আত্মার খোরাক মিলে তাড়াইল ইজতেমায়

আত্মার খোরাক মিলে তাড়াইল ইজতেমায়

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

গাড়ি রাস্তায় চলাচল করে। তবে কতক্ষণ চলতে পারে? একটানা পাঁচ-ছয় ঘন্টা? বা তার থেকে কিছু বেশী। একটা প্লেন একনাগাড়ে কত সময় আকাশে উড়তে পারে? সর্বোচ্চ বার-তের ঘণ্টা? বা এর থেকে কিঞ্চিৎ কমবেশী হতে পারে। কিন্তু এ দীর্ঘপথ চলার পরে অবশ্যই গাড়ি বা প্লেনটির জ্বালানীর প্রয়োজন পড়ে। আর তখনই তাকে নেওয়া হয় তেলের পাম্পে বা ফিলিং ষ্টেশনে।  পুনরায় জ্বালানী লোড করে এরপরে রাস্তায় বের করা হয় বা আকাশে উড়ানো হয়ে থাকে।

গাড়ি বা প্লেনের যেমন জ্বালানী লাগে। জ্বালানী ছাড়া সে বিকল। তেমনি একজন মানুষের রুহের খোরাক জরুরী। রুহের খোরাক ছাড়া সে চলতে পারেনা। গাড়িকে তেল ভরার জন্য ফিলিং  ষ্টেশনে নেওয়া হয় তেমনি মানুষের আত্মার খোরাকের জন্যে আল্লাহওয়ালাদের কাছে যেতে হয়।

তেল যেমন সবখানে পাওয়া যায়না,  নির্দিষ্ট  জায়গাতে যেতে হয়, কোন তেলের পাস্প বা তেলের ডিপোতে গিয়ে তেল নিয়ে তারপরে চলতে হয়। ঠিক আত্মার খোরাক যেকোন জায়গাতে নেই, যেকোন মানুষের কাছেও সেটা পাওয়া যায়না। বরং সেটা পাওয়া যায় আল্লাহর খাছ পেয়ারা বান্দাদের কাছে। আল্লাহওয়ালাদের সংস্পর্শে সেটা লাভ করা সম্ভব।

এখনো কিছু মানুষ বুজুর্গানেদ্বীন তথা আল্লাহওয়ালাদের সোহবতে যাওয়াকে নিরর্থক মনে করে থাকে। তারা ভাবে নিজে নিজেই সবকাজ সমাধা করে ফেলব। কিন্তু সেটা কী সম্ভব? নিজে কী নিজের রোগ ধরা যায়? রোগ ধরা গেলেও কী নিজের চিকিৎসা নিজে করা যায়?

অনেকে মনে করেন আমি তো বড় আলেম হয়েছি। দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত সকল কিতাব আমার  আত্মস্ত। সিহাহ সিত্তার সকল হাদীস জানি, ফিকহ, উসুলে ফিকহ সবকিছু আমার নখদর্পণে। আমি তো দ্বীন ইসলামের সববিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখি। সুতরাং আমার তো কারো কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

দেখুন! ডাক্তার যিনি রোগীদের চিকিৎসা করে থাকেন। তারও কিন্তু অসুখ- বিসুখ হয়। সে তখন  কী নিজের সকল চিকিৎসা নিজে করতে পারে? হয়ত প্রাথমিক কোন ট্রিটমেন্ট নিজে করতে পারে। কিন্তু বড় কোন ব্যাধী হলে তো নিজেরটা নিজে করা সম্ভব নয়। যদি তার কোন অপারেশন করার প্রয়োজন হয় তখন কী নিজের অপারেশন নিজে করা সম্ভব? কখনোই নয়। যতবড় ডাক্তারই হোকনা কেন নিজের চিকিৎসা নিজে করতে পারবেনা। বরং অন্য কারো শরণাপন্ন হতে হবে।

আপনি যতবড় আলেমই হোন না কেন আপনার আত্মার ব্যধির জন্য কোন বড় চিকিৎসক তথা একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালার কাছে যাওয়া প্রয়োজন

তেমনি আপনি যতবড় আলেমই হোন না কেন আপনার আত্মার ব্যধির জন্য কোন বড় চিকিৎসক তথা একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালার কাছে যাওয়া প্রয়োজন। যিনি আপনার অন্তরের চিকিৎসা করতে পারবেন। যার সোহবতে আপনার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। যিনি আপনাকে সঠিক- সরল পথ বাতলে দিবেন।

ওলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে এই বৈশিষ্টগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। যারা জগৎসেরা আলেম ছিলেন।  যাদেরকে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী বলা হত। সেই জীবন্তগ্রন্হাগারগুলো নিজেদেরকে বিলীন করে দিয়েছেন আল্লাহওয়ালাদের সমীপে। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. শাইখুল ইসলাম মাদানী  রহ. আশরাফ আলী থানভী রহ. এ সকল মনিষীদের কথা চিন্তা করুন। তারা কত উঁচু মানের ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকেই যেন জীবন্তগ্রন্হাগার। কিন্তু এত বড় ব্যক্তিত্ব হওয়ার পরেও তারা নিজেকে কামেল শায়েখের নিকট নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। ওই কামেল শায়েখের সোহবতে নিজের জীবনকে রাঙিয়েছেন।

তেমনি আমাদের যুগ জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক আলেমের জন্য শায়েখে কামেল তথা আল্লাহওয়ালাদের সংস্রব জরুরী। নবীন- প্রবীণ সকলের জন্য কোন না কোন শায়েখের সান্নিধ্যে জীবন অতিবাহিত করা চাই। শায়েখের পরামর্শ নিয়েই জীবন পরিচালনা করা বিশেষ প্রয়োজন।

ওলামায়েদেওবন্দের এক সূর্যসন্তান, যাকে এ জামানার জীবন্ত লাইব্রেরী বলা হয়, আলেমকুল শিরোমনি, শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাতবারাকাতহুম। যাকে এখন  বাকিয়্যাতুস সা্লাফ বলা হচ্ছে। এ মহান ব্যক্তি কুতবুল আরব ওয়াল আজম শাইখুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এর সাহেবজাদা ফেদায়েমিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ. এর সংস্পর্শে  থেকে  নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। পরিশেষ তিনি খেলাফত- ইজাযত প্রাপ্ত  লাভে ধন্য হন। তিনি যেন হুবহু  আঁকড়ে আছেন পূর্বসূরী মনিষীদের পদচিহ্ন । কেননা শত ঝড়- ঝাপটায় মধ্যে তিনি আকাবির- আসলাফের বাতলানো পথ থেকে সরতে চাননা কখনো। যে কারণে বহু গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে। অনেক ঘাত- প্রতিঘাত সহ্য করেই সম্মুখপানে ছুটে চলেছেন।

বর্তমানে আল্লামা মাসঊদ সাহেবের ইসলাহী প্রোগ্রামগুলোর অন্যতম হলো তাড়াইল ইজতিমা। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় হাওড়ের কূলঘেষে প্রতিবার শীত মৌসুমে এই ইসলাহী ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গ্রাম বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের ব্যাপক ফায়দা হয়। কেননা  আল্লামা মাসঊদের প্রোগামগুলো হয় সম্পূর্ণ রেজায়ে মাওলার উদ্দেশ্যে। কোন লৌকিকতা নেই সেখানে। দুনিয়াবী মাকসাদ হাসিলের জন্য নয়। আবার তাঁর খানকাগুলো কোন ওয়াজের মাহফিল নয়। একটা আমলের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে সেখানে। যেকারণে উপস্হিত সকলেরই ফায়দা পরিলক্ষিত হয়। একটা আমলের মানজার চোখে পড়ে সেখানে।

আত্মার খোরাক মিলে তাড়াইল ইজতিমায়। পিপাসিত অন্তর সজিবতা লাভ করে। দিলের জং – ময়লা দূর করে নতুন জীবনে ধন্য হয় কলুষিত মন। আগামী ২৬, ২৭, ২৮ জানুয়ারী এই ইজতিমা। আর মাত্র বিশ দিন বাকি। তাই আসুন! শরীক হই এ মহান মনিষীর ইজতেমাতে। রাঙিয়ে ফেলি নিজের জীবনকে। আল্লাহতায়ালা আমাদের উপরে রহম করুন। আমিন।

লেখক, শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *