সাল্লু আলাইহি ওয়ালিহি
আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ ❑ সেদিন ইউটিউবে হযরত খাদিজা রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহার রওজা মোবারকের ভিডিও দেখছিলাম। মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় তাঁর কবর। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলে নেই। ইসলামের গ্রহণের আগেই পবিত্র চরিত্রের জন্য তাহিরা উপাধি লাভ করেন; যার অর্থ পবিত্র। ইসলাম ধর্মে হযরত খাদিজা রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহার মর্যাদা অন্যান্য মহিলাদের চেয়ে অনেক উপরে। তিনি প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী ব্যক্তি। হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে প্রথম নামায তিনিই পড়েছিলেন। বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বলা হয়েছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহিলা হলো, মরিয়ম বিনতে ইমরান ও খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ। হযরত মা খাদিজা রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহা সম্পর্কে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে, তখন সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। সবাই যখন কাফির (অবিশ্বাসী) ছিলো, তখন সে ছিলো মুসলিম। কেউ যখন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসে নি, তখন সে আমাকে সাহায্য করেছে। এতো মহান একজন মানুষ ছিলেন হযরত খাদিজা রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহা।’
হযরত মা খাদিজা রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহার মাকবারার ভিডিও শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নেক্সট ভিডিও হিসেবে আসলো হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুর বাড়ি। এখন সেখানে একটা মসজিদ নির্মিত হয়েছে, মসজিদে আবু বকর। হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু কে ছিলেন তার ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু একদিন হযরত আবু বকরকে অফার করেছিলেন যে, আমার সারাজীবনের ইবাদত আপনাকে দিয়ে দিবো আপনি শুধুমাত্র আপনার একটা রাতের ইবাদত আমার সাথে বিনিময় করেন। সেই আমলটা হচ্ছে মক্কা থেকে মদিনায় নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হিজরত করার সময় গুহার ভিতরে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে যে রাতটা কাটিয়েছিলেন সেই রাতের ইবাদত আমার সাথে বিনিময় করেন। এই হচ্ছেন সেই আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু। ওমর ফারুক রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর একজন। এতো বড় বুজুর্গ সুতরাং তাঁর আমলের পরিমাণ তো অনেক তারপরেও তিনি শুধুমাত্র একটা রাতের আমল বিনিময় করতে চেয়েছেন হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুর সাথে। আল্লাহ পাক তাঁর কবরকে সুখময় করুন এবং তার বিনিময়ে আমাদেরকেও আল্লাহ পাক কবুল করুন।
এত্তো ভালো লাগলো এত্তো প্রশান্তি হলো যা বলার বাহিরে। বান্দা যতই নাপাক হোক, গান্দা হোক আল্লাহর কাছে সে অনেক অনেক প্রিয়।
এরপরের ভিডিও হিসেবে আসলো রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাহ যে জায়গাটায় অবস্থিত সেখানের ভিডিও। এই ভিডিওটা আমি আর দেখলাম না। মনে মনে আল্লাহকে বললাম, আল্লাহ তুমি সাক্ষী, এই ভিডিওটা দেখার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও দেখলাম না তুমি আমারে এই জায়গাটা স্বচক্ষে দেখাবা এই আশায় এই উছিলায়। তখন কেন জানি মনে হলো আল্লাহ আমার কাছে এসে আমার এই মনের আকুতিটা শুনেছেন। আল্লাহকে তখন অনেক নিকটে মনে হলো। এত্তো ভালো লাগলো এত্তো প্রশান্তি হলো যা বলার বাহিরে। বান্দা যতই নাপাক হোক, গান্দা হোক আল্লাহর কাছে সে অনেক অনেক প্রিয়।
আল্লাহর কাছে কালো সাদার কোনই পার্থক্য নেই। সবাই তার কাছে সমান। শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ কত বৈষম্য পৃথিবীতে আমরা তৈরি করেছি কিন্তু আল্লাহর কাছে কোন বৈষম্য নেই। এই বৈষম্য আল্লাহ পাক খুবই ঘৃণা করেন। বান্দার দুই ফোটা চোখের পানি আল্লাহর কাছে প্রিয়। কুফার একজন মন্দ মানুষ ছিলো। চুরি ডাকাতি সহ অনেক খারাপ কাজ করতো। জারাদ ছিলো তার নাম। মানুষ তার প্রতি এতোই বিরক্তি ছিলো যে, সে যেদিন মারা গেলো সেদিন মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, যাক, খারাপ মানুষটা এতোদিনে মারা গেলো। ঘটনাচক্রে তখন হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু কুফায়, তিনিও মন্দ মানুষ জারাদের জানাজায় শরীক ছিলেন। সবাই যখন দাফন (মাটি) দিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন জারাদের মা এসে ছেলেকে দেখতে চাইলো। ছেলের মৃত্যুর সময় সে অন্য শহরে ছিলো যার কারণে সে যথাসময়ে আসতে পারেনি। মাটি দেয়ার পরে লাশ দেখানোর তো নিয়ম নেই সুতরাং কেউ রাজি হলো না লাশ দেখাতে। তখন তার মা চালাকি করে হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুকে ধরলেন। তিনি নরম কোমল হৃদয়ের মানুষ সুতরাং তার চালাকিটা কাজে লাগলো। বৃদ্ধ মায়ের আকুতি নরম দিলের খলীফা ফেলতে পারলেন না। খলীফার হুকুমে মন্দ মানুষ জারাদের লাশ উত্তোলন করা হলো। কিন্তু একি, মন্দ মানুষটার কবর ফুলে ফুলে সজ্জিত। সুঘ্রাণ বের হচ্ছে কবর থেকে। সবাই অবাক হলো। আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুও অবাক হলেন। কবর আবার বন্ধ করে দেওয়া হলো। রাতে হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলেন। নবিজির পাশে সেই মন্দ মানুষটা বসে আছে। তখন নবিজি আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুকে সম্বোধন করে বললেন, আবু বকর, নিশ্চয় তুমি অবাক হয়েছো। কিন্তু মন্দ জারাদ প্রত্যেকদিন চুরি ডাকাতি করে রাত্রেবেলা পাহারের চূড়ায় উঠে আল্লাহ পাকের কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতো। পরেরদিন আবার সে খারাপ কাজ করতো। আবার পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আল্লাহ পাকের কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করতো। আল্লাহর সাথে কথা বলতো। তার এই দোয়া কান্নাকাটি আল্লাহর কাছে ভীষণ প্রিয় ছিলো এই কারণে আল্লাহ পাক তাকে এই প্রতিদান দিয়েছেন। তার কবরকে ফুলে ফুলে সজ্জিত করে দিয়েছেন। মন্দ জারাদের মাকাম বা অবস্থান যদি আল্লাহ পাকের কাছে এই হয় তাহলে আমাদের মাকাম নিশ্চয় আরো বড় হবে যদি আমরা দুই ফোটা চোখের পানি ফেলতে পারি, কিন্তু চোখে আজকাল সহজে পানি আসে না। আমি যখন ইকরায় পড়েছি তখন আমার বুখারী শরীফের উস্তাদ, আমার পীর মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের একটা জিনিস খুব ফলো করতাম। সেটা হচ্ছে, কেউ যখন প্রিয় নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে গজল গাইতো তখন তিনি স্থির থাকতে পারতেন না, অঝোর ধারায় কাঁদতেন।
মালিক মালিক বলে আর্তনাদ করেন। পিয়ারে হাবীব পিয়ারে হাবীব বলে হাউমাউ করে কাঁদেন। হুজুরের মোনাজাতটা অন্তরে যেয়ে লাগে।
শিশুর মতো কাঁদতেন। আবার আমাদের পূর্ববর্তী আকাবীরদের কথারও যখন উল্লেখ করেন তখনও কাঁদেন। আর আল্লাহর সামনে হাত তুললে তো কথাই নাই। মালিক মালিক বলে আর্তনাদ করেন। পিয়ারে হাবীব পিয়ারে হাবীব বলে হাউমাউ করে কাঁদেন। হুজুরের মোনাজাতটা অন্তরে যেয়ে লাগে। অটোমেটিকলি চোখে পানি আসে।
হুজুরের সাথে মাঝেমধ্যে যখন হাত তোলার সৌভাগ্য হয় তখন আল্লাহর কাছে কাঁদার চেষ্টা করি, চোখে পানি আসে না তবুও ভান করি। বড় হুজুর মোনাজাতের ভিতরে যখন নিষ্পাপ শিশুর মতো আরজি করেন যে আল্লাহ, মদিনা শরীফের মৃত্যু দিও তখন আমি অনেক জোরে জোরে আমীন বলি। এই কারণে জোরে আমীন বলি যে, জোরে জোরে বলে আল্লাহকে একটু সাক্ষী রাখি। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী, তোমার দেয়া এই জবান সাক্ষী, এই মুখ সাক্ষী, এই ঠোঁট সাক্ষী। আমি তোমার এই প্রিয় বান্দার দোয়ার সাথে একমত। যদি আমাকে মৃত্যু দিতেই হয় তবে মদিনা শরীফের মৃত্যু দিবা। দিবা তো, দিবা তো মদিনা শরীফের মৃত্যু। তোমাকে দিতেই হবে দিতেই হবে। আল্লাহর সাথে জোর করেও চাওয়া যায়। ঈদের আগে মা যখন সন্তানকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তোকে এটা কিনে দিবো ওটা কিনে দিবো। তখন বাচ্চাটার বিশ্বাস হয় না। মায়ের থুঁতনি ধরে বারবার বলে, সত্যি দিবা তো, দিবা তো। মা তখন আশ্বাস দেয়, আরে হ দিবো দিবো। মা যখন সন্তানের এই বারবার জিঙ্গাসার জবাবে বিরক্ত হয়না বরং আশ্বস্ত করে বারবার। আদর করে মুখটা টিপে দেয়। আমার আল্লাহও সেইম। তিনি তো আরো বড় দয়ালু, দয়ার সাগর। একটুও বিরক্ত হননা বান্দার এই চাওয়ায় বরং খুশি হন। ডেকে ডেকে ফেরেশতাদের সাক্ষী রাখেন। প্রিয় বান্দার পাগলামী দেখান ফেরেশতাদেরকে। যখন মোনাজাতে আল্লাহর কাছে এরকম আকুতি করি তখন অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। সেই সময় কেন জানি একটা বিশ্বাস জন্মে যে, আল্লাহ পাক আমার এই আবদারটা রাখবেন। তবে মদিনা শরীফের মৃত্যু অনেক সৌভাগ্যের বিষয়। এই সৌভাগ্য আমার মতো নাদানের হবে কি না আল্লাহ জানে। তবে আল্লাহর কাছে চাইতে তো সমস্যা নেই। চাইতে ভয় লাগে কিন্ত আল্লাহ পাক তার কাছে চাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, অভয় দিয়েছেন। মদীনায় গেলে অনেক পাক পবিত্র হতে হয়। দিল সাফ থাকা লাগে। সেই তুলনায় আমার অন্তর কি সাফ? অনেক সন্দেহ হয়। ভয় লাগে। কিছুদিন আগে আমার বড়হুজুরের কনিষ্ঠ পুত্র সামনুন ভাইয়ের একটা লেখায় নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক সম্পর্কিত একটা ইতিহাস জেনেছি। সেটা হচ্ছে, একশো বছর আগে একলোক রওজা শরীফে যেয়ে বেয়াদবি করেছিলো তখন মাটি সাথে সাথে তাকে গিলে ফেলেছে। এই ঘটনা শোনার পর থেকে আরো ভয়ে আছি। সামনুন ভাই আরো লিখেছেন যে, ‘আমি যখন হজ্বে যাই তখন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ শেষ করে যখন মদিনায় যাচ্ছিলাম তখন কেন জানি মনে হলো, বায়তুল্লায় ফিরে যেয়ে আল্লাহ পাকের কাছে মাফটাফ চেয়ে আরেকটু পাক সাফ হয়ে তারপর মদিনায় যাই।’
আমি আমার বড়হুজুরের দরবারে গেলে এই প্রশান্তিটা আরেকটু বেশি পাই। হুজুরের সাথে তাল মিলিয়ে যখন জিকির করি তখনও প্রশান্তি হয়।
আল্লাহ পাকের সাথে কেউ বেয়াদবি করলে আল্লাহ পাক তাকে অবকাশ দেন। বারবার সুযোগ দেন কারণ তিনি রাহমানুর রাহীম, কিন্ত আল্লাহ পাক তার পিয়ারে হাবীব সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কেউ বেয়াদবি করলে সেটা সহ্য করেন না, একদমই সহ্য করেননা। কুরআনে অনেক জায়গায় তাঁর পেয়ারা নবীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ননা করেছেন। তাঁর প্রিয় মানুষটার নাম যেনো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে উচ্চারিত হয় সে জন্য তাশাহ্হুদ এবং দুরুদ শরীফ নামাজে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। সুতরাং এই নবীর সাথে বেয়াদবি করলে আল্লাহ পাক কি সহ্য করতে পারেন? অনেক ভালোবাসার নবী। নিজের কাছে পর্যন্ত তাঁর হাবীবকে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাককে সরাসরি দেখেছেন কি না এই বিষয়ে বিতর্ক আছে তবে বড় হুজুর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের লেখায় পড়লাম সশরীরে আল্লাহর সাথে একবার মোলাকাত হয়েছে। এই কারণে আল্লাহ পাকের কাছে যখন দোয়া করি তখন পেয়ারা নবীর উছিলা দিয়ে দোয়া করি। আমি যে তাঁর নবীর নগন্য উম্মত সেই কথা উল্লেখ করে দোয়া করি। মায়ের ভাষায় দোয়া করি কারণ ঐ ভাষাতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আল্লাহর কাছে সব নির্দ্বিধায় খুলে বলতে পারি। মাতৃভাষায় মোনাজাতের এই একটা ভালো সুবিধা। মাঝে মাঝে হযরত মুসা নবীর জামানার সেই বালকের মতোও বলি। যেই বালক পরম মমতা আর ভালোবাসা জড়ানো কন্ঠে বলেছিল, আল্লাহ, তোমারে যদি কাছে পাইতাম তাহলে আমার এই বকরীর দুধ দহন করে তোমারে খাওয়াইতাম। আল্লাহর কাছে সেই বালকের এই কথাগুলো কত প্রিয় ছিলো সেটা আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। মোনাজাতে সুবোধ বালকের মতো কান্নাকাটি করার চেষ্টা করি। আর কান্নাকাটি করার পরে অন্তরে কি যে একটা প্রশান্তি তৈরি হয় সেটা আসলে বলে কয়ে উল্লেখ করা যাবে না। নাহ, উল্লেখ করার মতো কোন শব্দ নেই। আর আল্লাহ পাক বান্দাকে চাওয়ার মতো চাইতে বলেছেন। আমার কেন জানি মনে হয় চাওয়ার মতো চাওয়ার তৎক্ষনাৎ পুরষ্কার হিসেবে এই প্রশান্তিটা দান করেন। আমি আমার বড়হুজুরের দরবারে গেলে এই প্রশান্তিটা আরেকটু বেশি পাই। হুজুরের সাথে তাল মিলিয়ে যখন জিকির করি তখনও প্রশান্তি হয়। আল্লাহ পাক আমার প্রিয় বড়হুজুরের ছায়াকে আমাদের উপর আরো দীর্ঘায়ীত করুন। আমাদের অন্তরে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি করে দিন।
হুজুরের সাথে মাঝেমধ্যে যখন হাত তোলার সৌভাগ্য হয় তখন আল্লাহর কাছে কাঁদার চেষ্টা করি, চোখে পানি আসে না তবুও ভান করি। বড় হুজুর মোনাজাতের ভিতরে যখন নিষ্পাপ শিশুর মতো আরজি করেন যে আল্লাহ, মদিনা শরীফের মৃত্যু দিও তখন আমি অনেক জোরে জোরে আমীন বলি। এই কারণে জোরে আমীন বলি যে, জোরে জোরে বলে আল্লাহকে একটু সাক্ষী রাখি। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী, তোমার দেয়া এই জবান সাক্ষী, এই মুখ সাক্ষী, এই ঠোঁট সাক্ষী। আমি তোমার এই প্রিয় বান্দার দোয়ার সাথে একমত। যদি আমাকে মৃত্যু দিতেই হয় তবে মদিনা শরীফের মৃত্যু দিবা। দিবা তো, দিবা তো মদিনা শরীফের মৃত্যু। তোমাকে দিতেই হবে দিতেই হবে। আল্লাহর সাথে জোর করেও চাওয়া যায়। ঈদের আগে মা যখন সন্তানকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তোকে এটা কিনে দিবো ওটা কিনে দিবো। তখন বাচ্চাটার বিশ্বাস হয়না। মায়ের থুঁতনি ধরে বারবার বলে, সত্যি দিবা তো, দিবা তো। মা তখন আশ্বাস দেয়, আরে হ দিবো দিবো। মা যখন সন্তানের এই বারবার জিঙ্গাসার জবাবে বিরক্ত হয়না বরং আশ্বস্ত করে বারবার। আদর করে মুখটা টিপে দেয়। আমার আল্লাহও সেইম। তিনি তো আরো বড় দয়ালু, দয়ার সাগর। একটুও বিরক্ত হননা বান্দার এই চাওয়ায় বরং খুশি হন। ডেকে ডেকে ফেরেশতাদের সাক্ষী রাখেন। প্রিয় বান্দার পাগলামী দেখান ফেরেশতাদেরকে। যখন মোনাজাতে আল্লাহর কাছে এরকম আকুতি করি তখন অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। সেই সময় কেন জানি একটা বিশ্বাস জন্মে যে, আল্লাহ পাক আমার এই আবদারটা রাখবেন। তবে মদিনা শরীফের মৃত্যু অনেক সৌভাগ্যের বিষয়। এই সৌভাগ্য আমার মতো নাদানের হবে কি না আল্লাহ জানে। তবে আল্লাহর কাছে চাইতে তো সমস্যা নেই। চাইতে ভয় লাগে কিন্ত আল্লাহ পাক তার কাছে চাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, অভয় দিয়েছেন। মদীনায় গেলে অনেক পাক পবিত্র হতে হয়। দিল সাফ থাকা লাগে। সেই তুলনায় আমার অন্তর কি সাফ? অনেক সন্দেহ হয়। ভয় লাগে। কিছুদিন আগে আমার বড়হুজুরের কনিষ্ঠ পুত্র সামনুন ভাইয়ের একটা লেখায় নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক সম্পর্কিত একটা ইতিহাস জেনেছি। সেটা হচ্ছে, একশো বছর আগে একলোক রওজা শরীফে যেয়ে বেয়াদবি করেছিলো তখন মাটি সাথে সাথে তাকে গিলে ফেলেছে। এই ঘটনা শোনার পর থেকে আরো ভয়ে আছি। সামনুন ভাই আরো লিখেছেন যে, ‘আমি যখন হজ্বে যাই তখন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ শেষ করে যখন মদিনায় যাচ্ছিলাম তখন কেন জানি মনে হলো, বায়তুল্লায় ফিরে যেয়ে আল্লাহ পাকের কাছে মাফটাফ চেয়ে আরেকটু পাক সাফ হয়ে তারপর মদিনায় যাই।’
মোনাজাতে সুবোধ বালকের মতো কান্নাকাটি করার চেষ্টা করি। আর কান্নাকাটি করার পরে অন্তরে কি যে একটা প্রশান্তি তৈরি হয় সেটা আসলে বলে কয়ে উল্লেখ করা যাবে না।
আল্লাহ পাকের সাথে কেউ বেয়াদবি করলে আল্লাহ পাক তাকে অবকাশ দেন। বারবার সুযোগ দেন কারণ তিনি রাহমানুর রাহীম, কিন্ত আল্লাহ পাক তার পিয়ারে হাবীব সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কেউ বেয়াদবি করলে সেটা সহ্য করেন না, একদমই সহ্য করেননা। কুরআনে অনেক জায়গায় তাঁর পেয়ারা নবীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ননা করেছেন। তাঁর প্রিয় মানুষটার নাম যেনো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে উচ্চারিত হয় সে জন্য তাশাহ্হুদ এবং দুরুদ শরীফ নামাজে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। সুতরাং এই নবীর সাথে বেয়াদবি করলে আল্লাহ পাক কি সহ্য করতে পারেন? অনেক ভালোবাসার নবী। নিজের কাছে পর্যন্ত তাঁর হাবীবকে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাককে সরাসরি দেখেছেন কি না এই বিষয়ে বিতর্ক আছে তবে বড় হুজুর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের লেখায় পড়লাম সশরীরে আল্লাহর সাথে একবার মোলাকাত হয়েছে। এই কারণে আল্লাহ পাকের কাছে যখন দোয়া করি তখন পেয়ারা নবীর উছিলা দিয়ে দোয়া করি। আমি যে তাঁর নবীর নগন্য উম্মত সেই কথা উল্লেখ করে দোয়া করি। মায়ের ভাষায় দোয়া করি কারণ ঐ ভাষাতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আল্লাহর কাছে সব নির্দ্বিধায় খুলে বলতে পারি। মাতৃভাষায় মোনাজাতের এই একটা ভালো সুবিধা। মাঝে মাঝে হযরত মুসা নবীর জামানার সেই বালকের মতোও বলি। যেই বালক পরম মমতা আর ভালোবাসা জড়ানো কন্ঠে বলেছিল, আল্লাহ, তোমারে যদি কাছে পাইতাম তাহলে আমার এই বকরীর দুধ দহন করে তোমারে খাওয়াইতাম। আল্লাহর কাছে সেই বালকের এই কথাগুলো কত প্রিয় ছিলো সেটা আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই। মোনাজাতে সুবোধ বালকের মতো কান্নাকাটি করার চেষ্টা করি। আর কান্নাকাটি করার পরে অন্তরে কি যে একটা প্রশান্তি তৈরি হয় সেটা আসলে বলে কয়ে উল্লেখ করা যাবে না। নাহ, উল্লেখ করার মতো কোন শব্দ নেই। আর আল্লাহ পাক বান্দাকে চাওয়ার মতো চাইতে বলেছেন। আমার কেন জানি মনে হয় চাওয়ার মতো চাওয়ার তৎক্ষনাৎ পুরষ্কার হিসেবে এই প্রশান্তিটা দান করেন। আমি আমার বড়হুজুরের দরবারে গেলে এই প্রশান্তিটা আরেকটু বেশি পাই। হুজুরের সাথে তাল মিলিয়ে যখন জিকির করি তখনও প্রশান্তি হয়। আল্লাহ পাক আমার প্রিয় বড়হুজুরের ছায়াকে আমাদের উপর আরো দীর্ঘায়ীত করুন। আমাদের অন্তরে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি করে দিন।
লেখক : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক


