গযওয়া উহুদ । পর্ব-৪

গযওয়া উহুদ । পর্ব-৪

মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ও তার অনুসারীদের বিশ্বাসঘাতকতা

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাহিনীসহ মদীনার লাগোয়া ‘আল শাওত’ নামক উদ্যানে পৌঁছলেন

মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর ষড়যন্ত তো আগে থেকেই ছিল, সে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর নানা ফন্দী খুঁজছিল। এখানে এসে সে বেঁকে বসল। অজুহাত তুলল, কিছু ছেলেবয়সীদের কথা মানা হল, যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই যাদের। পক্ষান্তরে আমার পরামর্শ ছুড়ে ফেলে দেওয়া হল। এখানে কেন খামখা আমাদের জান দিব জানি না, এ তো নিশ্চিত অথেই মৃত্যু

আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর অনুসারীরা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। উটপাখির ন্যায় এরা পেছন ফিরে দ্রুত ভাগল। এরা সংখ্যায় ছিল তিনশো। সমগ্র বাহিনীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম রা. তাদের পেছন পেছন গেলেন। চিৎকার করে বললেন, হে আমার কওম, আল্লাহর দোহাই! নিজ কওম ও জাতিকে এবং আল্লাহর নবীকে আজ দুশমনদের সামনে বেইজ্জত করো না। হে আমার কওম, তোমরা ফিরে আসো। আল্লাহর পথে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হও। দুশমনদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোল। এরা বলল, যুদ্ধ বলে কিছু বুঝতাম তবে তো ছেড়ে আসতাম না। কোনো যুদ্ধ হবে বলে আমরা ধারণা করছি না। এ তো অসহায় আত্মসমর্পণ, তুমিও আমাদের সঙ্গে চলে আসো

এদের বিষয়ে হতাশ হয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহর দুশমনদের আল্লাহ দূরেই রাখুন। আল্লাহ নিজেই তাঁর নবীর জন্য যথেষ্ট। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক নাযিল করেন,

وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا ۚ وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا ۖ قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّاتَّبَعْنَاكُمْ ۗ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ ۚ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ ۗ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ

এবং মুনাফিকদের জানার জন্য; আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, আসো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা প্রতিরোধ করো। তারা বলেছিল, যদি যুদ্ধ জানতাম তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম। সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই, তারা তা মুখে বলে; তারা যা গোপন রাখে আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবহিত

আরও নাযিল হয়,

مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَىٰ مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىٰ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ

অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছো, আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না

আবদুল্লাহ ইবন উবাইর চক্রান্ত ছিল যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ালে অন্যান্যদের মাঝেও দুর্বলতা ও ভীতি দেখা দিবে, ফলে তারাও সরে দাঁড়াবে। তাই মদীনায় থাকতে সে সরে দাঁড়ায়নি। ইবন উবাই-এর এই শয়তানী কৌশলের বাস্তবেও কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেল। বনু সালিমা ও বনু হারিছা, আনসারীদের এই দুই উপগোত্রের লোকেরাও আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর দেখাদেখি সরে দাঁড়াতে উদ্যত হল। কিন্তু আল্লাহ পাকের কাছ মেহেরবানী, তাঁদের চিত্ত দৃঢ় হয় এবং তাঁরা তাঁদের সংকল্প ত্যাগ করে মূলধারার সঙ্গে থেকে যান। তাঁদের শানে আল্লাহ পাক নাযিল করেন,

إِذْ هَمَّت طَّائِفَتَانِ مِنكُمْ أَن تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا ۗ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ

যখন তোমাদের মধ্য হতে দুই দলের সাহস হারানোর উপক্রম হয়েছিল। আল্লাহ তাদের অভিভাবক ও বন্ধু, আর আল্লাহর প্রতিই যেন মুমিনরা নির্ভর করে

হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ রা. এই গোত্রের ছিলেন। তিনি বলতেন, এই আয়াতটি আমাদের বিষয়ে নাযিল হয়েছে। যদিও এতে আমাদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও আমি চাইনা যে, এটি যদি নাযিল না হত তবে ভাল হত। কেননা আমাদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে আল্লাহ পাক একথাও বলেছেন, وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا—‘আল্লাহ এই দুই গোত্রের অভিভাবক ও বন্ধু।’ আল্লাহ যখন অভিভাবক ও বন্ধু তখন এর চেয়ে বড় আর কী মহিমা হতে পারে?

যারা যুদ্ধের মাঝপথ থেকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে পিঠটান দিয়েছিল, আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর এই গোষ্ঠীটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহাবীগণের মাঝে মৃদু মতানৈক্য দেখা দেয়, একদল বলছিলেন এদেরকে এই অপরাধে হত্যা করা উচিত। আরেকদল বলছিলেন, দৃশ্যত এরা মুসলিম তাই হত্যা করা ঠিক হবে না। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক নাযিল করেন,

فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُوا ۚ أَتُرِيدُونَ أَن تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ ۖ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا

তোমাদের কী হল যে, তোমরা মুনাফিকদের বিষয়ে দুই দল হয়ে গেলে, যখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পূর্বের অবস্থায় (কুফরীর দিকে) ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তোমরা কি তাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাও? আর আল্লাহ কাউকে পথভ্রষ্ট করলে তুমি তার জন্য কখনও কোনো পথ পাবে না

ইয়াহূদীদের সাহায্য নিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অস্বীকৃতি

ইবন উবাই-এর নেতৃত্বে সেনাদল থেকে এক-তৃতীয়াংশের সরে পড়ায় স্বভাবতই লোকবলের দিক থেকে কিছুটা দুর্বলতা দেখা দেয়। এতদপ্রেক্ষিতে আনসারী সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, অনুমতি হলে আমরা চুক্তিবদ্ধ ইয়াহূদী বন্ধুদের সাহায্য নিই? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এদের সাহায্যের দরকার নেই

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষণ

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মাত্র সাতশো জন যোদ্ধা বাকী রইলেন। এদের মাঝে মাত্র দুইজন ছিলেন অশ্বারোহী। একজন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে, আরেকজন ছিলেন হযরত আবু বুরদা রা.। মাত্র একশো ছিলেন বর্ম পরিহিত। মোট যোদ্ধার সংখ্যা ছিল সাতশো

রাত হয়ে গিয়েছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গীদের নিয়ে রাত্রিযাপন করেন। মুহাম্মদ ইবন মাসলামা রা. পাহারায় ছিলেন। উহুদের নিকটবর্তী এক গিরি-উপত্যকায় তিনি সকলকে নিয়ে ফজর নামায আদায় করলেন। মুশরিক বাহিনীকে তখন দেখা যাচ্ছিল

নামাযের পর তিনি এক ভাষণ দেন। এতে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। জিহাদে ধৈর্য ধারণ এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে উৎসাহিত করেন। মুসলিম ও অমুসলিম সকলের সঙ্গে সদ্ব্যবহারে উৎসাহ দেন। ইরশাদ করেন, তাকদীরে নির্ধারিত বিষয় ঘটবেই, এর জন্য বিচলিত হওয়ার দরকার নেই এবং হারাম পথে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। মুসলিমরা এক দেহের মতো, একস্থানে আঘাত হলে সবখানেই আঘাত অনুভূত হয়

মুসলিম বাহিনীর ব্যূহ রচনা

এর পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ পাহাড়কে পশ্চাতে রেখে মদীনা শরীফকে সামনে রেখে মুসলিম বাহিনী কাতারবন্দি করেন। উহুদের একটা শাখা ‘আয়নাইন’-কে রাখলেন বাঁয়ে; দুটো পানির ধারা প্রবাহিত ছিল বলে এই স্থানটিকে ‘আয়নাইন’ বলা হত। এর পেছনে ছিল একটি গিরিপথ। শত্রুরা যেন পেছনদিক থেকে হামলা না করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে বিখ্যাত তীরন্দাজ হযরত আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র রা. এর নেতৃত্বে পঞ্চাশ জন তীরন্দাজের একটা দল আয়নাইনে স্থাপন করেন। তাঁদেরকে কঠোর নির্দেশ দেন, পেছনের দিক থেকে যেন কোনো আক্রমণ না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখবে

কোনো অবস্থাতেই এখান থেকে সরবে না। আমাদেরকে জয়ী হতে দেখলেও গণিমত সম্পদ সংগ্রহে শরীক হতে যাবে না। আর মুশরিক বাহিনীর হাতে আমাদেরকে বিপর্যস্ত হতে যদি দেখো, তবুও সরবে না। আমাদের সাহায্যে আসার দরকার নেই। এমনকি পাখি যদি আমাদের ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে দেখো, তবুও এ স্থান থেকে নড়বে না। তোমরা এখানে স্থির ও অবিচল থাকলে আমরাই জয়ী হব। হে আল্লাহ, আমি তোমাকেই এদের বিষয়ে সাক্ষী মানছি

হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম রা. এর নেতৃত্বে ছিল মুজাহিদ দলের বাম বাহু আর অপরপার্শ্ব ছিল মুনযির ইবন ‘উমর আল গনাবী রা. এর নেতৃত্বে। পতাকা দিলেন হযরত মুসআব ইবন ‘উমায়রের হাতে। উপত্যকার পূর্বপ্রান্তে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ছাউনি স্থাপন করা হল

মুসলিম বাহিনী প্রস্তুতি নিয়ে ব্যূহ রচনা করে দাঁড়াল। মুসলিম বাহিনীর তিনদিকেই ছিল পাহাড় আর দুর্গম চলাচলের অনুপযোগী প্রস্তরাকীর্ণ প্রান্তর। কেবল সম্মুখ ভাগই ছিল খোলা এবং শত্রুর মুখোমুখি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করবে না। ওদেরকে আগে আক্রমণ করতে দাও

কুরাইশ বাহিনীর প্রস্তুতি

কুরাইশরা চিন্তাও করতে পারেনি যে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোপনে পেছনে এসে ব্যূহ রচনা করবেন। তারা ভেবেছিল, তিনি যেহেতু মদীনা থেকে আসবেন আর মদীনা হল উহুদ থেকে দক্ষিণে, তাই তারা দক্ষিণমুখী হয়ে উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে বি’রে রওয়াহর পাদদেশে অবস্থিত উপত্যকায় অবস্থান নেয়। তাদের চতুর্দিক ছিল খোলা। তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষিপ্রতা ও বিচক্ষণতায় হতভম্ব হয়ে পড়ে। এক্ষণে মদীনাকে পেছনে রেখে উত্তরমুখী হয়ে ব্যূহ রচনা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। এরা ছিল সংখ্যায় তিন হাজার। এর মধ্যে দু’শো ছিল অশ্বারোহী, সাতশো ছিল বর্মধারী, উট ছিল তিন হাজার

বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত মহিলাও ছিল তাদের সঙ্গী। এদের মধ্যে আবু সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দাও ছিল। আবু জাহলের পুত্র ইকরিমার স্ত্রী উম্মু হাকীম, হারিছ ইবন হিশামের স্ত্রী ফাতিমা, আমুর ইবনুল আস-এর স্ত্রী রীতা, মুসলিম বাহিনীর পতাকাবরদার মুসআব ইবন ‘উমায়রের মা খুনাস, সফওয়ান ইবন উমাইয়ার স্ত্রী বরযা, তালহা ইবন আবী তালহার স্ত্রী সুলাফা উল্লেখযোগ্য। খুনাস ছাড়া বাকী সকলেই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন

কুরাইশ বাহিনীর ডান বাহুর উষ্ট্র ও অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল খালিদ ইবনুল ওলীদ, বাম বাহুর অনুরূপ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আবু জাহল পুত্র ইকরিমা। মূল পদাতিক বাহিনী ছিল সফওয়ান ইবন উমাইয়া এবং তীরন্দাজ বাহিনী ছিল আবদুল্লাহ ইবন আবী রবীআর নেতৃত্বে। পতাকা ছিল তালহা ইবন আবী তালহার হাতে। তালহা ছাড়া পরবর্তীতে এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন

চলমান………………………

Related Articles