২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

ক্ষুধার্তের দুয়ারে হাজির ইসলাহুল মুসলিমীন

আদিল মাহমুদ 

“বস্তির ঘরগুলোয় একদিক থেকে খাবার বিতরণ শুরু করি, একসময় খাবার ফুরিয়ে যায়। তারপর যে মানুষটি খাবার পাওয়ার জন্য হাত বাড়ায়, তার মুখের দিকে আর তাকাতে পারি না। ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষগুলোর দিকে তাকালেই কষ্টে বুক ফেটে যায়।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিলো স্বেচ্ছাসেবক ইমরানের। একটু দম নেন তিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলতে থাকেন, “অভুক্ত সন্তানদের কান্না থামাতে রান্নার অভিনয় করছেন মা, যেন তারা খাবারের প্রত্যাশা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে— এই চিত্র কেবল খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর সময়কার কথা না! এসব চিত্র আমি নিজে দেখেছি, বস্তির মায়েদের মুখেও শুনেছি।”

রাজধানীর ১০০ ক্ষুধার্ত পরিবারকে একবেলা খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে এসব কথা বলছিলেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার একনিষ্ঠ কর্মী জনাব মিয়া মুহাম্মদ ইমরান।

প্রতিদিন ১০০ পরিবারের একবেলা সুস্বাদু খাবার জোগান দেয়ার এই মহৎ কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ। মুসলিম ওয়েলফেয়ার ইন্সটিটিউটের সহযোগিতায় এই আয়োজনে অর্থায়ন করছে গুডউইল ফাউন্ডেশন, ইউকে। বাস্তবায়নে রয়েছে অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার নিবেদিতপ্রাণ একদল কর্মী।

স্বচ্ছতার স্বার্থে বিতরণের প্রতিটি স্তরেই ছবি তুলে রাখা হয়

মধ্য আকাশের সূর্য যখন হেলে পড়ে পশ্চিমে, স্বেচ্ছাসেবকরা তখন পিকআপ, ভ্যান কিংবা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন খাবার বিতরণে। রাজধানীর খিলগাঁও, হাজিপাড়া, বউবাজার, ঝিলপার, নতুনবাজার, উত্তরখান, নাজিরাবাজার, শাহবাগ, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা খাবার বিতরণ করেন হাসি মুখে।

সম্প্রতি এক বিকেলে মালিবাগের এক বস্তিতে যখন লোকজনের হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিচ্ছিলাম স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে, তখন তাদের চোখে-মুখে দেখেছি খাবার পাওয়ার এক অপার্থিব আনন্দ-উচ্ছ্বাস। তাদেরকে হাসিখুশি দেখে নিজের জীবনে খুব বড় এক স্বর্গীয় প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। প্রতিদিন ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ এর এই আয়োজন শত পরিবারের মুখে এক অনাবিল আনন্দ বয়ে আনে। আমরা স্বেচ্ছাসেবকরা তা দেখি প্রফুল্ল চিত্তে।

তাদের চোখে-মুখে দেখেছি খাবার পাওয়ার এক অপার্থিব আনন্দ-উচ্ছ্বাস

এই খাবার বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে দেখেছি, ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা কীভাবে অনাহারী হয়ে ঘুরে বেড়ায় দ্বারে দ্বারে, রাস্তার মোড়ের ডাস্টবিনে উঁকি দেয় যদি একটু খাবার জোটে এই প্রত্যাশা হৃদয়ে রেখে। এসব চিত্র দেখে বুঝেছি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঠিক ই বলেছিলেন,

‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ চায় দুটো ভাত, একটু নুন
বেলা বয়ে যায়, খায়নি ক’বাছা কচি পেটে তার জ্বলে আগুন’

সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় লিখেছিলেন,

‘প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি।
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি’

ইসলাহুল মুসলিমীনের স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধায়ক ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ঢাকা মহানগরীর নির্বাহী সভাপতি মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুনের কাছে এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলাম আমাদের শেখায় মানবিক হতে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তাদের দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করে দিতে। আর মানবকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট যত কাজ আছে, এর মাঝে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম হচ্ছে দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে আহার করানো। ইসলামের এই শিক্ষা থেকে আমরা আমাদের এই খাবার বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেছি। আশা করছি আমাদের এই কমিউনিটি কিচেনের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে হলেও বছরব্যাপি চলবে ইনশাআল্লাহ।

কীভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরিপাড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার প্রধান কর্যালয় থেকে এই কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। বাজার সদাই করা, রান্না করা, প্যাকেট করা, সবকিছুই এখানে করা হয়। প্রতিদিন ভোরে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা শান্তিনগর বা কারওয়ানবাজার থেকে বাজার করে নিয়ে আসেন, দুপুরের মধ্যে রান্না শেষ হয়ে যায়, তারপর প্যাকেট করে খাবার বিতরণে বেরিয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে রাতেও খাবার বিতরণ করা হয়ে থাকে।

ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদের অসংখ্য উদ্যোগ ও কার্যক্রমের একটি হলো এই খাবার বিতরণ কার্যক্রম। 

যুক্তরাজ্যের মুসলিম ওয়েলফেয়ার ইন্সটিটিউটকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন বলেন, এমডব্লিউআই এর মাধ্যমে গুডউইল ফাউন্ডেশন এর অর্থায়নে এই খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তারা আমাদের নিবন্ধিত এনজিও ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ এ অনুদান প্রদান করে থাকে, তাদের অনুদানের সাথে প্রয়োজনে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ নিজস্ব তহবিল থেকেও অর্থ ব্যয় করবে।

ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অসহায়, দরিদ্র, বিধবা, ইয়াতীম ও গ্রামগঞ্জের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ। এই সংস্থার চেয়ারম্যান হচ্ছেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদের অসংখ্য উদ্যোগ ও কার্যক্রমের একটি হলো এই খাবার বিতরণ কার্যক্রম।

মাওলানা মাকনুন বলেন, রমজান ও লকডাউনকে কেন্দ্র করে আমরা আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে যাচ্ছি। ঢাকা মহানগরীর নর্থ ও সাউথ দুটি অংশে দুটি খাদ্য বিতরণকেন্দ্র স্থাপন করে প্রতিদিন ১,০০০ (এক হাজার) পরিবারের একবেলার মানসম্মত আহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এবিষয়ে পরবর্তীতে আরও বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন মাওলানা মাকনুন।

করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত সমাজে পরোপকারিতার এক অনন্য নজীর হয়ে উঠেছে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ। এই মঙ্গলাকাঙ্খী আলোকবর্তীকা সংস্থাটির সাথে জড়িত সবার জন্য আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com