১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২১শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

জামায়াতপ্রশ্নে যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রম সফল

জামায়াতপ্রশ্নে যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রম সফল

আদিব সৈয়দ : সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ মুকিযুদ্ধের সংগঠনগুলোর দাবির মুখে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়টি তুলে ধরে। ক্ষমতায় এসে পর্যায়ক্রমে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আজকের দিনে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়টি যে সফল তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের পরাজিত শক্তি হিসেবে বিবেচিত ও প্রমাণিত একটি দল। দলটিও এখন বিচারের মুখে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে জামায়াত নেতারা কখনোই তারা অপরাধী ছিলেন সেকথা স্বীকার করেননি। তাদের কৃতকর্মের জন্য তারা কখনো ক্ষমাও চাননি। দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশিষ্ট আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগের আগে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত বিলুপ্তির পরামর্শ দিয়েছেন। তা এখন সচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। আমরা গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পেরেছি যুক্তরাজ্যে থেকে তি​নি জামায়াতের আমিরের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। অতীতে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরে একাধিকবার ভাঙন দেখা দিলেও পরে সংস্কারপন্থী নেতারা জামায়াতের হয়েই কাজ করেছেন। তারা গণমাধ্যমে বা সংবাদ সম্মেলন করে বিরোধিতার কোনো বিষয় জনসম্মুখে উচ্চারণ করেননি। অনেকেই আবদুর রাজ্জাককে সাহসী মানুষ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। আমি সেটা বলতে চাই না। মানুষের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ চোখ বন্ধ হওয়া পর্যন্ত থাকে। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশিষ্ট আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক নিজেকে কতটুকু শোধরাতে পারবেন সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে এটা সত্য তিনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে তার পদত্যাগের খবর গণমাধ্যমে পাঠিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগপত্রের শেষ দিকে তিনি লিখেছেন, এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই। সেই সঙ্গে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব। অবশ্য এ বিষয়ে আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে দেশের সেবায় কাজ করে যাব। নতুন দল করার ব্যাপারে কোনো চিন্তা করছি না।

মুখ খুলেছেন সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নানও। তিনি এখনই জামায়াতকে রাজনীতি বন্ধের কোনো কারণ আছে বলে মনে করছেন না। দল যে একটা নমনীয় অবস্থায় আছে তার বক্তব্যে সেটা সহজেই অনুমেয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার কারণেই জামায়াতে ইসলামীতে ধস নেমেছে। চিন্তার মতপার্থক্য তৈরী হয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর মামলায় গ্রেফতার ও ফাঁসি হতে থাকলে তখন দলকে নতুন নামে নতুন ধাঁচে সাজানোর পক্ষে  কারাগারে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী। কামারুজ্জামান কারাগার থেকেও এর পক্ষে চিঠিও লিখেছেন।

দলের ভেতরে মধ্যপন্থা বা উদার নীতিকৌশল গ্রহণে আগ্রহী এই অংশের বেশির ভাগ অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং একাত্তরের পরের প্রজন্ম। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মানুষের আবেগ, মানবতাবিরোধী অপরাধে নেতাদের সাজা ও ইসলামপন্থী রাজনীতির বিশ্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে দলকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের অন্যতম ছিলেন আবদুর রাজ্জাক।

পদত্যাগপত্রে আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়ে তাঁর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিই। অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্ত করে দিন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমার তিন দশকের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি মনে করেন, জামায়াত ৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে এবং অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

এদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, তাঁর পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যেকোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। আমরা দোয়া করি তিনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

সত্য সবসময় সুন্দর। মুক্তিযুদ্ধে দেশের নারী-পুরুষ-শিশুসহ সবধরনের মানুষের উপর নেমে এসেছিল নির্মমতা। সেই নির্মম মানুষগুলোই বাংলাদেশের মাথায় বসে চড়কি ঘোরাচ্ছিল। আজ চরম বাস্তবতা সামনে চলে এলো। যেই দাবি ছিল নির্যাতিতের আত্মীয়স্বজন, তরুণদামালদের সেই চিন্তা জামায়াতসদস্যদের মধ্যেই ফিরে এসেছে।  এটা অনেক চমৎকার একটি ভালো দিক। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের সুচিন্তাকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com