ধাঁধার চর এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র

ধাঁধার চর এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র

গাজীপুর প্রতিনিধি • শীতলক্ষ্যা ও ব্রক্ষপুত্র নদের মোহনায় বিন্দু বিন্দু বালু জমতে জমতে তৈরি হয়েছে মনোলোভা এক ভূখ-, যার নাম ‘ধাঁধার চর’। গাজীপুরের কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝখানে অবস্থিত ধাঁধার চর। অনেকে শখের বসত একে সেন্টমার্টিন দ্বীপ বলেও ডাকে।

সম্প্রতি গিয়েছিলাম ধাঁধার চরের সৌন্দর্য ও রূপলীলা উপভোগ করতে। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সবুজেঘেরা ধাঁধার চরের দৈর্ঘ্যে সাড়ে ৪ কিলোমিটার। বর্ষাকালে নদীর বিশাল ঢেউ দেখলে মনে হয় এ যেন আরেক কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত। বর্ষাকালে শুধু এই ঢেউ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। আড়াইশ’ বছর আগে গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার সীমানা বেষ্টিত শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের তারাগঞ্জ, রাণীগঞ্জ, লাখপুর, চরসিন্দুর এলাকায় নদীর মাঝখানে ২৫০ একর আয়তনের এ চরকে অনেকে বলে মাইঝ্যার চর বা মাঝের চর। কারণ চার চারটি গ্রামের মাঝখানে এর অবস্থান। দূর থেকে দেখলে চরটিকে কারও কারও মনে হতে পারে এ যেন ডুবে যাওয়া টাইটানিক জেগে উঠছে। চরের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম চারদিকেই শীতলক্ষ্যা নদী, উত্তর-পূর্ব কোনায় ব্রহ্মপুত্র নদ। চরের পূর্বপাশে শিবপুর-মনোহরদী ও পশ্চিম পাশে কাপাসিয়া-কালিগঞ্জ উপজেলা। দুই পাশে দুই জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী। বর্ষা মৌসুমে দুটি নদীই পানিতে থৈ থৈ করে। শীতকালে এটি হয়ে ওঠে আরও মনোলোভা।

এই চরে রয়েছে বড় বড় পেয়ারার বাগান, আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, কলাবাগান ও বিভিন্ন জাতের ফসলি ক্ষেত। ধাঁধার চরে বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে ‘আয় আয়, মুছে দিই তোর যত গ্লানি’। পাখির কিঁচিরমিচির শুনে ইচ্ছা হবে পাখি হয়ে গান গেয়ে উড়ে যাই চরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে।
চরের সূচনালগ্নে এর মালিকানা নিয়ে ভাওয়ালের রাজা ও বার ভূঁইয়াদের এক ভূঁইয়া মহেষ উদ্দীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিরোধ মেটাতে এগিয়ে এলেন স্থানীয় মাতব্বররা। তারা একটি কলসি নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। বললেন, কলসিটি নদীর যে পাড়ে গিয়ে ভিড়বে চরের দখল পাবেন সেই পাড়ের লোকজন। কলসিটি নদীর পশ্চিম পাড়ে অর্থাৎ ভাওয়াল রাজার এলাকায় (বর্তমানে গাজীপুরের কাপাসিয়া) এসে ভিড়ে। তারপর থেকেই ধাঁধার চরটি পশ্চিমপাড়ের ভাওয়াল রাজা পরগনার দখলে। হিন্দু কৃষকরা ভাওয়ালের রাজাকে খাজনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন।

১৮১৬-১৮১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার চরের জরিপ করে কৃষকদের বৈধ মালিকানা দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হিন্দুরা চরের জমি বিক্রি করে ভারতে পাড়ি জমান। এখন পুরো চরের মালিকানা মুসলিম কৃষকদের হাতে। এই চরের মাটি খুবই উর্বর। রোপণ করলে হয় না, এমন কোনো ফল-ফসল নেই। এক সময় চরে প্রচুর আখ হতো। এখন সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয়। মাটি অতি ফলনশীল। সারবিহীন ফসল সুস্বাদু। ১৯৬০, ১৯৮৮, ১৯৯৮ সালের বন্যায় এ চরটি তলিয়ে গিয়েছিল।

১৯৬০ সালের বন্যার পর চরে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায়। ফলে মাটির উর্বরা শক্তি আরও বাড়তে থাকে। ২০০৬ সালের সার্ক সম্মেলনে ধাঁধার চরটিকে গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে চর থেকে অনেকে মাটি নিয়ে যাচ্ছে ভূমিদস্যুরা তাছাড়া ময়লা আবর্জনা ফেলে আশপাশের পরিবেশ নষ্ট করছে। যথার্থ কোন রক্ষক না থাকায় চর থেকে বড় বড় বিভিন্ন গাছপালা কেটে বন উজার করছে স্থানীয় কিছু লোকজন। এমন অবস্থায় এ সম্ভাবনাময় পর্যটক কেন্দ্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরদারি করা অতি জরুরী। তা না হলে কাপাসিয়াবাসী হারাবে সম্ভাবনাময় পর্যটক কেন্দ্রটি।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মনির হোসেন আমার বার্তাকে জানান, পর্যটন শিল্পের জন্য ধাঁধার চরটি অপরিসীম। চরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। সরকারীভাবে যদি বিনোদনের জন্য চরটি সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে নদী পর্যটন শিল্পের জন্য এটি হবে বিশাল একটি উদাহরণ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *