঁয়া তুলত— ঠিক সেই সময়ে আল্লামা মাসঊদের নিবিড় পরিশ্রমের ফল ‘এক লক্ষ আলেমের ফতোয়া’ জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আল্লামা মাসঊদের সাহসী ভূমিকা, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠাতে— যেন এ দেশের নেতৃস্থানীয় মানুষের হৃদয়ে আমূল পরিবর্তন আসে। ফলে, সত্যিকার জঙ্গি কারা সেটা বুঝতে সক্ষম হয়, এ দেশের ক্ষমতাসীন দল থেকে নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ।
এর ফলোশ্রুতিতে, যারা এক সময় কওমী মাদ্রাসাকে জঙ্গিবাদের আস্তানা বলে আখ্যা দিত, তাদের মুখ থেকে ফের বের হল, কওমী মাদ্রাসা জঙ্গিবাদের আস্তানা নয়।
আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি, কেন আবার ঘুরে গেল তাদের জবান? কেন আবার কওমী মাদ্রাসার সন্তানদের সোনার ছেলে বলা হচ্ছে? আমরা কেউ এটা চিন্তাও করি না। ভেবেও দেখি না…।
অথচ তিনিই সব-সময় আলেমদের ইজ্জত-আব্রু হেফাজতের মিশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এবং বিজ্ঞমহলকে ভুল ভাঙাতে সক্ষম হয়েছেন।
এই কওমী সনদের স্বীকৃতির জন্য তিনি কত মেহনত করেছেন, সেটাও আমাদের অজানা। এই কওমী মাদ্রাসাগুলোকে অবহেলা করা হত সারাজীবন।
তাদের কেউ যথার্থ সন্মান দেয়নি। কত সরকার এলো আর গেল, কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। আল্লামা মাসঊদ ইস্পাতের ন্যায় অবিচল ছিলেন, হতেই হবে কওমী সনদ। শেষমেষ কিন্তু স্বীকৃতির মুখ দেখল কওমী সনদ। এর জন্য পরতে-পরতে অবদান রেখেছেন তিনি। নিজেকে মিটিয়ে দিয়ে বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যার ফলে সফলতার মুখ দেখা গিয়েছে।
এভাবে দেশ ও দশের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন তিনি। মানুষ ভুল বুঝে বা গোমরাহীরা হিংসায় পড়ে যা-ই বলুক, তিনি কিন্তু অবিসংবাদিত এক ব্যক্তিত্ব। আর হক্বের উপর এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি আজ নন্দিত হয়েছেন সব জায়গায়। যদিও এক শ্রেণীর মানুষ তাঁকে না-বুঝেই দুষ্কৃতকারীদের ধোঁকায় পড়ে নিন্দা করে। অথচ তিনি এখন আমাদের দেশ পেরিয়ে বিশ্বভূবনে পরিচিতি লাভ করেছেন এবং ক্রমেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি সারা মুসলিম জাহানে নন্দিত মুসলিম-ব্যক্তিত্ব।
এ জন্য ভাই বন্ধু, বুঝতে হবে আমাদের। তাঁকে গালি দেওয়ার আগে চিন্তা করতে হবে। তাঁর সস্পর্কে জানতে হবে। তাঁর অবদান সস্পর্কে অবহিত হতে হবে। কোনো গুজবে কান দেওয়া নয়। একজন একটা বিষয়ে তাঁর ব্যাপারে গুজব রটালো, সেটা আমাদের অবশ্যই তাহকিক করা জরুরী। অর্থাৎ, অপপ্রচার ও প্রতারণার ফাঁদে পা না-দিয়ে অবশ্যই আমাদের যাচাই-বাছাই করতে হবে— প্রকৃত ঘটনা আসলে কী?
আমাদের আজ এই সুন্দর অবস্থান, কওমী মাদ্রাসা ও আলেম সমাজের এই সন্মান ইজ্জত, কাঁদের মেহনতের ফসল? সেটা কিন্তু ভাববার বিষয়। কাঁদের ওছিলায় আমাদের এই শান্তিপুর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠেছে, সেটাও আমাদের বোঝার বিষয়।
সবশেষে এই মহান আলেমে দ্বীনের জন্য সার্বিকভাবে কল্যাণ কামনা করি। আল্লাহতা’য়ালা তাঁকে নেক হায়াৎ দান করুন। দুনিয়া আখেরাতে কামিয়াব করুন। আমীন।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
মতামত একান্তই লেখকের, এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়


