১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২১শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

ক্ষমা করো হে বোন নুসরাত

ক্ষমা করো হে বোন নুসরাত,

তুমি নব্য জাহিলিয়্যাতের শিকার!

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম :  জাহিলিয়্যাত মানে অন্ধকার যুগ। ন্যায়-ইনসাফ সেখানে ছিল না। ছিল না কারো কোন অধিকার। দয়াশূন্য, মায়াহীন এক সমাজের নাম জাহিলিয়্যাত। জাহিলিয়্যাতের কুপ্রথার কথা শুনে হৃদয় প্রকম্পিত হয়ে উঠে না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। জাহিলিয়্যাতের ভয়ানক একটি উদাহরণ হল সে যুগে মেয়েদেরকে জীবন্ত মাটিতে পূতে ফেলা হত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ঘটনা শুনে অশ্রু সিক্ত হয়েছিলেন। পড়ুন……

কাইস বিন আসেম যখন মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিল তখন একজন আনসার সাহাবী তাকে তার মেয়েদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। কাইস জবাবে বলেছিল, “আমি আমার সকল কন্যাসন্তানকে জীবন্ত দাফন করেছি, কেবল একবার ব্যতীত। আর কখনই এ কাজ করতে গিয়ে আমি একটুও কষ্ট পাই নি। আর সেটি ছিল : একবার আমি সফরে ছিলাম। আমার স্ত্রীর সন্তান প্রসবকাল অতি নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। দৈবক্রমে আমার সফর বেশ দীর্ঘায়িত হলো। সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমি আমার স্ত্রীকে সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। সে আমাকে বলল : কোন কারণে সে মৃত সন্তান প্রসব করেছে। আসলে সে একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেছিল, কিন্তু সে আমার ভয়ে ঐ কন্যাসন্তানকে জন্মের পর পরই তার বোনদের কাছে রেখেছিল।

অনেক বছর কেটে গেলে ঐ মেয়েটি যৌবনে পা দিল, অথচ তখনও আমি জানতাম না যে, আমার একটি মেয়ে আছে। একদিন আমি আমার ঘরে বসে আছি, হঠাৎ একটি মেয়ে ঘরে প্রবেশ করে তার মাকে খোঁজ করতে লাগল। ঐ মেয়েটি ছিল সুন্দরী। তার চুলগুলো বেনী করা ছিল এবং তার গলায় ছিল একটি হার। আমি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই মেয়েটি কে? তখন তার নয়নযুগল অশ্রুজলে পূর্ণ হয়ে গেল এবং সে বলল : এ তোমার ঐ মেয়ে যখন তুমি সফরে ছিলে তখন তার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু আমি তোমার ভয়ে তাকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম।

আমার স্ত্রীর এ কথায় আমার নীরব থাকার বিষয়টি এতে আমার সন্তুষ্টি ও মৌন সম্মতি বলেই সে মনে করল। সে ভাবল যে, আমি এ মেয়েকে হত্যা করব না। এ কারণেই আমার স্ত্রী একদিন নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে বাইরে গেল। আর আমিও যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তা পালন করার জন্য আমার মেয়েকে হাত ধরে দূরবর্তী একটি স্থানে নিয়ে গেলাম। সেখানে আমি একটি গর্ত খুঁড়তে লাগলাম। গর্ত খোঁড়ার সময় সে আমাকে বার বার জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন আমি এ গর্ত খনন করছি? খনন শেষে আমি তার হাত ধরে টেনেহিঁচড়ে গর্তের ভিতরে ফেলে দিলাম এবং তার দেহের ওপর মাটি ফেলতে লাগলাম। তার করুণ আর্তনাদের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করলাম না। সে কেঁদেই যাচ্ছিল এবং বলছিল : বাবা! আমাকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে এখানে একাকী রেখে আমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে?

আমি তার ওপর মাটি ফেলেই যাচ্ছিলাম এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে মাটির মধ্যে জীবন্ত পুঁতেই ফেললাম। হ্যাঁ, কেবল এই একবারই আমার হৃদয় কেঁদেছিল-আমার অন্তর জ্বলে-পুড়ে গিয়েছিল।” কাইসের কথা শেষ হলে মহানবী (সা.)-এর দু’চোখ অশ্রুজলে ভরে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “এটি পাষাণ হৃদয়ের কাজ। যে জাতির দয়া-মায়া নেই সে জাতি কখনই মহান আল্লাহর দয়া ও করুণা লাভ করতে পারে না।

আলিম পরীক্ষার্থী নুসরত জাহান রাফি একজন মাদরাসা শিক্ষার্থী। মাদরাসার মত পবিত্র স্থানে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ডেলে আগুন দিয়ে তার দেহের ৮০٪ ভষ্মিভূত করে দেয়া হয়। গতরাত আনুমানিক ৯টার সময় এই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়ে যায়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

একটি পর্যালোচনা!

এখানে কয়েকটি শব্দ নিয়ে আলোচনা করা যায়।

এক. মাদরাসা।

দুই. শিক্ষার্থী।

তিন. আগুন দিয়ে হত্যা।

এক. মাদরাসা মানে যেখানে দীন-ধর্ম ও মানবতার শিক্ষা দেয়া হয়। মনুষ্যতা ও ইনসাফ সেখান থেকে প্রচারিত হয়। আমাদের বড়রা বলেন, পৃথিবীতে কেউ যদি জান্নাত দেখতে চাও তাহলে মাদরাসায় চলে আসো। এমন জান্নাতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা কল্পনাতীত।

দুই. শিক্ষার্থী মানে যে শিক্ষা অর্জন করে। অজ্ঞতা দূর করে নিজের মধ্যে জ্ঞানের মশাল জালায় এবং সমাজকে আলোকিত করে। বিশেষত সে শিক্ষা যদি হয় ইসলামী শিক্ষা তার মর্যাদা ও ফযিলত দ্বিগুণ হয়ে যায়। রাসুল সা. বলেন, যে ব্যক্তি দীনি ইলম অর্জন করার জন্য ঘর থেকে বের হয় তার জন্য গর্তের পিপিলিকা থেকে সমুদ্র তলদেশের মৎস পর্যন্ত সকলে তার জন্য ক্ষমার দোয়া করতে থাকে। অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে সে শহীদ।

তিন. আগুনকে আল্লাহ তৈরী করেছেন তা দ্বারা তিনিই অবাধ্য বান্দাদেরকে শাস্তি দিবেন। রাসুল সা. বলেন, لا يعذب بالنار إلاَّ رب النار” رواه أبو داود আগুন দিয়ে কেবল আগুনের মালিকেই শাস্তি দিতে পারেন।

এখন চিন্তা করুন, একজন মাদরাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে আগুন দিয়ে পুড়ে মারার এই কাহিনি জাহিলী সেই মাটিতে পূঁতে মারার চেয়ে কি কম মনে হয়? হায়! আমরা এখন নব্য জাহিলিয়্যতে বসবাস করছি।

হে বোন নুসরত!

তুমি নব্য জাহিলিয়্যাতের স্বীকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছো। মূলতঃ তুমি এসেছিলে পৃথিবীকে সাহায্য করার জন্য তাই তোমার নাম ‘নুসরত জাহান’। তবে তুমি আজ এই নির্মম জুলুমের স্বীকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছো। নিঃসন্দেহে তুমি জান্নাতী। দুটি সুসংবাদ তোমার জন্য রয়েছে। প্রথমত তুমি একজন দীনি ইলম অর্জনকারী শিক্ষার্থী, আর রাসুল সা. বলেছেন, দীনি শিক্ষা অর্জন করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে জান্নাতী। দ্বিতীয়ত অগ্নিদদ্ধ হয়ে নিহত ব্যক্তিকে রাসুল সা. শহীদ বলেছেন। তাই তোমার জন্য এই দুই সুসংবাদ।

তবে আমাদের ভয় হয় কিয়ামত দিবসে যদি আমাদেরকে এই নব্য জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে আমরা কি জবাব দিব? তবে আজ বিদায় বেলায় তোমার নিকট ক্ষমা চাই, তোমার ব্যাপারে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তুমি আমাদের জন্য সুপারিশ করিও……….

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করো, তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মকাম দান করো, আমীন।

ইতি

সলিমুদ্দিন মাহদি কাসেমী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com