সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ : এটাই ইতিহাস। তিনি কাজ শুরু করেন। পরে অন্যরা সে পথে হাঁটেন। তিনি গাছ লাগান, অন্যরা ফল ভোগ করেন পরম তৃপ্তির সাথে। তিনি যা কয়েক বছর আগে চিন্তা করেন, তার বিরোধিতাকারীরা সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে সে কাজেই ঝাঁপ দেন নিঃসংকোচে একটা সময় পর। তিনি যা আগে বুঝেন, অন্যরা বুঝেন ঠিকই তবে তা কয়েক বছর পরে।
তিনি কাজ শুরু করেন আর আবেগী, হুজুগী মৌলবীর দল তখন বুঝে না বুঝে তার কাজের বিরোধীতা করাকেই কাজ মনে করেন। কিছুদিন পর সেই বিরোধীতাকারীরা আবার তার দেখানো পথেই চলতে থাকেন। তার কাজটা শত বাঁধা প্রতিকূলতা আর সমালোচনা ডিঙ্গিয়ে সফলভাবে হয়ে গেলে, এর ফায়দা লুটতে জমহুরদের তখন পিছে থাকতে দেখা যায় না আর।
বলছিলাম, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা.-এর কথা। তিনি যখন ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়, দেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেন। তখন মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধীতাকারী আলেমের সংখ্যা এদেশে জমহুরই ছিল। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার পর আলেমরা জমহুরিয়াতের ভুল বুঝতে পারলেন। যদিও সংখ্যাটি তখন খুবই কম ছিল। পরে তিনি এ নিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তুললেন আলেম সমাজ যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পর রাজধানীর অধিকাংশ মাদরাসা-মসজিদ যখন বন্ধ ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমরা তো মুক্তযুদ্ধ করেছি। পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, জিতেছি। তাহলে মাদরাসা বন্ধ হয়ে থাকবে কেন? মসজিদে আজান হবে না কেন? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মসজিদে আজান দিন, মাদরাসার দরজা আপনারা খুলে দিন। আমরা মুসলমান। হযরত কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. ও আল্লামা ফরীদ মাস্ঊদ তখন পায়ে হেঁটে হেঁটে আলেমদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। মসজিদ ও মাদরাসার দরজা খুলে দেন। এই সত্যাসত্য গল্পের পরতে পরতে আছে আল্লামা মাসঊদের অবদান। বাংলার জমহুর আলেম সমাজকে ঘুরে দাঁড়াতে একজন সিপাহসালার ছিলেন আল্লামা মাসঊদ।
পরে বলি, আপনারা তো পারলেন না আপনাদের বিএনপি-জামায়াত জোটের মাধ্যমে কওমী সনদের স্বীকৃতি আনতে। অথচ তাদের পক্ষে একদা ঐক্য কায়েম করেছিলেন আপনারা। জামায়াত-বিএনপি ঘরনার আলেমগন চেয়েছিলেন কখনো আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সনদের সরকারী স্বীকৃতি আনবেন না। এই স্বীকৃতির জন্য শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক জোটে থেকেও জোট সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে লাগাতার কয়েকদিন অনশন করলেন, তবুও কাজ হলো না। জমহুররা তখন জোট সরকারকে দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন কেন বিজ্ঞাপনও জারি করতে পারেননি। সেসব ইতিহাস কি এত দ্রুতই ভুলে গেলেন? আসলে ওরা তো কেবল মূলা ঝুলিয়ে জমহুর আলেমদেরকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করেছিল। শেষ পর্যন্ত শায়খুল হাদিস রহ. জোট থেকে বেরিয়ে কওমীর সনদের স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের চুক্তিতে আওয়ামী লীগের সাথে জোট করতে বাধ্য হলেন। যদিও সেই জোট দীর্ঘস্থায়ী থাকেনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনি কৌশলের কারণে।
পরে আল্লামা মাসঊদ যখন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দাওয়াত দিয়ে এনে কওমি সনদের জোড় দাবী জানালেন। তখন কওমির সেই জমহুর আলেমদের পক্ষ থেকে বৃবিতি এল, “স্বীকৃতি দিলে লাখ লাখ লাশ পরবে।” অবশ্য এতে আল্লামা মাসঊদ পিছপা হননি। স্বজাতির কাছ থেকে এমন বাঁধা তিনি সর্বদাই অতিক্রম করেছেন। তাই আপনাদের জমহুরিয়তের ঠুনকো হুংকারকে পরোয়া না করে আল্লামা মাসউদ তার কাজ শুরু করলেন। পরে হল কী! আপনারা ঠিকই অর্থাৎ যারা বিরোধী ছিলেন তারাই আবার তার সাথে, তার দেখানো পথে গনভবনে সদলবলে গেলেন, খেয়ে দেয়ে, হেসে মেতে কওমি সনদের সরকারী স্বীকৃতি নিয়ে এলেন। এখন সেই ফল ভোগে আপনারা জমহুররাই আনন্দ মিছিল করেন রাজপথে। মধ্যখানে খামাকা তাঁর বিরোধীতা করে আবোল তাবোল পাগলের প্রলাপের মতো দালাল দালাল বলে তাকে গালাগালি করে নিজের ঈমান আমলের ক্ষতি করলেন।
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে যে যাই বলুন, তিনি একজন প্রাজ্ঞ আলেম। এটা তো আপনারা সবাই মানছেনই। তার চিন্তার ধারে কাছে এদেশে বিচক্ষন আরেকজন আলেম নেই তার মত। এও বলেন আপনারাই। তাই তাকে কখনো পরাজিত হতে হয় নি। তিনি যখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একলাখ আলেমের ফতোয়া নিয়েছেন তখন এই জমহুর আলেমরাই তাকে দালাল বলে চিহ্নিত করেছেন। গুলশানের ঘটনার পর সবাই স্বীকার করেছেন, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ যদি একলাখ আলেমের ফতোয়া না নিতেন তবে সম্পূর্ণ দোষ প্রথমেই চলে আসতো মাদরাসাগুলোর উপরে। তিনি জঙ্গিবাদের তকমা থেকে এবং কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে দেশি বিদেশিদের চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তার সংগৃহিত এ ফতোয়ার কারেণই সরকারের উচ্চ মহল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন ‘কওমি মাদরাসয় জঙ্গি নেই’ একথা বলতে বাধ্য হয়েছে। পরে অাবার আপনারা আপনাদের কাজ করলেন। কী করলেন! যে জঙ্গিবাদ বিরোধী ফতোয়ার জন্য আল্লামা মাসঊদকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলেন, সেই আপনারাই কিছুদিন পর বেফাক আর হেফাজতের পক্ষ থেকে তার দেখানো পথেই জঙ্গিবাদ বিরোধী মানববন্ধন, সভা, সমাবেশ, মিছিল করলেন। শেষে বুঝেছেন। তবে একটু পরে, জল ঘোলা করে।
শাপলা চত্তরে যেদিন হেফাজতের সমাবেশ। সেদিন হেফাজতের তের দফায় জামাত কানেকশনের অভিযোগে আল্লামা মাসউদ তের দফার সঙ্গে জামায়াত বিরোধীতার কথা উল্লেখ করে তাদের সতর্ক করেছিলেন। ফলাফলে তারা আল্লামা মাসঊদকে বানাল হেফাজত বিরোধী। পরে শাপলার ক্রাকডাউনের পর হেফাজত নেতাদের আন্ডারগ্রাউন্ড লেনদেনের পাল্টা পাল্টি বক্তব্য কিন্তু ঠিকই বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসে জামায়াত-বিএনপি কিভাবে কিছু মোনাফেকদের ব্যবহার করেছিল সেদিনের সমাবেশ। জমহুর আলেমদের ব্যবহার করে হেফাজতের লাশের সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় যেতে চেয়ছিল এই স্বাধীনতা বিরোধীরা । অথচ, হেফাজতের উপর সারা দেশে হাজার হাজার মামলা আজ আল্লামা মাসঊদের প্রচেষ্টাতেই নিস্ক্রিয়। এ কথা স্বীকার না করলেও কোনও সমস্যা নেই। ইতিহাস এটাই। এটা সংরক্ষিত থাকবে।
আল্লামা আহমদ শফি দা.বা. শাপলা চত্বরের ঘটনার পরে জামায়াত-বিএনপি জোটের খপ্পর থেকে তার পরামর্শে বেরিয়ে এদেশের অসংখ্য মাদরাসাকে যেভাবে রক্ষা করেছিলেন, তেমনি আল্লামা মাসঊদ সর্বদা জাতীর অতন্দ্র প্রহরীর হয়ে হাজারো বিরোধীতার স্লাইকোনের মোকাবেলায় রক্ষা করেছেন আলেম, উলামা এবং মাদরাসাগুলোকে।
সৈয়দ মবনু ভাইয়ের ভাষায়, ”মাওলানা মাসঊদের মধ্যে আমি দেখি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিচক্ষনতা ও যোগ্যতা”। মাওলানা আজাদকে নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকার পরও এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি ভারতের জন্য যে শিক্ষানীতি ও পদ্ধতি চালু করেছিলেন তা গোটা ভারতবর্ষের কোন দেশ’ই আজ পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারেনি। আমার বিশ্বাস! মাওলানা মাসঊদ কওমী মাদরাসার জন্য এমন একটি সিলেবাস তৈরির যোগ্যতা রাখেন যার মধ্যে ঈমান-আকিদা যেমন পূর্ণাঙ্গরূপে থাকবে, তেমনি থাকবে দুনিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা।
এভাবেই আল্লামা মাসঊদের দেখানো পথেই বাংলাদেশের জমহুর আলেমরা বারবর হেঁটেছেন বা হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। সামনেও আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ এর নেতৃত্বে আসন্ন ঐতিহাসিক পথযাত্রার সুফল ভোগ করবেন আাগামি দিনের জমহুররা। ইনশাআল্লাহ।

