মাসউদুল কাদির : শূন্যদশকের গোড়ার দিকে। ছড়া বা কিশোর কবিতা পড়ার জন্য রাজধানীর অনেকগুলো সাহিত্যসভায় দৌড়ঝাঁপ করতাম। বিশেষত বৃহস্পতি ও শুক্রবার।ওইদিনগুলোর সাহিত্যসভা মিস করা খুব কঠিন ছিল। যদিও মানুষ কবিতা বুঝে না। মেলায় কবিতা কিনে না। এমন একটা ধারণা সবার মধ্যেই আছে। তবু পিওর সাহিত্য কবিতাই। ছড়া-কিশোর কবিতা-শিশুতোষ ছড়া-কবিতা কয়জনই বা লিখতে পারে। একদিন একসাহিত্যসভায় একটু আগে আগে চলে গেলাম। গিয়ে কেউ নেই। মনটা খারাপ হলো। কিন্তু মঞ্চে বসা দেখি কবি আল মাহমুদ ও নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ।
খুব ভালো লাগলো। শূন্য হলে অতিথিরা সবার আগে। আমি অবাক হলেও ভালো লেগেছে। কবি আল মাহমুদ ও নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ সহাস্যবদনে আমাকে গ্রহণ করলেন। চা পানের আমন্ত্রণ জানালেন। আমি মাথা ঝাঁকালাম। এমন অতিথিদের সঙ্গে চা খাওয়া আনন্দেরই বটে।
আজ মনে পড়ছে আল মাহমুদ কতটু বড় মনের মানুষ ছিলেন। আমি রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। তরুণ কবিদের তিনি ভালোবাসতেন। উঠতি বয়সি কবিদের তিনি স্বপ্ন দেখাতেন। আজ কি ভাবা যায়, অতিথি হয়ে মঞ্চে সবার আগে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি। প্রিয় কবি জান্নাতে আলোজ্বলমল সুন্দর থেকো। আল্লাহর পরম ভালোবাসায় থেকো।
কবি আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, লেখক ও গবেষক। বাংলা কবিতা যাদের হাত ধরে আধুনিকতায় পৌঁছেছে, আল মাহমুদ তাদেরও অন্যতম।
জন্ম এবং পরিবার : আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর এবং মাতার নাম রৌশন আরা বেগম। তার সহধর্মিণীর নাম সৈয়দা নাদিরা বেগম। তার পাঁচ পুত্র এবং তিন কন্যা।
কবি’র কর্মজীবন : ১৯৫৪ সালে লেখালেখি ও সংবাদপত্রের সূত্র ধরেই কবি আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন।
১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন।
১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ
★লোক লোকান্তর (১৯৬৩)
★কালের কলস (১৯৬৬)
★সোনালী কাবিন (১৯৬৬)
★মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬)
★আরব্য রজনীর রাজহাঁস
★বখতিয়ারের ঘোড়া
★Al Mahmud In English
★দিনযাপন
★দ্বিতীয় ভাংগন
★একটি পাখি লেজ ঝোলা
★আল মাহমুদরে গল্প
★গল্পসমগ্র
★প্রেমের গল্প
★যেভাবে গড়ে উঠি
★কিশোর সমগ্র
★কবির আত্মবিশ্বাস
★কবিতাসমগ্র
★কবিতাসমগ্র-২
★পানকৌড়ির রক্ত
★সৌরভের কাছে পরাজিত
★গন্ধ বণিক
★ময়ূরীর মুখ
★না কোন শূণ্যতা মানি না
★নদীর ভেতরের নদী
★পাখির কাছে , ফুলের কাছে
★প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা
★প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা
★প্রেমের কবিতা সমগ্র
★উপমহাদেশ
★বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ
★উপন্যাস সমগ্র-১
★উপন্যাস সমগ্র-২
★উপন্যাস সমগ্র-৩
★ত্রিশেরা
★উড়াল কাব্য
সম্মাননা ও পুরস্কার সমূহঃ
তিনি অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
★ বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮)
★ জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২),
★হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪),
★সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬),
★ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬),
★একুশে পদক (১৯৮৭),
★নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯০),
★সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক-(২০০৪),
★শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, ইত্যাদি।


