২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

উস্তাদ-ছাত্রের গৌরবময় ভালোবাসার তিনকাল

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

নবীজী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সবচেয়ে বেশী ভালোবাসা ছিল সাহাবায়েকেরামের। সাহাবাদের ভালোবাসা ছিল বেমেছাল। তুলনাহীন। তাদের ভালোবাসার সাথে আর কারো তুলনা চলে না। তাঁরা রাসূলকে এত ভালোবাসতেন, সামান্য কাটার আঁচড় প্রিয় রাসূল এর গায়ে বিঁধুক, সেটা কেউ মেনে নেয়নি। এমনকি রাসূলের শানে কারো এমন মন্তব্য তাদের বরদাশত হয়নি। পৃথিবীর জন্ম থেকে এ পর্যন্ত কোন নবীকে তার সাথীবর্গের ভালোবাসার জরিপ চালালে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণই শ্রেষ্ঠ হবে। প্রিয় রাসূলকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, সেটার দৃষ্টান্ত তারা স্হাপন করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে তাবেয়ীগণের ভালোবাসা ছিল সাহাবাদের উপর। আবার তাবেয়ীদের ভালবেসেছেন তাবে-তাবেয়ীগণ। এভাবে সুলাহায়ে উম্মাতদের ভালোবাসার এই ছিলছিলা তথা সুত্রপরম্পরা জারি রয়েছে। আপন উস্তাদ শায়েখ ও মুর্শিদকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে ভক্তি করতে হয়, সেটার বাস্তব নমুনা তার দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের শিক্ষার্থী, তালেবুল ইলম, মুরীদ-ভক্তবৃন্দের জন্য রেখে গেছেন।

আকাবিরে দেওবন্দ ছিলেন পুরোপুরি সুন্নাতের অনুসারী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের নকশে কদমে চলার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মাঝে ফুটে উঠত সেই সাহাবাদের অনুপম আদর্শ। সাহাবা এবং তাবেয়ীদের মত উস্তাদভক্তির কিছু নমুনা পাওয়া যেত এঁদের মাঝে। কিছু না হলেও এই সকল মনীষীদের কর্মতৎপরতায় কিছুটা অনুমেয় হত সেই খায়রুল কুরুনের মানুষের গুরুভক্তির কথা। এঁদের উস্তাদ ভক্তি স্মরণ করে দিত সাহাবাদের নবীর প্রতি প্রেম ভালোবাসার ইতিহাস।

আকাবিরে দেওবন্দ এর মধ্যে শায়খুল ইসলাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) এর উস্তাদ ভক্তির কথা সর্বজন বিদিত। কী দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছেন। নিরেট ভালোবাসা ছিল আপন উস্তাদের প্রতি। তাঁর সেই উস্তাদভক্তির কথা এ প্রজন্মের মানুষের মুখে মুখে। এক উজ্জল ইতিহাস রচনা করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত মনেহয় এক নজীর হয়ে থাকবে। মাওলানা মাদানীর সেই গুরুভক্তির কীর্তি সর্বস্তরের মানুষ শিহরিত হবে।

কেউ কী স্বেচ্ছায় কারাবরণ করতে চায়? তাও আবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দুঃশাসন চলছে। হাজার হাজার মাইল দূরের সেই বীভৎস কালাপানির জেলখানা। নিজ দেশ নয়। ভিন দেশের বন্দীশালায় থাকতে হবে। কোন সময় নির্ধারন ছিল না। বছরের পর বছর কেটে যাবে। এতকিছু বোঝার পরেও সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) তিনি প্রিয় উস্তাদের ভক্তি ভালোবাসায় উস্তাদের খেদমতের জন্য কারাবরণ করেছিলেন। প্রায় পাঁচ বছরকাল মাল্টার জেলখানায় বন্দী হয়েছিলেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে যেন নজীরবিহীন ঘটনা। কী প্রেম-ভক্তি ছিল। কী ভালোবাসা তিনি জমা করেছিলেন। এরকম উস্তাদ শাগরেদ যে বেমেছাল। সত্যি কথা কী? আমি নিজে যখন এই ঘটনা উস্তাদের মুখে শুনেছি, তখন শিহরিত হয়েছিলাম। দেওবন্দ যখন পড়ি, প্রতিদিন বাদ ফজর মাকবারায়ে কাসেমীতে গেলে হযরত শায়খুল হিন্দ এবং মাদানী সাহেবের শিয়রে দাঁড়াতাম। যিয়ারত করতাম। যতবারই যিয়ারত করেছি, প্রতিবারই সেই গুরুভক্তির ইতিহাস আমার চোখের পাতায় ভেসে উঠত। পুরো শরীরে শিহরণ জেগে উঠত। এক আজীব অবস্থার সৃষ্টি হত। যেটা লিখে বোঝানো যাবে না। হযরত সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) যেমন তাঁর প্রিয় উস্তাদ শায়খুল হিন্দের প্রতি নিরেট-নির্ভেজাল ভালোবাসা ছিল। তদ্রুপ তাঁর শাগরেদগণও অনুরুপ ভালোবাসা দেখিয়েছেন। প্রতিটি শাগরেদ হযরত মাদানী (রহ.) এর আশেক ছিলেন।

উস্তাদের প্রতি এমন শ্রদ্ধা-ভালোবাসা থাকতে পারে তা আমি এই জামানায় দেখিনি বা শুনিনি। এক বেমেছাল ভক্তি ভালোবাসার মানুষ ছিলেন আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ।

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) ঠিক মাদানী (রহ.) এর একজন খাঁটি আশেক-প্রেমিক। উস্তাদকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, সেটা তিনি এই প্রজন্মের ছাত্রদের জন্য বড় দৃষ্টান্ত। আজীবন হযরত মাদানীর গুণকীর্তন করে গেছেন। কাজী সাহেব তো মাদানী (রহ.) কে স্বপ্নপুরুষ মনে করতেন। আশৈশব থেকে তিনি মাদানী ভক্ত। দেওবন্দ যাওয়ার পুর্বেই হযরত মাদানীকে স্বপ্নের রাজপুত্তুর ভেবেই মাদারে ইলমীতে পাড়ি জমান এবং সেখানে তাঁর সোহবতে ধন্য হন।

কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) এর মাদানী (রহ.) প্রতি ভক্তি ভালোবাসার যেন বাস্তব প্রতিকৃতি ছিলেন। তাঁর এত গভীর শ্রদ্ধা এবং প্রেম দেখে স্বয়ং মাদানী (রহ.) এর সন্তান সাইয়্যেদ আসজাদ মাদানী দামাতবারাকাতুহুম তিনি কাজী সাহেবের ইন্তেকালের পরে জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের স্মরণ সভায় বলেন, ‘উস্তাদের প্রতি এমন শ্রদ্ধা-ভালোবাসা থাকতে পারে তা আমি এই জামানায় দেখিনি বা শুনিনি। এক বেমেছাল ভক্তি ভালোবাসার মানুষ ছিলেন আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ।’

আমরা কাজী সাহেব হুজুরকে যতদিন দেখেছি। যতবার তাঁর বয়ান শুনেছি, এমন আশেকে মাদানী মনে হয় আর পায়নি কোথাও। বয়ান-বক্তৃতার মাঝে যখনই হযরত মাদানীর নাম আসত, এমন এমন লকব লাগিয়ে প্রিয় উস্তাদের নাম উচ্চারণ করতেন, যেটা খাঁটি প্রেমিক ছাড়া সেসব শব্দ উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়। মাদানী দর্শন থেকে এক চুল নড়েননি কাজী সাহেব। আজীবন প্রিয় উস্তাদের চিন্তা-চেতনা লালন করেছেন। হক-হক্কানিয়্যাতের মশাল আঁকড়ে ধরেছেন। বিলকুল পিছুহটা মানুষ নয়। উস্তাদের প্রতিটি গুণে গুণান্বিত হওয়ার সাধনা ছিল। বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই ছিল তাঁর। মাদানীর মত ছাত্রগড়ন। ইলমের পিদিমকে প্রজ্জলিত করার সংগ্রামেই কেটেছিল জীবন। দারুল উলূম দেওবন্দের দৃষ্টিভঙ্গিকে বক্ষে ধারণ করে তাঁর পথচলা। এ পথ মসৃণ হয়নি। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি দারুল উলূমের সূর্যসন্তান হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) যেমন হযরত মাদানী (রহ.) এর ফুয়ুজ-বারাকাতে ধন্য।তেমনি কাজী সাহেবের এক প্রাণপ্রিয় শাগরেদ। যিনি আবাল্য কাজী সাহেবের সংস্পর্শে আলোকিত। যাকে স্বয়ং কাজী সাহেব উস্তাদতুল্য ছাত্র হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি যেন মাওলানা মাদানীর প্রতিচ্ছবি। পুরোপুরি মাদানী ছিলছিলার ধারক-বাহক। আবার ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর খলিফা। দারুল উলূম দেওবন্দের এক অন্যতম মেধাবীমুখ। দেওবন্দে বাংলাদেশের দুজন ব্যক্তিকে দেওবন্দীয়্যাত বোঝার মত শখছিয়্যাত মনে করেন। এক. আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)। দুই. আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা.)। তিনি যেন পুরোপুরি উস্তাদের সবক অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছেন।

জাতির এই ক্রান্তিকালে সর্বদিক থেকে বাধা। এদেশের সর্বস্তরের ওলামায়েকেরাম বানের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। হক-হক্কানিয়্যাতের উপর চলতে বহু বাঁধার সম্মুখিন। এমনই এক সঙ্গীন মুহুর্ত। অসত্যের দেয়াল টপকিয়ে সত্য-ন্যায়ের পথে চলা দুর্লঙ্ঘ্য ব্যাপার। তেমনি এক সময়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন আল্লামা মাসঊদ সাহেব। কী যে যাতনা, কী যে ব্যাথা তিনি সহ্য করেছেন। আহ, পুরো বাংলাদেশের আলেম সমাজ যেন তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু বিন্দু পরিমাণ টলে যাননি। তিনি হেরে যাননি। সত্যিকারের মাদানী দর্শনের ধারক-বাহক।

হুজুর! যেখানে আপনার জীবনের নিরাপত্তার অভাব। আপনি আতংকে আছেন। আমি কীভাবে রাতে ঘুমোতে পারি?

মাওলানা মাদানীকে এক সময় আলেম-উলামাগণ গালিগালাজ করেছে। ফতোয়া দিয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে। মাদানী সাহেব হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন। কাউকে প্রতিউত্তর করেননি। প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা তাঁর ছিলনা। পরে সবাই নিজের ভুল বুঝেছে। মাদানী দর্শন শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে। আল্লামা মাসঊদ যেন হুবহু সেই সাইয়্যেদ মাদানী (রহ.) এবং কাজী সাহেবের ফটোকপি। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ইস্পাতের মত দাঁড়িয়ে থাকেন হক-হক্কানিয়্যাতের উপর। যার কারণে অবুঝ লোকদের গালিগালাজ শুনতে হয়েছে। পরিশেষে কিন্তু তাঁর দর্শন চিন্তা-চেতনার জয় হয়েছে। একবার দুবার নয়। বারবারই তাঁর চিন্তা-চেতনার জয় হচ্ছে।

গুরুভক্তির এক অন্যন্য নজির স্থাপন করেছেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব। আজীবন স্বীয় উস্তাদের অনুগত। তিনি বিশ্বব্যাপি খ্যাতি লাভ করার পরেও সেই প্রিয় উস্তাদের সোহবতে ধন্য হতেন। কথায়-কাজে এখনো যিনি উস্তাদকে অনুসরণ করে চলেন। যতদিন কাজী সাহেব বেঁচে ছিলেন, নিজেকে বিলীন করেছেন তাঁরই কদমে।

আমার একজন প্রিয় উস্তাদ মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান দামাতবারাকাতুহুম এর কাছে শুনেছি। আশির দশকে জামেয়্যা শারইয়্যাহ মালিবাগে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির কিছু মানুষ এবং এলাকার কিছু দুষ্টচক্রের কবলে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কাজী সাহেব হুজুর অনেক পেরেশানীতে কালাতিপাত করছিলেন। এমনকি নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছিল। হঠাৎ রাতে ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব কাজী সাহেবের বাসায় হাজির। তিনি তো অবাক। এত রাতে কেন আসলেন? ফরীদ সাহেব বললেন, হুজুর! যেখানে আপনার জীবনের নিরাপত্তার অভাব। আপনি আতংকে আছেন। আমি কীভাবে রাতে ঘুমোতে পারি? সারারাত প্রিয় উস্তাদের সাথে সময় কাটান। এক অনন্য ভালোবাসার দৃষ্টান্ত উপস্হাপন করেন তিনি।

উস্তাদ-ছাত্রের গৌরবময় ভালবাসার তিনকাল। যেমন শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহ.) তেমন আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)। ঠিক তাদের পদাঙ্ক অনুসারী, বর্তমান যুগের মাদানী আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাতবারাকাতুহুম। আল্লাহতায়ালা এই ছিলছিলাকে কবুল করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: কওমি মাদরাসার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বন্ধ হোক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com